সিনিয়র শিক্ষক
০১ জুলাই, ২০২৫ ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ
সংকটাপন্ন বুদ্ধিমান পাখি ময়না
বুদ্ধিমান পাখি ময়না,একটি বিপন্ন কণ্ঠস্বর
বৈজ্ঞানিক নাম: Gracula religiosa
পরিবার: Sturnidae
বাংলা নাম: ময়না
ইংরেজি নাম: Common Hill Myna
পরিচিতি
ময়না মাঝারি কালো রঙের পাখি। এর দৈর্ঘ্য কমবেশি ২৯ সেমি, ডানা ১৭ সেমি, ঠোঁট ৩ সেমি, পা ৩.৫ সেমি, লেজ ৮ সেমি ও ওজন ২১০ গ্রাম। ভাত শালিকের (Acridotheres Tristis) তুলনায় এটি আকারে একটু বড়। সাধারণ অবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক পাখিকে পুরোপুরি চকচকে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দেখায়। প্রজননের সময় মাথা আর ঘাড়ে হালকা বেগুনী আভা দেখা যায়। পালকহীন চামড়ার পট্টি হলুদ এবং চোখের নিচে, মাথার পাশে ও পেছনে মাংসল উপাঙ্গ থাকে। ওড়ার সময় ডানার সাদা পট্টি স্পষ্ট দেখা যায়, এমনিতে বসে থাকলে ডানা দিয়ে তা ঢাকা থাকে। চোখ কালচে বাদামি। ঠোট শক্ত ও হলুদ, ঠোঁটের আগা কমলা রঙের। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ঠোঁট তুলনামূলক অনুজ্জ্বল হলদে-কমলা। মাংসল উপাঙ্গ ফিকে হলুদ এবং পালক কম উজ্জ্বল। বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের ময়না পাখি দেখা যায়। বান্দরবান, সিলেট, ময়মনসিংহ জেলায় এদের বিচরণ।
ময়নার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—অসাধারণ স্বরনকলি। এ পাখিটি মানুষের ভাষা নকল করতে পারে নিখুঁতভাবে, যা একে জনপ্রিয় করে তুলেছে খাঁচায় পালার উপযোগী পাখি হিসেবে।
প্রকৃতিতে এদের ডাকার ধরণ খুব স্বতন্ত্র ও সুরেলা। কখনো টানা সুর, কখনো ভিন্ন রকম শব্দের অনুকরণ এদের স্বাভাবিক আচরণ।
স্বভাব ও আচরণ
ময়না সামাজিক স্বভাবের পাখি। এরা সাধারণত জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে।
দিনের বেলায় খাদ্য সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে।
ফলমূল, পোকামাকড়, ফুলের রস, কৃমি ইত্যাদি এদের প্রধান খাদ্য।
গাছে গাছে উড়ে বেড়ানো এবং এক গাছ থেকে আরেক গাছে দোল খাওয়ার মতো ভঙ্গিতে লাফিয়ে চলা এদের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
স্ত্রী-পুরুষ ময়না আজীবনের জন্য জোড়া বাঁধে। সঙ্গী না মারা যাওয়া পর্যন্ত ওদের জোড় অটুট থাকে। এরা বছরে একবার ডিম দেয়। প্রজনন মৌসুম বর্ষাকাল। এপ্রিল-জুলাই মাসে বনের ধারে বড় আকৃতির গাছের ১০-১৫ মিটার উঁচুতে কাঠঠোকরার সৃষ্ট কোটরে ঘাস, পালক ও আবর্জনা দিয়ে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো নীল, সংখ্যায় দুই-তিনটি। ডিমের মাপ ৩.৬ × ২.৬ সেমি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৪-১৫। ছানারা উড়তে শিখলেই মা-বাবার কাছ থেকে সরে পড়ে।
আবাসস্থল ও পরিবেশ
ময়না মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমি, পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং ঘন জঙ্গলকে আবাসস্থল হিসেবে পছন্দ করে।
বাংলাদেশে আগে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চলে এদের প্রাচুর্য ছিল।
এছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ইত্যাদি দেশে প্রাকৃতিক পরিবেশে ময়না দেখা যায়।
সংকট ও বিপন্নতা
বর্তমানে ময়না পাখি বাংলাদেশে সংকটাপন্ন (endangered) হিসেবে বিবেচিত। এর প্রধান কারণ হলো:
1. অবাধ বন উজাড়: বসতি সম্প্রসারণ ও কাঠ পাচারের ফলে ময়নার প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে।
2. অবৈধ শিকার ও খাঁচায় পালা: ময়নার কথা বলার ক্ষমতার কারণে একে শিকার করে খাঁচায় বিক্রির প্রবণতা ভয়াবহ মাত্রায় বেড়েছে।
3. খাদ্য সংকট: বনভূমির ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ফলজ গাছ ও প্রাকৃতিক খাদ্যও কমে যাচ্ছে।
4. জেনেটিক হ্রাস: খাঁচায় প্রজনন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে ব্যাহত করছে, যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
সংরক্ষণ প্রয়োজন
ময়নাকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
✅ প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ: বিশেষ করে দেশীয় ফলজ গাছ, যেমন: জাম,চন্দুল,শাপালিশ, ডেউয়া, কাঁঠাল, তেঁতুল, উড়িআম ইত্যাদি।
✅ অবৈধ শিকার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
✅ জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা ও গণমাধ্যমে প্রচারণা।
✅ সাংস্কৃতিক ও স্কুল পাঠ্যবইয়ে দেশীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে অন্তর্ভুক্তি।
✅ উপযুক্ত স্যাংচুয়ারি (অভয়ারণ্য) গড়ে তোলা, যেমন: দোলাহাজারা সাফারি পার্কে ময়নাদের অবমুক্ত করা।
উপসংহার
ময়না শুধু একটি পাখি নয়, বরং আমাদের প্রকৃতির এক অমূল্য কণ্ঠস্বর। যদি আমরা একে রক্ষা করতে না পারি, তবে প্রকৃতি থেকে এক সুরেলা ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সকলে মিলে ময়নাকে রক্ষা করি—প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
✍️ : মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রামু,কক্সবাজার।
১৩
১৫ মন্তব্য