সিনিয়র শিক্ষক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১০:৫১ অপরাহ্ণ
আকাশের রাজা – শকুনের পতন ও প্রত্যাবর্তন
আকাশের রাজা – শকুনের পতন ও প্রত্যাবর্তন
ভূমিকা
শকুন প্রকৃতির অন্যতম আশ্চর্য পাখি। তাকে বলা হয় "আকাশের রাজা"। কারণ তার বিশাল ডানা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও উচ্চ আকাশে ভেসে থাকার ক্ষমতা তাকে অন্যান্য পাখির তুলনায় অনন্য করে তুলেছে। তবে শকুন কেবলমাত্র একটি শক্তিশালী শিকারি পাখি নয়; বরং প্রকৃতির জন্য এক অমূল্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মৃত প্রাণীর দেহ ভক্ষণ করে তারা পরিবেশকে জীবাণুমুক্ত রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এক সময়কার প্রচুরসংখ্যক শকুন আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা হঠাৎ করেই কমে যায় প্রায় ৯৯%। যদিও বর্তমানে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তাদের পুনরুত্থানের কিছু আলোকরেখা দেখা যাচ্ছে। এই প্রবন্ধে শকুনের গুরুত্ব, পতন, প্রত্যাবর্তন ও আমাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।
শকুনের পরিচিতি ও পরিবেশগত গুরুত্ব
শকুনের বৈজ্ঞানিক নাম Gyps bengalensis (White-rumped Vulture) ছাড়াও বাংলাদেশে পাওয়া যায় Slender-billed Vulture (Gyps tenuirostris) এবং Himalayan Griffon। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মৃত প্রাণীর দেহ ভক্ষণকারী হিসেবে শকুন প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
পরিচ্ছন্নতাকারী: মৃত পশুর দেহ দ্রুত খেয়ে ফেলে শকুন। এর ফলে পরিবেশে পচা দুর্গন্ধ ছড়ায় না।
রোগ প্রতিরোধক: শকুন না থাকলে মৃত প্রাণীর দেহে সালমোনেলা, অ্যানথ্রাক্স, র্যাবিসসহ ভয়াবহ জীবাণু ছড়িয়ে মহামারী ঘটাতে পারে।
খাদ্যশৃঙ্খলার অংশ: শকুন হলো শীর্ষ ভক্ষণকারী (Scavenger), যা খাদ্যশৃঙ্খলার ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য।
দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের ঐতিহাসিক প্রাচুর্য
১৯৮০–৯০ দশক পর্যন্ত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে লক্ষাধিক শকুন উড়ে বেড়াতো। শুধু বাংলাদেশেই কয়েক লাখ শকুনের উপস্থিতির কথা নথিভুক্ত আছে। ভারতের গ্রামীণ এলাকায় প্রায় প্রতিটি মৃত গবাদি পশুর দেহ শকুনের দ্বারা দ্রুত ভক্ষণ করা হতো। স্থানীয় লোককথায় শকুনকে "মৃত্যুর পরিশোধনকারী" বলা হতো।
পতনের কারণ
শকুনের পতন আকস্মিক ও ভয়াবহ। গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৯৯% শকুন বিলুপ্ত হয়।
মূল কারণগুলো হলো:
1. ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) ওষুধ: গবাদি পশুর ব্যথা সারাতে ব্যবহৃত এই ওষুধ শকুনের জন্য মারাত্মক বিষ। মৃত পশুর দেহে এ ওষুধ থেকে গেলে শকুন তা খেয়ে কিডনি বিকল হয়ে মারা যায়।
2. বাসস্থান ধ্বংস: বন উজাড়, পাহাড়ি অঞ্চল দখল ও শহুরে সম্প্রসারণ শকুনের বাসস্থান সংকুচিত করেছে।
3. খাদ্যের ঘাটতি: পশুপালন পদ্ধতির পরিবর্তন ও মৃত পশু দ্রুত মাটিচাপা দেওয়ার কারণে খাদ্যের সংকট তৈরি হয়।
4. বিষ প্রয়োগ ও শিকার: গ্রামীণ এলাকায় মাঝে মাঝে বিষ দিয়ে শিয়াল বা কুকুর মারতে গিয়ে শকুনও মারা পড়ে।
বাংলাদেশে শকুনের অবস্থা
বাংলাদেশে আগে প্রচুর শকুন দেখা যেত। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে তা দ্রুত কমতে থাকে। বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চল (রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁ), সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে কিছু শকুন অবশিষ্ট রয়েছে। বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শকুনের সংখ্যা এখন কয়েকশ’ মাত্র।
শকুন সংরক্ষণ কর্মসূচি
বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা (IUCN, BirdLife International) শকুন সংরক্ষণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
1. ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ (২০১০): পশু চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করা হয়। বিকল্প হিসেবে নিরাপদ Meloxicam ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।
2. শকুন নিরাপদ এলাকা: সুন্দরবন, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর ও টাঙ্গাইলকে শকুনের নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে।
3. কমিউনিটি সচেতনতা: স্থানীয় জনগণকে শকুনের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।
4. শকুন উদ্ধার ও প্রজনন কেন্দ্র: সুনামগঞ্জের সাফারি পার্কে "ভালচার ক্যাপটিভ ব্রিডিং সেন্টার" চালু করা হয়েছে।
প্রত্যাবর্তনের আলোকরেখা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় শকুনের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে শকুনের নতুন বাসা তৈরি হয়েছে। IUCN (২০২২) এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হোয়াইট-রাম্পড শকুনের সংখ্যা স্থিতিশীল হয়েছে এবং বিলুপ্তির হার কিছুটা কমেছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানেও শকুন সংরক্ষণ প্রকল্প চলছে। ভারত ২০০৬ সালে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করে। নেপালে গড়ে তোলা হয়েছে ভালচার রেস্টুরেন্ট যেখানে নিরাপদ পশুর মৃতদেহ শকুনকে খেতে দেওয়া হয়। ফলে কিছু এলাকায় শকুনের সংখ্যা পুনরায় বাড়ছে।
আমাদের করণীয়
শকুন সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; আমাদের প্রত্যেকের সচেতনতা ও উদ্যোগও অত্যন্ত জরুরি। শকুনের বেঁচে থাকা মানে আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকা। এজন্য করণীয় পদক্ষেপগুলো হলো:
1. নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবহার বন্ধ: গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকসহ শকুন-ক্ষতিকর ওষুধ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলতে হবে এবং নিরাপদ Meloxicam ব্যবহার করতে হবে।
2. গ্রামীণ সচেতনতা বৃদ্ধি: কৃষক, পশুপালক ও গ্রামীণ মানুষকে শকুনের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। তাদেরকে জানাতে হবে শকুন হত্যা বা বিষ প্রয়োগ করলে প্রকৃতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
3. বাসস্থান রক্ষা: বন উজাড় বন্ধ করতে হবে, বড় বড় গাছ সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ সেখানেই শকুন বাসা বাঁধে।
4. খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত: গবাদি পশুর মৃতদেহ নিরাপদ স্থানে ফেলে রাখা, কিংবা নেপালের মতো “ভালচার রেস্টুরেন্ট” চালু করা যেতে পারে।
5. আইন প্রয়োগ: শকুন হত্যাকারী বা বিষ প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
6. শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি: বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শকুন সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
7. গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ: পরিবেশবিদ, প্রাণীবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শকুন সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।
8. সামাজিক আন্দোলন: স্থানীয় জনগণ, এনজিও, পরিবেশ সংগঠন ও গণমাধ্যমকে শকুন রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে।
উপসংহার
শকুন শুধু একটি পাখি নয়, বরং প্রকৃতির অপরিহার্য প্রহরী। মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে তারা রোগবালাই দূর করে এবং পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখে। কিন্তু মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত ও অসচেতনতার কারণে প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল এই আকাশের রাজা। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা চলছে। আমাদের সবার দায়িত্ব, এই মহামূল্যবান পাখিকে রক্ষা করা। কারণ জীববৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া সুস্থ পৃথিবী গড়া সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র
BirdLife International (2022). The State of the World’s Birds.
IUCN Bangladesh (2020). শকুন সংরক্ষণ কর্মসূচির প্রতিবেদন.
Pain, D. J., et al. (2008). "Causes and effects of vulture population declines in South Asia." Philosophical Transactions of the Royal Society B.
প্রফেসর ইনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ।
বাংলাদেশ বন বিভাগ, শকুন জরিপ প্রতিবেদন (২০২২)।
-মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রামু,কক্সবাজার
৭-৯-২০২৫
৪
৪ মন্তব্য