ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির যে নবজাগরণের উন্মেষ ঘটে, তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তির মাধ্যমে। ভাষা আন্দোলন থেকে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ করেছেন, নীতিনির্ধারণে যুক্ত ছিলেন বা নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ছয় দফা ছিল একেবারে ভিন্ন, অনেকটা একক নেতৃত্বে এ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী আর ছাত্রলীগ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও সমর্থন পাননি। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, একপর্যায়ে নতুন দল গঠন করেন। পাকিস্তান সরকার যেকোনো মূল্যে ছয় দফা আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ছয় দফাকে প্রত্যাখ্যান করে। কাউন্সিল মুসলিম লীগ ছয় দফাকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেয়। জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ হলো, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতীয় আগ্রাসনের শিকারে পরিণত করে পাকিস্তানের অস্তিত্বের ওপর প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে ছয় দফা প্রণয়ন করা হয়েছে। নেজামে ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নানাভাবে ছয় দফার সমালোচনা করে। ন্যাপ নেতাদের কেউ কেউ ছয় দফা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবে প্রণীত বলে অভিযোগ করেন। যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদের পরিচায়ক। বঙ্গবন্ধু তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। ছয় দফাও তিনি উপযুক্ত সময়ে উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। নিরাপত্তাহীনতাবোধ এ অঞ্চলের জনগণের কাছে স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য লাহোরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোর কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু লাহোরের সম্মেলনে তাঁর ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। সংক্ষেপে দাবিগুলো হলো-
১. ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানে ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ২. কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় থাকবে, অবশিষ্ট বিষয়গুলো থাকবে ফেডারেশনের ইউনিটগুলোর হাতে। ৩. দুটি পরস্পর বিনিময়যোগ্য মুদ্রা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ একটি মুদ্রাব্যবস্থা থাকবে। ৪. ফেডারেশনের ইউনিটগুলোর হাতে থাকবে কর ধার্যের ক্ষমতা, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য করের একটা নির্ধারিত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় তহবিল গঠিত হবে। ৫. বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের বিষয়ে ফেডারেশনের ইউনিটগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ৬. প্রদেশগুলোর জন্য আধাসামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী থাকতে হবে।
লাহোর সম্মেলন আয়োজকরা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে আলোচ্য সূচির অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হয়নি। লাহোর সম্মেলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বঙ্গবন্ধু ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসেন। তখনো ছয় দফা আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচি হিসেবে অনুমোদন লাভ করেনি। ১৯৬৬ সালের ১৮-২০ মার্চ ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে দেয়াল লিখন, পোস্টার, লিফলেট ও পুস্তিকা প্রচার করে ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।
১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ছয় দফার পক্ষে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর নোয়াখালী, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনার জনসভায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহকর্মীরা নানা যুক্তি, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে অবদান রাখেন। ইতিমধ্যে ২০ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে রাষ্ট্রদ্রোহী ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে যশোরে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকার কোর্টে হাজিরা দেওয়ার জন্য জামিনে মুক্তিও দেওয়া হয়। এভাবে বিরামহীন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার, হয়রানি করা হয়। অবশেষে ৯ মে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন ৩২(১) ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। সঙ্গে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী প্রমুখ।
দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তারের পর বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্যাতন আরো বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধুকে কনডেম্ড সেলে রাখা হয়। বেগম মুজিবের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মুমিনুল হক খোকা কারাগারে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, 'চোখ লাল, গাল বসে গেছে, চুল উসকো-খুসকো, উদ্ভ্রান্ত চাহনি। ভাবি (বেগম মুজিব) নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না, হু হু করে কেঁদে উঠলেন। ভাই (বঙ্গবন্ধু) বললেন, 'ওরা আমাকে দিয়ে যা বলাতে চাচ্ছে তা আমার নিজের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতার শামিল, ওরা তা কোনো দিন করাতে পারবে না। কিন্তু ওরা আমাকে যেভাবে রেখেছে, এভাবে আর কিছুদিন গেলে আমি নিজেই শেষ হয়ে যাব। তোমরা যদি পারো আমাকে এখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো।' সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন আর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ জুনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। সরকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গণহারে ধরপাকড় করে এবং সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ৭ জুনের হরতালে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে। মনু মিয়াসহ ১১ জন নিহত, অনেকে আহত ও কারাবরণ করেন। পুলিশ বাহিনীর নির্বিচার গুলি ও অত্যাচারের পরও সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ছয় দফাকে 'দেশের উভয় অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বিরোধ, বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা' হিসেবে অভিহিত করেন। নির্ভীক আদর্শবান সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাও পাকিস্তান সরকারের আক্রোশের শিকার হয়।
১৯৪৮ সাল থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির প্রতিটি যৌক্তিক দাবি অগ্রাহ্য করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য ছয় দফা আন্দোলনের সূচনা; কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির আন্দোলনকে 'ইসলাম ও পাকিস্তান ধ্বংসের চক্রান্ত' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর সব আন্দোলন-সংগ্রামের পেছনে ভারতীয় ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই 'বোকা বানানোর' গল্প একপর্যায়ে এ দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার পক্ষে বহু বক্তৃতা দিয়েছেন। ২৮ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারিত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, 'ছয় দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে, সেই মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি শেষবারের মতো আহ্বান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তাপ্রত্যাশী কোনো কিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারে না।...আগামী নির্বাচন জাতীয় মৌলিক সমস্যাসমূহ বিশেষ করে ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে গণভোটরূপে আমরা গ্রহণ করেছি।'
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সত্যি সত্যি সত্তরের নির্বাচনকে এ দেশের মানুষ ছয় দফার প্রশ্নে গণভোট হিসেবে গ্রহণ করেছিল। স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বিপুল জনরায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বর্ণ দুয়ারে। তাই কোনো রকম অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় যে ছয় দফার মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ নিহিত ছিল।
লেখক : ড. মোহাম্মদ সেলিম (অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ছয় দফা থেকে বাংলাদেশ