Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ এপ্রিল, ২০১৪ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে অটিজম শিশু দেড় লাখ : ব্যাপ্তি বাড়ছে বিশ্বজুড়ে

বাংলাদেশে অটিজম শিশু দেড় লাখ : ব্যাপ্তি বাড়ছে বিশ্বজুড়ে

বদরুদ্দোজা সুমন.. প্রকাশ : ০২ এপ্রিল, ২০১৪


শিশুদের অটিজমে আক্রান্তের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে এ সমস্যার ব্যাপ্তি। আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্তে বলা হচ্ছে, মাত্র ২ বছরের ব্যবধানে অটিজম আক্রান্ত শিশুর হার ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ছেলেশিশুদের মধ্যে অটিজমের আক্রমণ সাড়ে ৪ গুণ বেশি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক উপাত্তে অটিজম মোকাবেলায় আন্দোলন জোরদারের বিষয়টিকে আবারও সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সংকট নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) বলছে, শিশুস্বাস্থ্যের এ সমস্যাকে রুখতে হবে। স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাংলাদেশে অটিজম পরিস্থিতি খুব বেশি ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। বিস্তৃত পরিসরে অনুসন্ধান কার্যক্রম (সার্চিং) চালালে এদেশে অটিজমের শিকার অনেক বেশি শিশু শনাক্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা সবাই।’ ২০১১ সালে ঢাকায় অটিজম সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে এ বিষয়ে সচেতনতা ও জাগরণ তৈরি হয়। মানুষ অটিজম সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারে। সেন্টার ফর নিউরোডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেন (সিনাক), সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রয়াস স্কুলসহ সেবাদানকারী অন্যান্য সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, ওই সম্মেলনের পর থেকে অভিভাবকরা অস্বাভাবিক আচরণের শিশুদের সেবা কেন্দ্রে নিয়ে আসতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকন্যা ও যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত মনস্তত্ববিদ অটিজম এক্সপার্ট সায়মা হোসেন পুতুল ওই সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশে অটিজম আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি বৈশ্বিক অটিজম কর্মসূচিতে নেতৃত্বদানকারী মার্কিন সংস্থা ‘অটিজম স্পিকসে’র সদস্য। মূলত তার প্রচেষ্টায় দেশে অটিজম সচেতনতা গড়ে উঠে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী। শ্রীলংকার ফার্স্টলেডি অটিজম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কাতারে আমীরের অতীব নিকটজন এ অটিজম সচেতনতা গড়তে কাজ করেন। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারও অটিজম মোকাবেলায় পরিচালিত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিত্বরা এ আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
অটিজম শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা দেখা দেয়। মাতৃগর্ভ থেকে শিশুর জন্ম পর্যন্ত কোনো পর্যায়ে শিশুর মস্তিষ্ক ঠিকমতো বিকশিত না হলে অটিজম দেখা দেয়। এসব শিশু নিজের কাজ নিজে করতে পারে না। ঠিক সময়ে কথা বলতে পারে না। আচার-আচরণে অপরিপক্ব হয়। আলোর সংস্পর্শ পেলে পালানোর চেষ্টা করে। ডাক দিলে সাড়া দেয় না। কারও চোখে চোখ রাখে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো অটিজমের লক্ষণ। অটিজম আক্রান্ত শিশু তুর্য, সুনেহরা, আনা, জাহিনের অবস্থা এখন অনেকটা স্বাভাবিক। চিকিৎসক, থেরাপিস্ট, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিবিড় পরিচর্যায় তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সহজে চোখে পড়ে। ২ বছর আগে যখন এই শিশুদের অটিজম সন্দেহে সিনাকে আনা হয়েছিল, তখনকার চিত্র ছিল একেবারে ভিন্ন। কেউ অতিরিক্ত আগ্রাসী, কেউবা অস্বাভাবিক চুপচাপ, কেউ ডাকলে সাড়া দিত না, কারও মুখে ছিল না হাসি।
শিশুর অস্বাভাবিকতা বাবা-মাকে ঠেলে দিয়েছিল গভীর হতাশায়। সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়ায় এখন এই শিশুরা টুকটাক নিজেদের কাজগুলো করতে শিখেছে। শিশু নিউরোলজিস্ট ও অটিজম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নিবিড় পরিচর্যায় অস্বাভাবিক আচরণের শিশুরাও সমাজের মূলধারায় ফিরতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, ‘ওরাও পেতে পারে পরম যত্ন’, ‘ওদেরও রয়েছে সুন্দর ভবিষ্যৎ।’ সর্বশেষ আদমশুমারিমতে, দেশে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশের মোট প্রতিবন্ধীর ১ শতাংশকে অটিজমের শিকার বলে ধরে নেয়া হয়। এই উপাত্তের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, দেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা হতে পারে আনুমানিক দেড় লাখ।
সিডিসি’র তথ্যে উদ্বেগজনক চিত্র : সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৬৮ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিজমের শিকার বলে শনাক্ত হচ্ছে। দুই বছর আগেও প্রতি ৮৮ জন শিশুর মধ্যে একজন শিশু আক্রান্ত হতো। অর্থাৎ, দু’বছরের ব্যবধানে অটিজমের ব্যাপ্তি বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশ। গত বৃহস্পতিবার সিডিসি আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ২০০৮ ও ২০১০ সালের তথ্যের তুলনা করা হয়েছে। সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি অঙ্গরাজ্যে ৮ বছরের কম বয়সী ৫ হাজার ৩০০ শিশুর ওপর সমীক্ষা চালিয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছেলেশিশুদের অটিজমে আক্রান্তের প্রবণতা অনেক বেশি। ছেলেরা মেয়েশিশুর তুলনায় সাড়ে ৪ গুণ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ছেলেদের মধ্যে প্রতি ৪২ জনে একজন পজেটিভ হচ্ছে, আর মেয়েদের মধ্যে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতি ১৮৯ জনে একজন। সিডিসির তথ্য নিয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএনসহ বিভিন্ন বার্তা সংস্থা। সিডিসি জানিয়েছে, বিস্তৃত কর্মোদ্যোগ সত্ত্বেও এখনও অটিজম আক্রান্ত শিশুদের শনাক্ত করার গড় বয়স ৪ বছর। যদিও দুই বছরের মধ্যে এই শিশুদের শনাক্ত করা সম্ভব। অভিভাবকদের সচেতন হওয়া ও অটিজম সন্দেহ হলে দ্রুত সেবা কেন্দ্রে আনার পরামর্শ দিয়ে সিডিসি বলেছে, যত কম বয়সে শনাক্ত হবে, ততোই শিশুকে স্বাভাবিক আচরণে ফিরিয়ে আনার সুযোগ বেশি থাকবে।
ওরা ফিরতে পারে স্বাভাবিক জীবনে : অটিস্টিক শিশুদের অবহেলা ও লুকিয়ে রাখা নয় বরং তাদের প্রয়োজন নিবিড় যতœ। তাদের সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। তবেই তারা ক্রমশ সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ক্যাম্পাসে চলছে সিনাকের কার্যক্রম। সিনাকের কর্মসূচি সমন্বয়ক পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহীন আকতার যুগান্তরকে বলেন, প্রত্যেক অটিস্টিক শিশুর মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুণ লুকিয়ে থাকে। কেউ ভালো ছবি আঁকতে পারে, কেউ খেলাধুলা ভালো পারে, কেউ বাগান করাসহ সৃষ্টিশীল কাজে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পরিচর্যায় এসব গুণ প্রকাশ পায়।
সিনাক সূত্র জানায়, বর্তমানে ১৫টি শিশুর জন্য দিবাযতœ কেন্দ্রে (ডে-কেয়ার) শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। এই শিশুদের বিশেষ কৌশলে পড়াশোনা ও খেলাধুলা শেখাতে হয়। খেলাচ্ছলে বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজকর্মে অভ্যস্ত করে তোলেন অটিজম প্রশিক্ষকরা। তবে সিনাকে এখনও ইনডোর সুবিধা চালু হয়নি। কেন্দ্রে জায়গার সংকুলানে সমস্যা হচ্ছে। ইনডোর সুবিধা চালু হলে অনেক শিশু উপকৃত হবে।
শিশু বিকাশ কেন্দ্রে চলছে কাজ : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে ১০টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বেশকিছু কার্যক্রম। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬৪ জেলায় ৬৮টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র থেকে অটিজম সেবা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, আরও ৫টি কেন্দ্র চালুর কাজ প্রক্রিয়াধীন।
ইন্সটিটিউট স্থাপনের কাজ গতিহীন : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিএসএমএমইউ সিনাককে ইন্সটিটিউটে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা চলতি বাজেটে বাস্তবায়নের কথা ছিল। ‘ইস্টাবলিশমেন্ট অব ইন্সটিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম ইন বিএসএমএমইউ’ শীর্ষক কর্মপরিকল্পনা বিগত ৬ মাসেও এগোয়নি। এ ইন্সটিটিউট নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বরাদ্দের টাকা পড়ে আছে।

- See more at: http://www.jugantor.com/last-page/2014/04/02/83507#sthash.yz8TZ0k8.dpuf

 

মন্তব্য করুন