Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:৩৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের প্রকৃতি হতে হারিয়ে যাওয়া গুল্ম: কুঁচ

বাংলার প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত প্রায় গুল্ম: কুঁচ

কুঁচ বা রতি 

ইংরেজি: jequirity, বা Crab's eye,বা rosary pea, বা precatory pea or bean,

 কুঁচ হচ্ছে এক প্রকারের লেগিউম জাতী উদ্ভিদঅনেকে একে কুঁচফল হিসেবে চেনেবাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী এটি  সংরক্ষিত প্রজাতি

অন্যান্য নাম

 বাংলাদেশে এর আঞ্চলিক নামগুলো হচ্ছে: রতি, রত্তি, কুঁচ,লালবিচি, রক্তবিচি, কাব্বিচি,কইচ গোটাঅঞ্চল ভেদে কুঁচের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে।যেমন- রক্তিকা, চূড়ামনি,কৃষ্ণলা, শাঙ্গুষ্ঠা, গুঞ্জা, কম্ভোঞ্জী, সৌম্যা, শিখন্ডী, , অরুণা, তাম্রিকা,  ভিল্লিভূষণা, মাণচূড়াআর কুঁচের সাদা প্রজাতির নাম হচ্ছে শ্বেতগুঞ্জা, ভিরিন্টিকা, কাকাদনীএর লাল প্রজাতির বীজ রক্ত লাল এবং এক পাশ কুচকুচে কালো। বীজের সাইজ প্রায়  এক রত্ত্বির সমান। তাই অতীতকালে এক রতি সোনা মাপা জন্য কুঁচ বীজ ব্যবহার করতেন স্বর্নকারেরা। 

Abrus precatorius -  এটি এক ধরনের দ্রুত বর্ধনশীল লতা জাতীয় উদ্ভিদ, যা তার উজ্জ্বল লাল-কালো বীজের জন্য পরিচিত

 বৈজ্ঞানিক পরিচিতি

বৈজ্ঞানিক নাম: Abrus precatorius

পরিবার: Fabaceae (ডালজাতীয় গাছের পরিবার)

উৎপত্তিস্থান:  ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য

এটি একটি সরু, নরম কান্ডযুক্ত লতা জাতীয় গাছ, যা সাধারণত অন্য গাছ বা কাঠামোর উপর জড়িয়ে বেড়ে ওঠে

এর পাতাগুলি যৌগিক , আমলকির পাতার  মতো

ফুল ছোট, হালকা গোলাপি বা বেগুনি রঙের হয়

ফল মটরশুঁটির মতো  কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকা অবস্থায় ধুসর, গায়ে রুম থাকে। পাকা অবস্থায় ফেটে যায় এবং ভেতরে থাকে চকচকে উজ্জ্বল লাল বীজ - এক পাশে ছোট কালো দাগ থাকেবীজ ত্বক খুবই শক্ত।

বীজের বিশেষত্ব

 উজ্জ্বল লাল-কালো বীজগুলো অত্যন্ত বিষাক্ত

পরিপক্ক বীজ ত্বক খুবই শক্ত, মানবদেহে পরিপাক হয় না।

বীজে থাকে Abrin নামে একটি মারাত্মক বিষাক্ত প্রোটিন, যা Ricin থেকেও ৭৫ গুণ বিষাক্ত বলে জানা যায়

প্রতিটি বীজের আকার ও ভর প্রায় সমান।

মাত্র -২টি কাঁচা বীজ খেলে শিশুদের প্রাণহানি ঘটতে পারে

সাবধানতা

বীজ চিবানো বা গিলে ফেলা মারাত্মক বিপজ্জনকএটি রক্তে হেমোলাইসিস ঘটায় এবং শ্বাসরোধ ঘটাতে পারে

শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা উচিত

চিকিৎসক পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

 ঐতিহ্যিক ব্যবহার

উজ্জ্বল রঙের জন্য অতীতে এই বীজ দিয়ে গহনা, মালা ও অলঙ্কার তৈরি করা হতো

ভারতে ও বাংলাদেশে স্বর্ণের মান মাপার ওজন একক হিসেবেও কাকবিচির বীজ ব্যবহৃত হতো (প্রায় ১ কাকবিচি = ~১ রত্ন বা ০.१२ গ্রাম)

সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা

বন উজাড়, আগাছা দমন ও ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কারণে এই লতা ও বীজ এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে

বিশেষত শহর বা উপশহর এলাকায় এটি খুব একটা দেখা যায় না

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাকবিচির মতো হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদগুলো রক্ষা করা জরুরি

⚠️ সতর্কতা:

কুচের ফলের গায়ে থাকা লোমে মিউকুনিন (mucunain) নামক প্রোটিন থাকে, যা ত্বকে লাগলে তীব্র চুলকানি, জ্বালা ও অ্যালার্জি তৈরি করে

তাই বীজ সংগ্রহের সময় গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত

বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে এটিকে সুলভ হিসেবে বলা হলেও এ উদ্ভিদ কবিরাজ বাড়ির আঙিনা সীমাবদ্ধসংরক্ষণের ব্যবস্থা না হলে অচিরেই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে এই ঔষধি উদ্ভিদটি

ভেষজ ব্যবহার

কুঁচ ভেষজ কাজে লাগেকুঁচের বিষাক্ত অংশ হচ্ছে বীজ ও শিকবিষক্রিয়ার ধরন হলো গর্ভপাতক, বমনকারক, রেচক ও পশুবিষ চিকিতসকের পরামর্শ ব্যতীত ব্যবহার বিপদজনক।

সংরক্ষণ ও চাষ:

এটি এখন বন উজাড়ের কারণে ওষুধি লতা হিসেবে সংকটাপন্ন

চাষের মাধ্যমে সহজেই পুনর্জন্ম সম্ভব, বিশেষ করে জৈব কৃষি চর্চায়

উপসংহার

কুচ গাছ শুধু একটি লতা নয়, এটি একটি প্রাচীন, গুরুত্বপূর্ণ, ও বহু সমস্যার প্রাকৃতিক সমাধান বহনকারী ঔষধি উদ্ভিদএখন প্রয়োজন এর সঠিক চাষ, সংরক্ষণ এবং লোকজ জ্ঞানভিত্তিক পুনঃব্যবহার নিশ্চিত করা

লেখক - মুফিদুল আলম

সিনিয়র শিক্ষক

নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়,

রামু,কক্সবাজার।

 

মন্তব্য করুন