সহকারী শিক্ষক
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০১:৩১ অপরাহ্ণ
গণতন্ত্রের আপোসহীন নেত্রী
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতৃত্ব। একদা তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ; রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের এক কঠিন ও সংকটময় মুহূর্ত তাঁকে টেনে আনে রাষ্ট্র ও দলের ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চরম অন্তর্কোন্দল ও নেতৃত্বশূন্যতার মুখে পড়ে। সে সময় দলটি কার্যত অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে দলের নেতা-কর্মীদের বিশেষ অনুরোধ ও তাগিদে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণে সম্মত হন। এটি ছিল তাঁর জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত, কিন্তু তিনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সামরিক শাসকরা ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। এসব দল ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠায় ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় বা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আদর্শভিত্তিক রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাবই ছিল তাদের মূল দুর্বলতা। এই সাধারণ প্রবণতার বাইরে ছিল শহীদ জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। আদর্শ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই দল ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পরও টিকে থাকে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি শুধু অস্তিত্ব রক্ষা করেনি, বরং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনায় সব সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, গণমাধ্যমের বিকাশ এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবেশ বজায় রাখতে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের অবদান স্মরণযোগ্য।
তিনি বিশ্বাস করতেন ক্ষমতার চেয়ে জনগণের রায় বড়। তাই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেমন তিনি সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে যাননি, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথেই রাজনীতি করেছেন। বিরোধী দলে থেকেও সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্ব তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজেই ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার একজন প্রভাবশালী নারী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর নেতৃত্ব নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর সময়ে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় নীতিতে গুরুত্ব পায়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সংযমী ও আত্মমর্যাদাশীল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনার মাঝেও তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণের পথে খুব কমই গেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে নানা প্রতিকূলতা, মামলা ও কারাবরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে, কিন্তু এসব কিছুই তাঁকে আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ছিলেন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর জীবন ও রাজনীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে যেখানে ক্ষমতার চেয়ে নীতি, আর সুবিধার চেয়ে দায়িত্ব বড় হয়ে উঠেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ১/১১-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটকালে তাঁর আপোসহীন অবস্থান। প্রবল চাপ, বন্দিত্ব ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নে কোনো সমঝোতায় যাননি।
সে সময় তাঁর দৃঢ়তা ও নৈতিক অবস্থান দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। শহীদ জিয়াউর রহমান যেমন জনগণের আস্থার প্রতীক ছিলেন, তেমনি বেগম খালেদা জিয়াও ছিলেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এক নেত্রী। ক্ষমতা বা সুবিধার পথে না হেঁটে তিনি সব সময় গণতান্ত্রিক পথেই দেশ পরিচালনায় বিশ্বাস রেখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ়তার এক দীর্ঘ অধ্যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৪
২৪ মন্তব্য