সিনিয়র শিক্ষক
২৮ মার্চ, ২০২০ ০৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
আঙ্গুল কাটিয়া কলম বানাইয়া, নয়নের জলে করলাম কালি...।’ আধুনিককালের প্রেমিক-প্রেমিকারা হৃদয়ের বার্তা বিনিময়ে সাংঘাতিক এ পথ ধরবে না। আজকাল মোবাইল ফোন, ফেসবুক ও ইন্টারনেটেই প্রেম এবং বার্তা- বিনিময় চলে। লেখালেখিতেও কলমের একক আধিপত্য কমে এসেছে। টাইপ রাইটার তো এখন উঠেই গেছে। কম্পিউটার দখল করে নিচ্ছে সে স্থান। এক সময় বলা হতো- লোকটার কলমে ধার আছে। আজকাল বলতে হবে, লোকটার আঙুলের ডগায় তেজ আছে। কারণ অনেকেই এ যুগে কলম ছেড়ে দিচ্ছেন। কম্পিউটারের কী-বোর্ডে আঙুল ঠুকে ঠুকে লিখছেন চিঠিপত্র, প্রবন্ধ, গল্প-কবিতা। তবুও কলম সভ্যতার অঙ্গ। মানবজাতির প্রতি আল্লাহর প্রথম ওহির পাঁচটি বাক্যে আছে- ‘আল্লামা বিল কলম’। এই কলমের স্থান এক সময় কম্পিউটার দখল করে নিলেও কলম আমাদের সভ্যতার উজ্জ্বল উপকরণ হয়ে থাকবে।
কলম মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক উদ্ভাবন। মানুষ তাঁর চিন্তাভাবনা, সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতি এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা ধরে রাখার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যবহার করে এসেছে কলম। কলম, কালি ও বর্ণমালা উদ্ভাবনের আগে মানুষ পাহাড়-পর্বত পাথরের গায়ে খোদাই করে মনের ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করত। আস্তে আস্তে মানুষ শিখল অনেক কিছু। এল কলমের যুগ। কবে প্রথম কীভাবে কলমের ব্যবহার শুরু হয়েছে বলা মুশকিল। তবে কলমের ব্যবহার যে প্রাচীন তা সর্বজন স্বীকৃত। এই কলমের সঙ্গে লাগে কালি। তরল পদার্থটি রাখার জন্য প্রয়োজন হয় পাত্রের। এটাকে বলে দোয়াত। তাই দোয়াত কলম ছিল হাজার বছর ধরে একই সুতায় বাঁধা। শুধু কালি বা শুধু কলম হলে চলে না। দোয়াত কলমে জোড়া রাখতে হয়। সময়ের বিবর্তনে সেই দোয়াত কলম এখন বিলুপ্ত।
আদিকালে কলম ছিল পাখির পালক দিয়ে তৈরি। নাম থেকে এটা অনুমান করা যায়। প্যানাম শব্দ থেকে এসেছে ইংরেজি পেন শব্দ। এর পক্ষে প্রমাণও আছে। এ দেশেও পাখির পালক দিয়ে তৈরি হতো কলম। পাখির পালকে বর্ণমালা লিখতে শিখেছেন, অথবা লেখালেখির কাজ চালিয়েছেন এমন লোক এখনো আমাদের মধ্যে অনেক রয়েছেন। পালকের ডাঁটার মতো দিকটা কায়দা করে কেটে নেয়া হতো। উপরের দিকে ডিজাইন করে রাখা হতো শোভন মসৃণ পালক। বাঁশ, কাঠ এবং খাগড়া দিয়েও তৈরি হতো কলম। মিশরে প্রথম চালু খাগড়ার কলম টেকসই না হলেও ব্যবহৃত হতো বেশি। মুখের দিকটা কর্তন করার কৌশল ছিল। তাই যে কেউ সহজে বানাতে পারতেন না। ধারালো ছুরি দিয়ে কলম কাটা হতো বলেই ফারসিতে ছুরির আরেক নাম কলমতরাশ। বোঝা যাচ্ছে কলম কাটার ছুরি ছিল পৃথক।
শুধু কলমে কাজ চলে না। তাই দরকার কালির। প্রথম দিকে মানুষ কাঠ, কয়লা, আঠা, পানি মিশিয়ে কালি তৈরি করত। খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে মিশরে ব্যবহৃত হয়েছে কার্বন কালি। কলমের আগেই কালির জন্ম হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এক সময় এর উন্নতি হলো। বড়ি আকারে কালো ও লাল কালি এল বাজারে। পানিতে গুলিয়ে নিতে হতো বড়ি। পাকিস্তান আমলেও বড়ির কালির প্রচলন ছিল। দোয়াত তৈরি হতো বিশেষ ডিজাইনে। গ্লাস কাপ বা বোতলের মতো হলে উল্টে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দোয়াতের আকৃতি হতো দর্শনীয়। হ্যাঁ, বাজারে তৈরি বোতলে কালি পাওয়া যেত। এরপর কালি চলে গেল শিল্প অঙ্গনে। শোভন মোড়কে কাঁচের তৈরি দোয়াতে কালি বিভিন্ন ট্রেড নামে এল বাজারে। এটি আজও আছে। এর আগে আমাদের দেশেও জলজ উদ্ভিদ এবং বন্য ফলের নির্যাস দিয়ে কালি তৈরি হতো।
কালি কলমের এই চিরকালীন সম্পর্কে এখন চিড় ধরেছে। অত্যাধুনিক বলপয়েন্টই এখন সর্বত্র চলছে। কিন্তু প্রথম দিকে বলপয়েন্ট শিক্ষাঙ্গনে ছিল নিষিদ্ধ। ক্লাসে নিয়ে গেলে শিক্ষকরা ধমক লাগাতেন। বলতেন হাতের লেখা সুন্দর হবে না। বলপেন আমাদের দেশে ষাট দশকের শেষ দিকে আসে। উপরের দিকে টিপ দিলে রিফিল বের হতো। বলা হতো টিপ কলম। বাজারে এখনো সেই ডিজাইনের কলম আছে। তবে ওয়ান টাইম বলপেনই চলে বেশি।
বিচিত্র বলপয়েন্ট কলমের পাশাপাশি অবশ্য ঝরনা কলম বা ফাউন্টেন পেনও আছে। এর ভেতর কালি ভরে নেয়া যায়। হ্যান্ডলপেন অফিস আদালত থেকে প্রায় উঠে গেছে। এর ভেতরও কালি রাখা যায়। কলমের সঙ্গে নিব-এর সংযোজন হয়েছে পরে। এ যুগে কলম, কালি, নিব এবং নিবের সঙ্গে পৃথক আরেকটি রাবারের টুকরো-জিহ্বা সবই শিল্পজাত পণ্য। প্লাস্টিকের বডি’র কলম। প্রাচীন আকৃতির অনুরূপ হ্যান্ডেল পেন-এর পাশাপাশি ঝরণা কলম দেখে ফেলে আসা দিনের দোয়াত কলমের ছবি কল্পনা করাও কঠিন।
কলমের সঠিক ইতিহাস আজও দুর্লভ। এর বড় কারণ হচ্ছে হঠাৎ করে একদিনে কলম চালু হয় নি। ক্রমান্বয়ে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। যতোদূর জানা যায়, ১৬৫৬ থেকে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কলম একটি আধুনিক রূপ নেয়। ফাউন্টেন পেনের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের প্যারিস ভ্রমণকারী দু’জন পর্যটকের বিবরণে। তারা প্যারিসে ১০ ফ্রাংক দামে কালিভরা রূপার কলম বিক্রি হতে দেখেন বলে উল্লেখ করেছেন। এরপর উল্লেখ পাওয়া যায় বিখ্যাত ডায়েরি লেখক স্যামুয়েল পেপিসির লেখায়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি উপহার হিসেবে রূপার একটি কলম পান। তিনি এটিকে বলেছেন চৌবাচ্চা কলম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ১৭১০ খ্রিস্টাব্দের আগে ফাউন্টেন পেন বলে কোনো শব্দ চালু ছিল না। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে জোসেফ ব্রাহাম মোড়ক বিশিষ্ট ফাউন্টেন পেন তৈরি করেন। এর নিব ছিল শজারুর কাঁটা দিয়ে তৈরি। কালি রাখার একটি রূপার নলও ছিল এর সঙ্গে। পার্কার ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে এর উন্নয়ন সাধন করেন। এবার কলমে যুক্ত হয় পিস্টন। এতে চাপ দিলে নিবে কালি আসে। এই পার্কার কলম উন্নততর আকারে আজও আছে। কিন্তু প্রথম দিকে এর সমস্যা ছিল। লেখার সময় হঠাৎ করে কালি ঝরে পড়ে যেত। সে সময়ে কালির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ছিল বড় সমস্যা। এর সমাধান করেন এডসন ওয়াটারম্যান। তিনি পেশায় ছিলেন বীমার দালাল। মার্কিন এই ভদ্রলোক একবার বীমার ফরম পূরণ করতে গিয়ে হঠাৎ বেশি কালি ঝরে যাওয়াতে ফরমটি নষ্ট হয়ে যায়। জেদি এই ওয়াটারম্যান কালি নিয়ন্ত্রণের জন্য অবিরাম চেষ্টা শুরু করেন। সাফল্য এল ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে। নিউইয়র্কে মিনি কারখানায় তিনি আবিষ্কার করলেন নতুন কৌশল। জিহ্বার মাধ্যমে নিবের মুখে কালি এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হলো যে আর কোনো কালিঘটিত বিপত্তি রইল না। এভাবে বীমার কর্মী হয়ে উঠলেন ফাউন্টেন পেনের জনক। এটির পর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে জন এইচ লউড আমেরিকায় বলপেন আবিষ্কার করেন। তবে আধুনিক বলপেন তৈরি করেন হাঙ্গেরীয় সাংবাদিক ল্যাভিসলো জোসেফ বিরো। সে ছিল ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ। দেশে দেশে বিভিন্ন সময়ে এসব কলম চালু হয়। সেই সঙ্গে দোয়াতের দিন শেষ হয়ে আসতে থাকে।
কলমের বিকল্প হতে পারে কম্পিউটার। অনেকে ব্যবহারও করছেন। তবু সেই সুলেখা, পাইলট, উইংসাং, পার্কার নামের ফাউন্টেন পেন আজও আছে। আছে স্মৃতিতে এবং বাস্তবে। বলপয়েন্ট কলম থেকে একটু মোটা এসব কলমের সামনের প্রান্তে থাকে নিব। ইস্পাত, তামা, সোনা, নিকেল অথবা জংমুক্ত যেকোনো ধাতুর তৈরি নিব ভেতরে নিয়ন্ত্রিত কালিতে সিক্ত হয়। দাগ পড়ে কাগজের বুকে। এসব বলপেন কম্পিউটারের যুগেও টিকে আছে। বছরে সমগ্র বিশ্বে এগারো মিলিয়নের মতো ফাউন্টেন পেন উৎপাদিত হয়। এর পাশাপাশি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে পশমি কলম ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি জাপানে প্রথম চালু হয়। ভেড়ার লোম বা কৃত্রিম আঁশে তৈরি বলে এর রেখা মোটা হয়। অঙ্কন এবং চিহ্নিত করার কাজেই এর ব্যবহার বেশি।
আগে কলম বললেই দোয়াত কলম বোঝাতো। পালকের কলম এবং দর্শনীয় আকৃতির দোয়াত। কিছুক্ষণ পর পর কলমটি সামনের দোয়াতে চুবিয়ে নিচ্ছেন লেখক। কাগজে বেশি কালি চলে এলে পাশেই আছে ব্লটিং পেপার বা চোষ কাগজ। শৌখিন অনেকের ছিল কলমদান। আজকাল প্লাস্টিকের কলমদান আছে। ওই সময় হতো কাঠের, মাটির বা দামি পাথরে তৈরি। দাঁড় করিয়ে রাখা হতো কলম।
স্কুলে দোয়াত কলম নিয়ে যেতেন ছাত্রছাত্রী। কোনো কোনো স্কুলে ডেস্কের ওপর গর্ত করে রাখা হতো খোলামুখ অর্থাৎ ঢাকনা ছাড়া দোয়াত। কালি সরবরাহ হতো স্কুল থেকে। হাতের লেখা মশক করার জন্য পালক বা নল খাগড়ার কলম ছিল বাধ্যতামূলক। প্রবীণরা বলেন, ঝরনা কলমও তাদের হাতে দেয়া হয়েছে স্কুলের ওপরের দিকে পড়ার সময়। হ্যাঁ ঝরনা কলম ছিল ছাত্রছাত্রীদের কাছে বাহাদুরির বিষয়। খুব স্টাইল করে বুকপকেটে ক্লিপ আঁটা কলম মালিককে দিত আলাদা অনুভূতি। কিন্তু শিক্ষকরা ছিলেন বড় বেরসিক। তাই শৈশবে অনেকেই হয়তো অনেকবার কালির দোয়াত উল্টে দিয়ে বইপত্র নষ্ট করেছেন। শিক্ষক অভিভাবকদের সহ্য করেছেন তিরস্কার।
এখন কলম আছে, কালি আছে। কিন্তু দোয়াত কলমের জুটি নেই। প্রবীণ বা প্রৌঢ় ব্যক্তিরা হয়তো বলপয়েন্টে লিখতে গিয়ে মনে মনে ফিরে যান শৈশবে। কল্পনার চোখে দেখেন সেই দোয়াত কলমের ছবি।
৭১
১৪৫ মন্তব্য