Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সেদিন সূর্যমামা ছিলেন "লগ আউট"
সূর্য মামা লগ আউট

কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি তারিখটি আবহাওয়াবিদরা ভুলে গেলেও, স্কুলের শিক্ষার্থীরা সহজে ভুলবে না। হাড়কাঁপানো শীত, টানা তিন দিন ধরে সূর্য মামা ‘লগ আউট’ হয়ে আছেন। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো স্কুল প্রাঙ্গণ দেখে মনে হচ্ছিল কোনো ভৌতিক সিনেমার সেট।
সকাল থেকে ৪০০ ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষা শেষ। সবাই যখন লেপ-কম্বলের কথা ভেবে বাড়ির পথ ধরছে, ঠিক তখনই বাধ সাধলো স্কুলের ‘লজিক বোমারু’ বা খুদে যুক্তিবিদের দল। জান্নাতুন নাঈম সোমা, রেহেনা আফরোজ রুমা, আমীর সোহেল রাব্বী এবং তাদের চিরশত্রু (অবশ্যই যুক্তির ময়দানে) ইশারাত জাহান টুম্পা, আলী রাজ সঞ্চয় ও সারোয়ার জাহান রাফিন ঘোষণা দিলো—সামনে জাতীয় বিতর্ক, তাই আজই হতে হবে “ছায়া বিতর্ক”। শীতে হাত-পা জমে গেলেও মুখ তো আর জমেনি!
মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। কৈলাশ চন্দ্র রায় স্যার এত ঠান্ডায় একটি হাতকাটা সোয়েটার পড়েছেন যেন ভাবখানা “শীতসহিষ্ণু মহেন্দ্র স্যার” হয়েছেন। আঞ্জুমান আরা বানু ম্যাম, আনিসুর রহমান শিমন স্যার বসে বসে ডিরেকশন দিচ্ছেন আর মাঝে মাঝে মুচকি হাসির আয়োজন রেখেছেন। বদলুল আলম জাদু স্যার, রিয়াদ স্যার, ওমর ফারক শীতে কাঁপতে কাঁপতেই মঞ্চের ডেকোরেশন করছেন, দূর থেকে আসিব জারদারী সবার নিখুত কাজগুলো ভালভাবে পর্যবেক্ষনে বেশ ব্যস্ত। তবে সবচাইতে ব্যস্ত বদলুল আলম জাদু স্যার তিনি এই হাড়কাঁপানো শীতে এমন এক ‘আগুন’ ধরানো বিষয় ঠিক করেছেন যে শুনলেই শীত পালিয়ে যাবে। বিষয় হলো: “গ্রাম অপেক্ষা শহরের স্কুল ভালো।”

বিচারকের আসনে জজ সাহেবের মতো গম্ভীর হয়ে বসে আছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার পলি, মো: ওমর ফারুক ও হুমায়রা হ্যাপী। যদিও মাঝে মাঝে ফারুক দাঁতে দাঁত বাড়ি খাওয়ার ‘ঠকঠক’ শব্দ মাইকে শোনা যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল।

মডারেটরের দায়িত্বে সদ্য ‘জাতীয় চ্যাম্পিয়ন’ খেতাবপ্রাপ্ত মো: শাহনেওয়াজ সম্রাট। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, তিনি লালমনিরহাটের শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জে নয়, সরাসরি বিবিসির স্টুডিও থেকে লাইভ করছেন। আর টাইমকিপার বা সময় রক্ষক হিসেবে আছে স্কুলের ‘স্বাস্থ্যবান লিটিল বয়’ আসিব জারদারী। তার সামনে রাখা ছোট্ট পিতলের ঘন্টা। তার যা স্বাস্থ্য, সে যদি জোরে ঘন্টার বাড়ি দেয়, তবে কুয়াশা কেটে সূর্য বের হয়ে আসতে পারে!

বিতর্ক শুরু - বাগযুদ্ধ নাকি শীতবস্ত্র যুদ্ধ?
পক্ষ দল (শহরের স্কুল ভালো): ইশারাত জাহান টুম্পা, আলী রাজ সঞ্চল, সারোয়ার জাহান রাফিন। মাইক হাতে নিয়েই আলীরাজ সঞ্চয় হুঙ্কার দিল, “মাননীয় মডারেটর, শহরের স্কুলে ছাত্ররা গাড়িতে করে স্কুলে যায়, আর আমাদের গ্রামের স্কুলে আসতে আসতে প্যান্টে কাদা আর জুতোয় গোবর লেগে যায়। শহরের স্কুলে এসি থাকে, আর আমাদের এখানে শীতে জানালা দিয়ে যে বাতাস আসে, তা দিয়ে ফ্রিতে কোল্ড স্টোরেজের অনুভূতি পাওয়া যায়! সুতরাং শহরের স্কুলই সেরা।”

সারোয়ার জাহান রাফিন যোগ করল, “শহরের ছেলেরা টিফিনে বার্গার-পিৎজা খায়, আর আমরা খাই ঝালমুড়ি। বার্গার খেলে ব্রেন খোলে, ঝালমুড়ি খেলে শুধু ঝালই লাগে। তাই শহরের স্কুলই ভালো!”

বিপক্ষ দল (গ্রামের স্কুল ভালো): জান্নাতুন নাঈম সোমা, রেহেনা আফরোজ রুমা, আমীর সোহেল রাব্বী। আমীর সোহেল রাব্বী তার খাকী রঙের জ্যাকেট ঠিক করতে করতে পাল্টা গুলি ছুড়ল, “মাননীয় মডারেটর, প্রতিপক্ষ বন্ধু বলল শহরের ছেলেরা গাড়িতে চড়ে। কিন্তু তারা তো জ্যামে বসে থাকে ৩ ঘণ্টা! আর আমরা গ্রামের ছেলেরা যখন দৌড়ে স্কুলে আসি, তখন আমাদের ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ হয়ে যায়। শহরের ছেলেরা ‘ব্রয়লার মুরগি’র মতো ফার্মে বড় হয়, আর আমরা গ্রামের ছেলেরা ‘দেশি মুরগি’র মতো শক্ত-পোক্ত। আর শিক্ষার কথা বলছেন? গ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখেই তো রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছেন, শহরের ইটের দালান দেখে কি আর ‘সোনার তরী’ লেখা যায়?

রেহেনা আফরোজ রুমা যোগ করল, “শহরের স্কুলে আকাশ দেখা যায় না, আর আমাদের করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট স্কুলের বিশাল মাঠের কোণায় দাঁড়ালে মনে হয় আকাশটা আমাদেরই ছাদ। শহরের স্কুল যদি এতই ভালো হয়, তবে আজকের এই শীতে শহরের কোনো স্কুল কি খোলা মাঠে এমন বিতর্ক করার সাহস পেত?

দর্শকের সারিতে থাকা অভিভাবক ও শিক্ষকরা তখন হাসিতে ফেটে পড়ছেন। শীতে জমে যাওয়া শরীরে যুক্তির উত্তাপ যেন লেপের কাজ করছে।

তর্ক যখন তুঙ্গে, হঠাৎ “ঢং ঢং ঢং ঢং...! সবাই চমকে উঠল। বক্তার সময় তো শেষ হয়নি! মডারেটর সম্রাট চোখ বড় বড় করে আসিব জারদারীর দিকে তাকাল। আসিব জারদারী অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, সরি ভাইয়া, শীতের কারণে হাত কাঁপছিল, তাই হাতুড়িটা পড়ে গিয়ে ঘন্টা বেজে গেছে। তাছাড়া আমার খিদেও পেয়েছে, টিফিনের সময় কি হয়েছে?
সম্রাটের গাম্ভীর্য তখন আর থাকে না। বিচারক ওমর ফারুক হাসতে গিয়ে হাত থেকে কলম ফেলে দিলো। পলি আর হ্যাপী হাসির চোটে খাতা দিয়ে মুখ ঢাকলো।

বিতর্কের ফলাফল কী হলো, সেটা বড় কথা নয়। বদলুল আলম জাদু স্যারের দেওয়া টপিক আর আসিব জারদারীর অসময়ের ঘন্টায় করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট স্কুলের মাঠ তখন সরগরম। তীব্র শীতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রমাণ হলো—শহরের স্কুল যতই চাকচিক্যময় হোক, এই হাড়কাঁপানো শীতে গ্রামের স্কুলের খোলা মাঠে, আপনজনদের উষ্ণতায় যে আনন্দ আছে, তা কোনো শহরের স্কুলের এসি রুমেও পাওয়া সম্ভব নয়।

সূর্য মামা সেদিন দেখা না দিলেও, স্কুলের মাঠে হাসির ছটায় যেন নতুন সূর্য উঠেছিল!
মন্তব্য করুন