সহকারী শিক্ষক
০৩ নভেম্বর, ২০২১ ০১:৫৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন
ভূমিকা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি আমাদের জাতির পিতা। তিনি ছিলেন ভাষাসৈনিক। বাঙালির অধিকার ও স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এদেশের গণমানুষের মুক্তির জন্য পরিচালিত সকল আন্দোলনে তিনিই ছিলেন প্রধান চালিকাশক্তি। তার নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করেছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। বজ্রকণ্ঠের অধিকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা এক মহান পুরুষ। এ জাতির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদান ও আত্মত্যাগ চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার দ্বারা তিনি ইতিহাসের বরপুত্র হিসেবে মর্যাদালাভ করেছেন। তার জীবনাদর্শে আমরা সংগ্রামী চেতনা ও কর্মনিষ্ঠার পরিচয় পাই।
জন্ম: বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ (সাবেক ফরিদপুর) জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল খোকা। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের আদরের ‘খোকা’ই পরবর্তীত আমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর হয়ে উঠেছিলেন। টুঙ্গিপাড়া গ্রামে প্রকৃতির নিবিড় আশ্রয়ে জল-মাটি-কাদায় হেসে-খেলেই তার শৈশব কেটেছিল।
ছাত্রজীবন ও ছাত্র আন্দোলন: গোপালগঞ্জ থেকে স্কুলজীবন শেষ করে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭ সালে ওই কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই রাজনীতির পথ ধরেই বঙ্গবন্ধু ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের সমর্থনে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি।
রাজনৈতিক জীবন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবন থেকেই দেশ ও দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ছাত্রজীবনেই তিনি শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও সুভাষচন্দ্র বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। ওই বছরই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুভাষা চাপিয়ে দেয়া হয়। প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে ছাত্রসমাজ। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। তৎকালীন যেসব ছাত্র ও তরুণের প্রচেষ্টায় এ পরিষদ গঠিত হয় তাদের অন্যতম ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষার দাবিতে ধর্মঘট ডাকা হলে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ অধিকাংশ ছাত্রনেতা গ্রেফতার হন।
দীর্ঘদিন বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেন বঙ্গবন্ধু। ফলে তাকে বারবার জেল খাটতে হয়। ১৯৪৯ সালের মধ্যভাগে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন করায় শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি চলছিল তখন। আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে কারাবন্দি তরুণ নেতা শেখ মুজিবকে করা হয় দলের যুগ্ম সম্পাদক। মুক্তি পেয়ে তিনি দল গঠনের কাজে ব্রতী হন। ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অসামান্য। এটি শাসকগোষ্ঠীও বুঝতে পারে। তাই ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এবার তাকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা হয়। জেলে থাকাকালে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি অনশন পালন করেন। দুই বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পরে তিনি মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়ে আবার তিনি সারাদেশে দলকে সংগঠিত করার কাজে মনোযোগ দেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় লাভ করলে শেখ মুজিব মন্ত্রী হন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়। তখন তাকে পুনরায় কিছুদিনের জন্য জেলে যেতে হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
দুইবার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৬ সালে তিনি পুনরায় পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার কাজে সময় দেবেন বলে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। ১৯৫৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধীদলের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু পূর্ব-পাকিস্তানে বাঙালির সব ধরনের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ৬ দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। ৬ দফা আন্দোলনকে দমন করতে পাকিস্তানি শাসকরা শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে মামলা করে, যা ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এ মামলায় পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দকে গোপন বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেয়া। এভাবে নেতৃত্বশূন্য করে আন্দোলন থামিয়ে দেয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন টিকে থাকতে পারেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান এ মামলা প্রত্যাহার করে সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হন। কারামুক্ত শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে বিশাল গণসংবর্ধনা দেয়া হয়। এ সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের শতকরা ৮০ ভাগ আসনে বিজয়ী হয়। কিন্তু তাকে সরকার গঠন করতে দেয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে তিনি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন।
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: ১৯৭১ সালের ২ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৭ই মার্চ তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রায় দশ লাখ লোকের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৮ মিনিটের ওই ভাষণে তিনি বাঙালির বিজয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানান। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে আহ্বান করেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ এক অভিন্ন ইতিহাস। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ। দীর্ঘ নয়মাসের যুদ্ধ শেষে ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাঙালির বিজয়। জীবনের বিনিময়ে বাঙালিরা স্বাধীনতা অর্জন করে।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় দেশবাসীর কাছে ফিরে আসেন। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় দেশগড়ার নতুন সংগ্রাম।
শেখ মুজিবের শাসনামল: বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। বাংলার মহান ও অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার (অস্থায়ী) গঠিত হয় এবং এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অস্থায়ী সংবিধানের আদেশ জারি করেন। তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীনতার ১০ মাসের মাথায় সংবিধান দিতে সমর্থ হন। তিনিই প্রথম বাংলায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে শুধু বাঙালি জাতিকে নয়, বাংলা ভাষার মর্যাদাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ নামে একটি আদেশ জারি করেন। তিনি ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। তিনি ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-এ-খুদাকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৪০টি দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের এবং ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে।
বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, এ জাতির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। যে মাটির সান্নিধ্যে ও যে প্রকৃতিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, বেড়ে উঠেছিলেন, সেই মাটির সান্নিধ্যে, প্রকৃতির শীতল স্নেহ ও একান্ত স্পর্শে তিনি শেষশয্যা গ্রহণ করেছেন।
উপসংহার: জাতির মহান নেতা হতে হলে যে সমস্ত গুণের প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর তার সবই ছিল। তিনি ছিলেন সাহসী ও স্বাধীনতাপ্রিয়। সকল নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং অধিকার অর্জনের সংগ্রামে আপসহীন। কোনো প্রকার ভীতি কিংবা দ্বিধা তাকে বিচলিত করতে পারেনি। বাংলা ছিল তার দেশ, বাংলা ছিল তার ভাষা এবং তিনি নিজেকে বলতেন ‘আমি বাঙালি’। কবির উপলব্ধিই যথার্থ, কোটি বাঙালির মনের কথা -
“যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরি, যমুনা বহমান,
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিব রহমান।
৫৩
৯১ মন্তব্য