Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ মে, ২০২৩ ০৩:৫৯ অপরাহ্ণ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য।

প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য আমরা মাছের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। পূর্বে এদেশে প্রচুর
মৎস্য পাওয়া যেত এবং এটিই প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হতো । কিন্তু বর্তমানে জলাভূমি কমে যাওয়ায়
মাছের অভাবহেতু ‘মাথাপিছু’ ব্যবহার খুবই কমে গেছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য


সেক্টরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়। দেশে আমিষের চাহিদা পূরণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও গ্রামীণ


দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি পূর্বক দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে তাদের আর্থ-সামাজিক


অবস্থার উন্নয়নে মৎস্য খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে মৎস্য


সম্পদের অবদান হল শতকরা প্রায় ৫ ভাগ এবং মোট রপ্তানী আয়ের ক্ষেত্রে মৎস্য সম্পদের অবদান প্রায় ৫.১২
ভাগ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য শিকার ও মৎস্য
ব্যবসায়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব


অপরিসীম। নিম্নে মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
খাদ্য হিসেবে মৎস্য:
মৎস্য বাংলাদেশের অধিবাসীদের একটি উপাদেয় খাদ্য। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে খনিজ আমিষের প্রায় ৬০%
আসে মাছ থেকে। বর্তমানে দৈনিক গড় মাথাপিছু মাছ সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ২৮ গ্রাম, যেখানে প্রয়োজন


কমপক্ষে ৩৫ গ্রাম। আমাদের খাদ্য তালিকায় যেখানে প্রোটিন এবং পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব রয়েছে সেখানে
মৎস্য সেই অভাব বহুলাংশে মেটাতে পারে।
জীবিকা নির্বাহের উপায়:
নদীবহুল বাংলাদেশের সর্বত্র অসংখ্য ছোট বড়, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, হাওড়, কৃত্রিম জলাশয় রয়েছে। এ
সব জলাশয় বিভিন্ন ধরনের মৎস্যে পরিপূর্ণ। এসব মৎস্য শিকারের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রায় ১২ লাখ ৫২


হাজার লোক জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এছাড়া আরো অনেক লোক পরোক্ষভাবে মৎস্য শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন:
মৎস্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। রপ্তানীকৃত মাছের মধ্যে চিংড়ি মাছের
পরিমানই বেশী। জাতীয় আয়ের প্রায় ৫.৩% এবং দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬% আসে মৎস্য ও মৎস্যজাত
পন্য রপ্তানি থেকে। ২০০০-২০০১ অর্থবছরে ৩৮৯৮৮ মেট্রিকটন মৎস্য ও মৎস্যজাত পন্য রপ্তনি করে


২০৩২.৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে। ২০০১-২০০২ অর্থবছরে ৪২৪৮২ মেট্রিকটন মৎস্য ও মৎস্যজাত পন্য রপ্তানি করে ১৬৭৩.১৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
শিল্পের উপকরণ:
মাছের চর্ম, হাড়, কাঁটা, চর্বি ইত্যাদি কতিপয় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- হাঙ্গর, কচ্ছপ হতে
আহরিত তেল দ্বারা নানা ধরনের ওষুধ, বার্নিশ, গিøসারিন, সাবান ইত্যাদি প্রস্তুত করা হয়। আবার চামড়া
প্রক্রিয়াজাত করনেও এসব মৎস্য তেল ব্যবহৃত হয়।
আনুষাঙ্গিক শিল্পের উন্নতি:
মৎস্য শিল্পকে কেন্দ্র করে কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্পূরক শিল্প গড়ে উঠেছে। যেমন- নৌকা ও জাল তৈরীর
কারখানা, বরফ ও লবন উৎপাদন কারখানা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের মৎস্য ক্ষেত্রসমূহ:
বাংলাদেশের নদী-নালা, খালবিল, পুকুর-ডোবা, হাওড়-বাঁওড়, নদীর মোহনা, উপকূল ও সমুদ্র অঞ্চল ইত্যাদি
মৎস্যের প্রধান ক্ষেত্র। এছাড়া কৃত্রিম জলাশয়, ধান ও পাট ক্ষেতও মৎস্যের ক্ষেত্র হিসেবে পরিগনিত।
বাংলাদেশের এ সকল মৎস্য ক্ষেত্রে প্রায় ২৫০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত ও বদ্ধ
জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৪.৪ লক্ষ হেক্টর। বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ১২হাজার হেক্টর পরিমান
জমিতে মৎস্য ক্ষেত্র রয়েছে। এসব মৎস্য ক্ষেত্র থেকে ধৃত মৎস্যের পরিমান প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক
টন। মৎস্যের উৎপাদন ক্ষেত্রের অবস্থান অনুযায়ী তাদের ২টি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-
ক. অভ্যন্তরীন মৎস্য ক্ষেত্র ও
খ. সামুদ্রিক মৎস্য ক্ষেত্র।
সারণীঃ ৩.৭.১ : বাংলাদেশের মৎস্য ক্ষেত্রের পরিমান (হেক্টর হিসেবে)
মৎস্য ক্ষেত্রের প্রকার পরিমাণ (হেক্টর হিসেবে)
১. পুকুর এবং ডোবা ৬৯,৪৫৫.৪২
২. খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় ২,৯৩০০২.৮০
৩. নদী-নালা ৮,৩০,১২০.৬৪
৪. কর্নফুলী কাপ্তাই হ্রদ ৯০,৬৫২.৮০
৫. নদীর মোহনা, সুন্দরবন অঞ্চল ১৮,২৯২.০০
৬. ধানক্ষেত ও পাট ক্ষেত (৪-৫ মাসের বেশি
যে ক্ষেত্রে পানি থাকে)
১০,১১,৭৫০.০০
৭. উপক‚ল ও সমুদ্র অঞ্চল ১০,১১,৭৫০.০০
সর্বমোট- ১,১১,১২,৫৮৫.৮৬
ক. অভ্যন্তরীন বা মিঠা পানির মৎস্য ক্ষেত্র:
বাংলাদেশের নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, হাওড়-বাঁওড়, ধান ও পাট ক্ষেত এবং নদীর মোহনা
ইত্যাদিকে অভ্যন্তরীন মৎস্য ক্ষেত্র বলে। এ সকল অঞ্চলের ধৃত মৎস্যকে অভ্যন্তরীন বা মিঠা পানির মৎস্য বলা
হয়। অভ্যন্তরীন মিঠা পানির মৎস্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মৎস্যের মধ্যে রয়েছে ইলিশ, রুই, কাতলা, মৃগেল,
চিতল, আইড়, বোয়াল, পাঙ্গাশ, শোল, কই, মাগুর, শিং, চিংড়ি, পাবদা, সরপুটি ইত্যাদি।
খ. সামুদ্রিক মৎস্য ক্ষেত্র:
মৎস্য শিল্পে উন্নত না হলেও বাংলাদেশ মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ । দেশের বিভিন্ন জলাশয় নানা ধরনের মাছ ও মাছ
জাতীয় সম্পদে পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন জলাশয় হতে প্রচুর মৎস্য ধৃত হলেও , সামুদ্রিক সম্পদ
আহরণের পরিমান খুবই কম। ১৯৮৪-১৯৯৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, মোট ধৃত মৎস্যের পরিমাণ
৬৩% থেকে কমে গিয়ে ৪৬% দাঁড়িয়েছে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- রুপচাঁদা, লইট্যা, ছুড়ি,
সুরমা প্রভৃতি। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রন এলাকায় সমন্বিত মৎস্য চাষ উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহন
করা হয়েছে। ২০০১ সালের হিসাব অনুযায়ী সরকারী পর্যায়ে ১১২ টি এবং বেসরকারী পর্যায়ে ৬৬৭ টি সহ
সর্বমোট ৭৭৯ টি মৎস্য হ্যাচারি ও খামার রয়েছে। এছাড়া বেসরকারী পর্যায়ে প্রায় ১৭০০ টি মৎস্য খামার
আছে। নিম্নে অবদান অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের মৎস্য সম্পদের বাৎসরিক উৎপাদনের পরিমাণ
(১৯৯৯/২০০০ থেকে ২০০২/০৩) তুলে ধরা হলো।
সারণী : ৩.৭.২: বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের মৎস্য সম্পদের উৎপাদন ঃ
জলাশয়ের বিবরণঃ আয়তন
(লক্ষ হে:)
৯৯/২০০০ ২০০০/০১ ২০০১/০২ ২০০২/০৩
১। অভ্যন্তরীন জলাশয়
ক. মুক্ত জলাশয়
উৎপাদন
(মে.টন)
উৎপাদন (মে.টন) উৎপাদন
(মে.টন)
উৎপাদন
(মে.টন)
নদী ও নদী মোহনা ১০.৩২ ১.৫৪ ১.৫০ ১.৬৫ ১.৭৯
সুন্দরবন --- ০.১১ ০.১২ ০.১৩ ০.১৪
ডবল ১.১৪ ০.৭৩ ০.৭৫ ০.৮০ ০.৮৯
কাপ্তাইলেক ০.৬৯ ০.০৭ ০.০৭ ০.০৮ ০.০৮৯
প্লাবনভূমি ২৮.৩৩ ৪.২৫ ৪.৪৫ ৪.৫০ ৫.০১
মোট মুক্ত জলাশয় ৪০.৪৭ ৬.৭০ ৬.৮৯ ৭.১৬ ৭.৯২
খ. বদ্ধ জলাশয়
পুকুর
২.৪২ ৫.৬১ ৬.১৬ ৬.৫০ ৭.২৩
বাওড় ০.০৫ ০.০৪ ০.০৪ ০.০৫ ০.০৫
চিংড়ি খামার ১.৪১ ০.৯২ ০.৯৩ ১.০০ ১.১১
মোট বদ্ধ জলাশয় ৩.৮৮ ৬.৫৭ ৭.১৩ ৭.৫৫ ৮.৪০
মোট অভ্যন্তরীন ৪৪.৩৬ ১৩.২৮ ১৪.০২ ১৪.৭০ ১৬.৩২
২। সামুদ্রিক জলাশয়
ক. বণিজ্যিক ভিেিত
০.৪৮ ০.১৬ ০.২৪ ০.৩০ ০.৩৩
খ. আর্টিসনাল ভিভিতে --- ৩.১৮ ৩.৫৫ ৩.৭০ ৪.১২
মোট সামুদ্রিক --- ৩.৩৪ ৩.৭৯ ৪.০০ ৪.৪৫
দেশের মোট মৎস্য উৎপাদন ১৬.৬১ ১৬.৬১ ১৭.৮১ ১৮.৭০ ২০.৭৭
সংগৃহীত 

মন্তব্য করুন

ব্লগ