Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০২:৩৩ অপরাহ্ণ

বজ্রপাত কেন হয়? বাঁচার উপায় কী?

জাতিসংঘের তথ্য মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ৩০০ মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে মারা যায় মাত্র ২০ জন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বজ্রপাতের অন্যতম হটস্পট। আর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সিলেটে। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে, বা বলা যায় বৈশাখে দেখা যায় বজ্রপাত। শৈশবে আম্মার কাছে শুনেছি, মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাত হয়। একটা পাথর অন্য পাথরের সঙ্গে ঘষলে যেমন তাপ উৎপন্ন হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে, সেরকম। আম্মার বলা সেই কথাটাই বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করব আজ।

সে জন্য স্থির তড়িৎ সম্পর্কে জানতে হবে। তার আগে জানতে হবে চার্জ সম্পর্কে। নিশ্চয়ই জানেন, সব বস্তু অসংখ্য ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। এর নাম পরমাণু। প্রতিটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস। এর ভেতরে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন। এদের ভর প্রায় সমান। প্রোটন ধনাত্মক আধানযুক্ত, আর নিউট্রন নিরপেক্ষ। মানে এর কোনো আধান বা চার্জ নেই। আর নিউক্লিয়াসের চারপাশে অবিরত ঘুরতে থাকে একটি কণা—ইলেকট্রন। এটি ঋণাত্মক আধানযুক্ত। স্বাভাবিক অবস্থায় পরমাণুতে ইলেকট্রন ও প্রোটন সংখ্যা সমান থাকে। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় পরমাণু হয় তড়িৎ নিরপেক্ষ। তবে বেশির ভাগ পরমাণুই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইলেকট্রনের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তাই দুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে এলে যে বস্তুর ইলেকট্রন আসক্তি বেশি, সে অন্য বস্তু থেকে মুক্ত ইলেকট্রন সংগ্রহ করে। ফলে ঋণাত্মক আধান প্রাপ্ত হয়। আর যে বস্তু থেকে ইলেকট্রন চলে আসে, সেটি হয় ধনাত্মক আধান যুক্ত। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

শীতকালে প্লাস্টিকের চিরুনি দিয়ে  চুল আঁচড়ে ছোট কাগজের টুকরার সামনে চিরুনি ধরলে, চুম্বকের মতো চিরুনিতে কাগজের টুকরাগুলো আটকে যায়। এ ক্ষেত্রে চুলের সঙ্গে চিরুনির ঘর্ষণের ফলে চিরুনিটি চার্জিত হয়েছে। আসলে চুল থেকে ইলেকট্রন চিরুনিতে গিয়ে চিরুনি ঋণাত্মকভাবে চার্জিত হয়। কাগজ, চুল ও  চিরুনি অপরিবাহী হওয়ায় উৎপন্ন চার্জ পরিবহন করা বা এর প্রবাহ সম্ভব হয় না। কিন্তু তড়িৎ আবেশের কারণে কাগজের টুকরা ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। ফলে চিরুনি ও কাগজের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি হয়।

তড়িৎ আবেশ কী

একটি চার্জিত বস্তুকে একটি চার্জ নিরপেক্ষ পরিবাহীর কাছে এনে সেটাকে সাময়িকভাবে চার্জিত করার পদ্ধতিকে তড়িৎ আবেশ বলে। এ সময় দুই প্রান্তে দুই ধরনের চার্জ সৃষ্টি হয়। চার্জিত বস্তু সরিয়ে নিলে  পরিবাহীর চার্জ লোপ পায়।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।একটি কাচদণ্ড A-কে  রেশমী কাপড় দিয়ে ঘষে পজিটিভ চার্জে চার্জিত করা হলো। চার্জ নিরপেক্ষ পরিবাহীকে BC-এর কাছে আনা হলো। দেখা যাবে, কাচদণ্ডটির কাছের প্রান্ত B-তে কাচদণ্ডের বিপরীত চার্জ ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয়েছে। আর কাচদণ্ডটির দূরের প্রান্ত C-তে কাচদণ্ড চার্জিত হয়েছে ধনাত্মক চার্জে। ঘর্ষণের ফলে বস্তুর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভারসাম্য নষ্ট হলে সেই বস্তু চার্জিত হয়। বস্তুর এই চার্জ স্থির থাকে বলে একে স্থির চার্জ বলে। একই ঘটনা ঘটে বজ্রপাতের সময় মেঘের মধ্যে। মেঘ হচ্ছে বজ্রপাতের ব্যাটারি। চার্জ হয় দুই ধরনের। পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ ।

সৌররশ্মি পানিতে পড়লে পানি বাষ্পীভূত হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়।

মেঘ যেভাবে চার্জিত হয়

পানিচক্রের পানিকণা ক্রমে ওপরে উঠতে শুরু করে। একসময় মেঘে থাকা পানিকণার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ফলে ওপরে উঠতে থাকা বাষ্পের পরমাণু কিছু ইলেকট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেকট্রন হারায়, সে পরামাণু ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। আর যে পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করে, সেটি চার্জিত হয় ঋণাত্মক চার্জে। যেমন চিরুনি ও কাগজের পরীক্ষা। এতে মেঘের মধ্যে স্থির চার্জ তৈরি হয়। আর চার্জ স্থির থাকলে তৈরি হয় স্থির বিদ্যুৎ। এই স্থির বিদ্যুৎ পরিবহনের কোনো মাধ্যম থাকে না। ফলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ মিলিত হয়ে নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ হতে চেষ্টা করে। তখন সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। ইংরেজিতে একে বলে লাইটিনিং।

বজ্রপাত তিন ধরনের হয়। ক্লাউড লাইটিনিং (মেঘের ভেতরে), ক্লাউড টু ক্লাউড লাইটিনিং (এক মেঘ থেকে অন্য মেঘে বজ্রপাত) ও ক্লাউড টু গ্রাউন্ড লাইটিনিং (মেঘ থেকে মাটিতে বজ্রপাত)। কোনো মেঘ নিজেদের মধ্যে চার্জ বিনিময় করলে সৃষ্টি হয় ক্লাউড লাইটিনিং। এতে ভোল্টেজ থাকে খুব কম। ফলে আওয়াজ হয় না। আর ক্লাউড টু ক্লাউড লাইটিনিংয়ে বড় মেঘ থাকে ওপরে, আর ছোট মেঘ নিচে। এই মেঘের কারণে বজ্রপাত হলে আলো ও শব্দ—দুই-ই সৃষ্টি হয়। আর ক্লাউড টু গ্রাউন্ড লাইটনিংয়ে মেঘের নিচের দিকে ভারী নেগেটিভ চার্জ জমা হতে থাকে। মেঘের মধ্যে এ ধরনের চার্জ বাড়তে বাড়তে শক্তিশালী ধারকে পরিণত হয়। এই ধারক চার্জ সঞ্চয় করে রাখে। এ সময় তড়িৎ আবেশ প্রক্রিয়ায় বিপরীতধর্মী চার্জ, অর্থাৎ ধনাত্মক চার্জ তৈরি হয় ভূপৃষ্ঠে। এই দুই বিপরীতধর্মী চার্জ আকর্ষণ বল সৃষ্টি করে ধ্বংস হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এদের মাঝে কিছু কুপরিবাহী বায়ু থাকে বলে ঋণাত্মক চার্জ ও ধনাত্মক চার্জ মিলিত হতে পারে না। ফলে ভূমির ওপর ধনাত্মক চার্জ বাড়তে থাকে।

বিদ্যুৎ কাকে বলে

বিদ্যুৎ হলো কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে ইলেকট্রনের প্রবাহ। মেঘের মধ্যে জমা হওয়া ইলেকট্রনগুলো পরিবাহকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেই বিদ্যুৎ প্রবাহ পাওয়া যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মাধ্যম, মানে কুপরিবাহী বায়ুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে না। মেঘের মধ্যে ঋণাত্মক চার্জ এবং আবেশ প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠে ধনাত্মক চার্জ বাড়তে থাকে। ফলে মেঘে জমা হওয়া স্থির বিদ্যুৎ তৈরি করে বিপুল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। মানে চার্জের চারপাশের যে স্থানব্যাপী প্রভাব থাকে, সেটাই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। আমাদের বাসা-বাড়ির বিদ্যুৎ সাধারণত ২২০ ভোল্টেজের হয়। এগুলো দিয়েই আমরা লাইট, ফ্যান, ফ্রিজ বা টিভি চালাই। কিন্তু মেঘে যে উচ্চ ভোল্টেজ তৈরি হয়, তার ভোল্টেজ প্রায় ১০ কোটি ভোল্ট। ভোল্টেজ এত বেশি হওয়ায় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র হয় প্রবল শক্তিশালী। ফলে আশপাশের বাতাস ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জে বিভক্ত হয়ে যায়। এই আয়নিত বাতাস প্লাজমা নামে পরিচিত। বাতাস আয়নিত হয়ে মেঘ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ তৈরি করে দেয়। ফলে ধনাত্মক চার্জ ও ঋণাত্মক চার্জ মিলে বজ্রপাত ঘটায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ