সহকারী শিক্ষক
১১ নভেম্বর, ২০২৩ ০৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সুদ ও সুদের পরিচিতি
সুদের আরবী হচ্ছে 'রিবা। 'রিবা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অতিরিক্ত, বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। শরি'আতের পরিভাষায় মূলধনের অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করাকে রিবা বা সুদ বলা হয়। আল্লামা জাফর আহমদ উসমানী (র,) 'আহকামূল কুরআন' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যেঃ
'রিবা' -এর আভিধানিক অর্থ অতিরিক্ত। কুরআন মাজীদে রিবা বলে, ঐ অতিরিক্ত পরিমাণকে বুঝানো হয়েছে, যার মুকাবিলায় কোন বিনিময় মেই।
ফকীহগণের মতে, রিবা সুদ দুই প্রকারঃ (১) রিবান নাসিয়া-মেয়াদী সুদ, (২) রিবাল ফাযল -মালের সুদ।
কোন ব্যক্তি অপর কারো নিকট হতে কোন জিনিস নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ফেরত দেওয়ার শর্তে জিনিসের সাথে যে অতিরিক্ত পরিমাণ বস্তু তাকে প্রদান করে, এ অতিরিক্ত পরিমাণকে 'রিবান নাসিয়া' বলা হয়।
রিবা-এর অনুরূপ সংজ্ঞা হাদীসেও বর্ণিত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেনঃ
যে ঋণ কোন মুনাফাকে টেনে আনে তাই রিবা।
অতএব, কোন ব্যক্তি যদি অপর এক ব্যক্তিকে এই শর্তে একশত টাকা ঋণ দেয় যে, মায়াদ শেষে খাতক ঋণদাতাকে একশত বিশ টাকা পরিশোধ করবে। এ ক্ষেত্রে বিশ টাকার কোন বিনিময় নেই। তাই এ বিশ টাকা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। জাহেলী যুগে আরবে এরূপ লেনদেনের প্রচলন খুবই বেশি ছিল। তৎকালে আরবে এরূপ নিয়মও বিদ্যমান ছিল যে, খাতক নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সুদে-মূলে পরিশোধ করতে না পারলে ঋণদাতা তার মূলধনের সাথে অতিরিক্ত পাওনা যোগ করে সম্পূর্ণ টাকার উপর পূনরায় নির্দিষ্ট হারে সুদ আদায় করার শর্তে ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দিত। এরূপ করাকে চক্রবৃদ্ধি সুদ বলা হয়। মেয়াদী সুদ ও মেয়াদী সুদের উপর চক্রবৃদ্ধি সুদ উভয়ই ইসলামে হারাম।
বস্তুত একই জাতের দ্রব্য ও মুদ্রার লেনদেন কালে একপক্ষ চুক্তি মোতাবেক অপর পক্ষকে শরী'আত সম্মত বিনিময় ব্যতীত যে বর্ধিত মাল প্রদান করে, তাকে 'মালেরসুদ' বলা হয়। 'মু'জামুল লুগাতিল ফুকাহা' গ্রন্থে মালের সুদ -এর নিম্নোক্ত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছেঃ
একই শ্রেণীভূক্ত খাদ্যশস্যের পারস্পরিক ক্রয়-বিক্রয় কালে একপক্ষ অপর পক্ষকে এ মাল হতে যে বর্ধিত অংশ প্রদান করে, তাকে মালের সুদ বলা হয়। সুতরাং এক মণ ধানের নিনিময়ে দেড় মন ধান গ্রহণ করা হলে যেহেতু অতিরিক্ত অর্ধ মণের কোন বিনিময় নেই, তাই এ অতিরিক্ত অংশ সুদ হিসাবে গণ্য হবে।
'রিবা আল-ফাযল' তথা মালের সুদ হারাম হওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ লেনদেন করা হলে, তা সমান সমান ও নগদ হতে হবে। কেউ যদি অতিরিক্ত কিছু প্রদান করে অথবা অতিরিক্ত দাবী করে, তবে তা সুদ হবে, সুদ গ্রহণকারী ও প্রদানকারী এতে উভয়ই সমান পাপী হবে।
এ ছয় প্রকার বস্তুর থেকে প্রত্যেক প্রজাতির বস্তুর পরস্পর আদল-বদলের সময় কম-বেশি করা হলে বা কম-বেশি করে বাকীতে বিক্রি করা হলে, তা সুদের আওতাভূক্ত হবে। কিন্তু দুই প্রজাতির বস্তু নগদ লেনদেন করা হলে পরিমাণে যেরূপ ইচ্ছা ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।
এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, রিবা হারাম হওয়ার হুকুম এই ছয় বস্তুর সাথে খাস নয়। বরং এই ছয় প্রকার বস্তুর ন্যায় আরো যত বস্তু রয়েছে সবগুলোর মধ্যেই এই হুকুম সমভাবে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ কোন বস্তুর পারস্পরিক লেনদেনে কম-বেশি করা হলে, তখনই তা সুদে পরিণত হবে, যদি উভয়ের মধ্যে যুগপৎভাবে নিম্নক্ত দু'টি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকেঃ ১. বস্তু দু'টি একই প্রজাতির হলে, ২. ওযন বা পরিমাপের দ্বারা এগুলোর পরিমাণ নির্ধারণ করা হলে। কোন বস্তুতে উক্ত বৈশিষ্ট্য দু'টির কোন একটী বিদ্যমান না থাকলে লেনদেনে কম-বেশি করা হলেও তাতে সুদ হবে না।
উল্লেখ্য, সুদ, রিবা এবং ইন্টারেস্ট একই জিনিস। এগুর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। একান্ত স্থূলবুদ্ধি ও অবিবেকী লোকেরাই কেবল রিবা এবং সুদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে থাকে।
৭৩
১৪৬ মন্তব্য