সহকারী শিক্ষক
১৭ জুলাই, ২০২৫ ০১:৩৫ অপরাহ্ণ
পাট চাষ পদ্ধতি (কিভাবে পাট চাষ করবেন)
পাট বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থকরী ফসল, যা 'সোনালি তন্তু' নামে পরিচিত। আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতিতে পাট চাষ করলে ফলন বৃদ্ধি পায় এবং কৃষকের আয় বাড়ে। এখানে পাট চাষের বিস্তারিত পদ্ধতি আলোচনা করা হলো:
১. মাটি ও জমি নির্বাচন
* মাটি: পাট চাষের জন্য দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। উঁচু ও মধ্যম উঁচু জমি যেখানে বৃষ্টির পানি জমে না, এমন জমি নির্বাচন করা উচিত।
* জমি তৈরি: জমিতে আড়াআড়িভাবে ৫-৬টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। ঢেলা গুঁড়ো করতে হবে এবং জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
২. পাটের জাত নির্বাচন ও বপন সময়
আঁশ ফসলের জন্য প্রধানত চার ধরনের পাট রয়েছে: দেশী পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তা পাট।
* দেশী পাট:
* জাত: সিসি-৪৫, বিজেআরআই দেশী পাট-৫, বিজেআরআই দেশী পাট-৬, বিজেআরআই দেশী পাট-৭, বিনা দেশী পাট-২।
* বপন সময়: চৈত্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সারা চৈত্র মাস পর্যন্ত দেশী পাট বপনের উপযুক্ত সময়। তবে কিছু জাত ফাল্গুন মাসের শেষ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্তও বপন করা যায়।
* তোষা পাট:
* জাত: ও-৯৮৯৭, ওএম-১, বিজেআরআই তোষা পাট-৪, বিজেআরআই তোষা পাট-৮ (রবি-১)।
* বপন সময়: ১ চৈত্র থেকে ১৫ বৈশাখ মাস পর্যন্ত তোষা পাট বপন করা যায়।
* কেনাফ:
* জাত: এইচ সি-২, এইচ সি-৯৫।
* বপন সময়: ১৬ চৈত্র থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত।
* মেস্তা:
* জাত: এইচ এস-২৪।
* বপন সময়: ১ চৈত্র থেকে ৩০ বৈশাখ পর্যন্ত।
৩. বীজ বপন পদ্ধতি ও বীজ হার
* বপন পদ্ধতি: সাধারণত ছিটিয়েই পাট বীজ বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করলে পাটের ফলন বেশি হয়।
* সারি পদ্ধতি: সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট) এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ৭-১০ সেন্টিমিটার (৩-৪ ইঞ্চি) রাখা ভালো।
* বীজ হার:
* ছিটিয়ে বুনলে: প্রতি শতাংশে ২৫-৩০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। হেক্টরপ্রতি ৬.৫-৭.৫ কেজি।
* সারিতে বুনলে: প্রতি শতাংশে ১৭-২০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। হেক্টরপ্রতি ৩.৫-৫.০০ কেজি।
* বীজ শোধন: বপনের আগে স্বাস্থ্যকর বীজ নির্বাচন করে শোধন করে নেওয়া উচিত। কিছু রাইজোবিয়াম সংস্কৃতি এবং গুড়ের দ্রবণ দিয়ে বীজ শোধন করা যেতে পারে।
৪. সার প্রয়োগ
ভালো ফলনের জন্য সুষম সার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* গোবর সার: জমি প্রস্তুতের ২-৩ সপ্তাহ আগে হেক্টরপ্রতি ৩.৫ টন গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে।
* রাসায়নিক সার:
* বপনের সময়: শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া, ১৭ কেজি টিএসপি এবং ২২ কেজি এমওপি সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
* পরবর্তী প্রয়োগ: বীজ বপনের ৬-৭ সপ্তাহ পর (চারার বয়স ৪০-৪৫ দিন হলে) ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার ও চারা পাতলা করার পর হেক্টরপ্রতি ১০০ কেজি ইউরিয়া সার জমিতে পুনরায় ছিটিয়ে দিতে হবে। সার দেওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা জরুরি।
৫. আগাছা দমন ও চারা পাতলাকরণ
* বীজ বপনের ১৫-২১ দিনের মধ্যে প্রথম নিড়ানি দিতে হবে।
* ৩৫-৪২ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হবে এবং অতিরিক্ত চারা পাতলা করে দিতে হবে। এতে গাছগুলো ভালোভাবে বাড়তে পারবে।
৬. সেচ ও নিষ্কাশন
পাটে সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না, কারণ এটি বর্ষাকালীন ফসল। তবে মাটি বেশি শুষ্ক হলে বা অতিরিক্ত খরা দেখা দিলে গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে একবার পানি সেচের প্রয়োজন হতে পারে। পাট জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই জমিতে যাতে পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৭. পোকামাকড় ও রোগ ব্যবস্থাপনা
পাটে সাধারণত পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ কম দেখা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে:
* বিছাপোকা: কচি ও বয়স্ক পাতা খেয়ে ফেলে। আক্রমণের প্রথম অবস্থায় কীড়াসহ পাতাগুলো সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলা উচিত। প্রয়োজনে ডায়াজিনন ৬০% তরল/নুভক্রিন ৪০% তরল/ইকালাক্স ২৫% তরল নির্দিষ্ট মাত্রায় স্প্রে করা যেতে পারে।
* ঘোড়া পোকা: ডগার দিকের কচি পাতা খেয়ে ফেলে। কেরোসিনে ভেজানো দড়ি গাছের ওপর দিয়ে টেনে অথবা ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে এদের দমন করা যায়।
* আগা মরা বা কান্ড পচা রোগ: রোগাক্রান্ত গাছগুলো উপড়ে ফেলে ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক ৩ দিন পরপর ৩ বার স্প্রে করা যেতে পারে।
* মাকড়: মাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে সিনমেকটিন ১.৮ ইসি বা অ্যামবুশ ১.৮ ইসি গাছের উপরের দিকের কচি পাতার নিচের পৃষ্ঠে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
৮. পাট কাটা ও জাগ দেওয়া
* ফসল সংগ্রহ: পাটের আঁশ পাওয়ার জন্য পাট গাছে ফুল আসার সময় বা বীজ আসার আগে পাট কাটতে হয়। সাধারণত বীজ বপনের ৪ থেকে ৫ মাস পর পাট কাটার উপযুক্ত সময় হয়।
* জাগ দেওয়া: পাট গাছ কাটার পর ১০-১২টি গাছ একত্রে আঁটি বেঁধে ৩-৪ দিন জমিতে খাড়া করে রেখে পাতা ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর পাট জাগ দেওয়ার জন্য নিকটবর্তী জলাশয়ে নিতে হবে।
* প্রবহমান পানি: ভালো মানের আঁশ পাওয়ার জন্য প্রবহমান পানিতে পাট জাগ দেওয়া শ্রেয়। পানির প্রবাহের গতি প্রতি ঘণ্টায় এক-চতুর্থাংশ মাইলের বেশি হলে ভালো হয়।
* বদ্ধ পানি: বদ্ধ পানিতে পাট জাগ দিলে আঁশ কালো হয়ে যায়। তবে বদ্ধ পানিতে জাগ দিলে প্রতি ১০০ আঁটি পাটের জন্য ১ কেজি ইউরিয়া সার সরাসরি জাগের আঁটির সারিতে ছিটিয়ে দিলে পাট দ্রুত পচে এবং আঁশের মান ভালো হয়।
* রিবন রেটিং পদ্ধতি: এটি একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে পাট থেকে ছাল ছাড়িয়ে সেই ছাল পচানো হয়। এর জন্য মিনি পুকুর বা গর্ত তৈরি করা যেতে পারে এবং কিছু পাট পচানো পানি মিশিয়ে দিলে দ্রুত পচন নিশ্চিত হয়।
* আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো: সাধারণত ১৫-১৮ দিনের মধ্যে পাট পচে যায়। এরপর আঁশ ছাড়িয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ায় ভালোভাবে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।
৯. বীজ উৎপাদন (যদি প্রয়োজন হয়)
আঁশ ফসলের জন্য বপন করা গাছের বয়স ৯৫-১০০ দিন হলে সুস্থ ও সতেজ গাছের উপরের অংশ থেকে প্রায় ৩০-৪৫ সেন্টিমিটার কেটে নিয়ে প্রতিটিকে এমনভাবে ২-৩ টুকরা করতে হবে যেন প্রতি টুকরায় কমপক্ষে ২টি পর্ব বা গিঁট থাকে। এই কাটা টুকরোগুলো পর্যাপ্ত রস সমৃদ্ধ মাটিতে ৪৫-৮৫ ডিগ্রি কাত করে পুঁতে দিতে হবে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এসব কাটিংস থেকে প্রচুর ডালপালা বের হয়, যা থেকে ভালো মানের বীজ উৎপাদিত হয়। বীজ উৎপাদনের জন্য আগস্ট মাসে কাটিং লাগিয়ে ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কর্তন করা যায়।
আধুনিক চাষ পদ্ধতি: চারা রোপণ পদ্ধতি
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI) পাট চাষের একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যা চারা রোপণ পদ্ধতি নামে পরিচিত।
* সুবিধা: এই পদ্ধতিতে পাটের পূর্ণ জীবনকাল (১২০ দিন) কাজে লাগানো যায়, যা সরাসরি বীজ বপন পদ্ধতিতে অনেক সময় সম্ভব হয় না, বিশেষ করে বোরো ধান কাটার পর জমিতে পাট চাষ করলে। এর ফলে ফলন বৃদ্ধি পায়, আগাছা কম হয় এবং শ্রমিক খরচ কমে।
* পদ্ধতি: প্রথমে অল্প জমিতে পাটের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে ৩৫ দিন পর চারা তুলে জমিতে রোপণ করা হয়। চারা থেকে চারার দূরত্ব ৩-৩.৫ ইঞ্চি এবং দুই সারির মাঝে ১০-১২ ইঞ্চি ফাঁকা রেখে রোপণ করতে হবে। কর্দমাক্ত জমিতে এই নিয়মে রোপণ করলে আগাছা কম জন্মায়।
এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে উন্নত মানের পাট উৎপাদন সম্ভব।
৭০
১৪৪ মন্তব্য