সহকারী শিক্ষক
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে আসে। এই পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে মূল্যবান সময়। কেননা এই পর্যায়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। ২০০৮ সালে মাধ্যমিক স্তরে বাংলা ও ধর্মীয় শিক্ষার সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়, পরবর্তীতে ২০১০ সালে ধাপে ধাপে চালু করা হয়। যার মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ এবং উচ্চতর দক্ষতা যাচাই করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও প্রশ্নপত্র প্রণয়নে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি একটি বহুল আলোচিত সমস্যা।
১. সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়নে শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতির কারণ
শিক্ষকরা কেন মানসম্মত সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারছেন না, তার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রায়োগিক কারণ রয়েছে:
ক) অধিকাংশ শিক্ষককে ছয় বা বারো দিনের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা এই জটিল পদ্ধতি আয়ত্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
খ) অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষকরা নিজেরাই সৃজনশীল পদ্ধতির গভীরতা বোঝেন না, ফলে তাদের দেওয়া প্রশিক্ষণ কার্যকরী হয় না।
গ) প্রশিক্ষণে প্রশ্ন প্রণয়নের তত্ত্বীয় দিক নিয়ে আলোচনা হয় বেশি, কিন্তু হাতে-কলমে অনুশীলন এবং দক্ষ প্রশ্নপত্রের বিশ্লেষণ কম থাকে।
গ) অনেক শিক্ষক উদ্দীপক তৈরি করতে গিয়ে তা হয় অতি-সহজ করে ফেলেন অথবা অতিরিক্ত জটিল করে ফেলেন যা মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়।দক্ষতার স্তরের বিভাজন: জ্ঞান (ক), অনুধাবন (খ), প্রয়োগ (গ) এবং উচ্চতর দক্ষতা (ঘ) এই চারটি স্তরের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা। বিশেষ করে, 'প্রয়োগ' ও 'উচ্চতর দক্ষতা' স্তরের প্রশ্ন তৈরি করতে গিয়ে তারা বিভ্রান্ত হন।
ঘ) দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের সঙ্গে অভ্যস্ত থাকার কারণে অনেক শিক্ষক অজান্তেই সৃজনশীল প্রশ্নের মোড়কে পুরোনো ধারার মুখস্থনির্ভর প্রশ্ন দিয়ে ফেলেন।
ঙ) ক্লাসরুমে পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং অতিরিক্ত কোচিং/প্রাইভেট টিউশনির চাপের কারণে শিক্ষকদের নিজস্ব প্রস্তুতি বা প্রশ্ন প্রণয়নের মানোন্নয়নের সময় থাকে না।
চ) অনেক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন সমিতির মাধ্যমে প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা নিয়ে থাকে ফলে শিক্ষকরা প্রশ্ন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
ছ) শিক্ষকদের জন্য সহজলভ্য এবং পরীক্ষিত মানসম্মত প্রশ্নপত্রের একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেই, যা থেকে তারা প্রশ্ন প্রণয়নের কৌশল শিখতে বা উদাহরণ নিতে পারেন।
জ) প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল।
২. সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন দক্ষতার উন্নয়নে সম্ভাব্য সমাধান
এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নিচে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ প্রস্তাব করা হলো:
ক) দীর্ঘ মেয়াদি ফলো-আপসহ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা।
খ) সমিতির প্রশ্নের পরিবর্তে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষককে প্রশ্ন প্রণয়নের সুযোগ করে দেয়া ।
গ) অনলাইন কোর্স চালু করা, যাতে তারা নিজ গতিতে দক্ষতা বাড়াতে পারেন।
ঘ) কেন্দ্রীয় প্রশ্নব্যাংক প্রতিষ্ঠা: NCTB বা শিক্ষা বোর্ডগুলোর তত্ত্বাবধানে মানসম্মত প্রশ্নপত্রের একটি বিশাল এবং প্রতিনিয়ত হালনাগাদকৃত 'প্রশ্নব্যাংক' তৈরি করা এবং শিক্ষকদের জন্য তা উন্মুক্ত করে দেওয়া।
ঙ) বিভিন্ন দক্ষতা স্তরের (জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ, উচ্চতর দক্ষতা) জন্য সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত মডেল প্রশ্নপত্র ও তার উত্তর সরবরাহ করা।
চ) স্কুল পর্যায়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের পর শিক্ষকদের একটি দল দ্বারা প্রশ্নপত্রের মান ও সৃজনশীলতার স্তর মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা রাখা।
ছ) যেসব শিক্ষক মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়নে দক্ষতা দেখাবেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা বা সরকারি/বেসরকারিভাবে বিশেষ স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা।
চ) শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে প্রশ্ন প্রণয়ন এবং ব্যক্তিগত পেশাগত উন্নয়নের জন্য রুটিনে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখা।
ছ) প্রতি পরীক্ষার পর শিক্ষকদের প্রণীত প্রশ্নপত্র এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা। যেমন, যদি উচ্চতর দক্ষতার প্রশ্নে সবাই ব্যর্থ হয়, তবে বুঝতে হবে প্রশ্নটি প্রণয়নে সমস্যা ছিল।
জ) সৃজনশীল পদ্ধতির কার্যকারিতা এবং প্রশ্ন প্রণয়নের সমস্যাগুলো নিয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করা এবং সেই গবেষণা ফল প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা।
আমার মতে , মানসম্মত প্রশ্নপত্রই পারে শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে।যেখানে হাতে-কলমে অনুশীলনসহ তাত্ত্বিক প্রয়োগ থাকবে। সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য সফল করতে হলে কেবল পদ্ধতি চালু করাই যথেষ্ট নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
১৪
২৪ মন্তব্য