সিনিয়র শিক্ষক
০২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৮:৫৭ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
ছন্দের আলোকবর্তিকা—সুকুমার বড়ুয়া ও বাংলা শিশুমনের উত্তরাধিকার
বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁরা নিভৃতে, নীরবে কিন্তু গভীর প্রভাব রেখে গেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে। সুকুমার বড়ুয়া সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁর ছড়া শুধু শিশুদের আনন্দ দেয়নি, বরং তাদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও মানবিক বোধ গঠনে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ছয় দশক ধরে ছড়ার অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি যে সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছেন, তা কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়—তা বিস্তৃত হয়েছে পাঠকের হৃদয় ও স্মৃতির গভীরে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা শিশুসাহিত্য এক আলোকবর্তিকা হারাল, কিন্তু রেখে গেল দীর্ঘদিন আলো ছড়ানোর মতো এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।
সুকুমার বড়ুয়ার জীবনপথ ছিল এক অর্থে আটপৌরে, আবার সেই আটপৌরে জীবনই হয়ে উঠেছিল তাঁর সৃষ্টির প্রধান শক্তি। ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই দেখেছেন গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবন, প্রকৃতি ও মানুষের মুখ। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর ছড়ায় বারবার ফিরে এসেছে—কখনো হাস্যরসে, কখনো ব্যঙ্গে, কখনো গভীর মমতায়। তাঁর বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া ও মা কিরণ বালা বড়ুয়ার কাছ থেকে পাওয়া পারিবারিক মূল্যবোধ তাঁকে গড়ে তুলেছিল সংবেদনশীল ও মানবিক একজন মানুষ হিসেবে, যা তাঁর লেখার প্রতিটি ছত্রে অনুরণিত।
১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জ্ঞানকেন্দ্রে কাজ করা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন নিতান্তই সাধারণ একজন কর্মী—কিন্তু তাঁর ভেতরে চলছিল ছন্দের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে ১৯৯৯ সালে স্টোর কিপার হিসেবে অবসর নিলেও তাঁর সৃজনশীল অবসর ঘটেনি। বরং চাকরির পাশাপাশি ও অবসরের পরও ছড়া ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। এই দ্বৈত পরিচয়—একদিকে কর্মজীবী মানুষ, অন্যদিকে নিরলস সাহিত্যসাধক—তাঁকে করে তুলেছিল আরও বাস্তববাদী, আরও সংবেদনশীল।
প্রায় ছয় দশক ধরে ছড়া রচনার মাধ্যমে সুকুমার বড়ুয়া বাংলা শিশুসাহিত্যে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর ছড়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বিষয়-বৈচিত্র্য। শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, প্রাণী-পাখির কৌতুককর আচরণ, সামাজিক অসঙ্গতি, নৈতিক শিক্ষা—সবকিছুই তিনি ছড়ার ছন্দে বুনে ফেলতেন অনায়াসে। তাঁর ছড়ায় ব্যঙ্গ ও রস যেমন ছিল, তেমনি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতার সূক্ষ্ম স্পর্শ। তিনি কখনো শিশুদের কাছে ইতিহাসকে ভারী করে তোলেননি, বরং ছন্দের খেলায় খেলায় তাদের মনে বুনে দিয়েছেন দেশপ্রেম ও মানবিকতার বীজ।
ছন্দ ও অন্তমিলের অপূর্ব সমন্বয় তাঁর ছড়াকে করেছে স্বতন্ত্র। তাঁর ভাষা ছিল প্রাঞ্জল, সহজ, কিন্তু কখনোই হালকা নয়। আটপৌরে শব্দের মধ্যেও তিনি সৃষ্টি করতেন ভিন্নমাত্রা—যেখানে হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত বুদ্ধিদীপ্ত ইঙ্গিত। তাঁর ছড়া একাধারে তীক্ষ্ন ও কোমল; কখনো শাণিত ব্যঙ্গে সমাজের অসংগতি তুলে ধরেছে, আবার কখনো শিশুমনের কোমল অনুভূতিকে আলতো করে ছুঁয়ে গেছে। এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যই তাঁকে আলাদা করেছে সমসাময়িক অনেক ছড়াকার থেকে।
কচি-কাঁচার আসর, খেলাঘর, মুকুলের মাহফিলসহ বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। এসব পত্রিকার মাধ্যমে অসংখ্য শিশু প্রথমবারের মতো ছড়ার জগতে প্রবেশ করেছে, ছন্দের স্বাদ পেয়েছে, ভাষার সৌন্দর্য উপলব্ধি করেছে। তাঁর ছড়া শিশুদের কাছে ছিল আনন্দের, আবার শিক্ষকদের কাছে ছিল মূল্যবোধ শেখানোর এক কার্যকর মাধ্যম। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিশুসাহিত্য মানেই শুধু হাসি-ঠাট্টা নয়; এটি হতে পারে মননশীলতা ও সচেতনতার শক্তিশালী বাহন।
সুকুমার বড়ুয়ার গ্রন্থসম্ভার তাঁর দীর্ঘ সাধনার সাক্ষ্য বহন করে। ‘লেজ আবিষ্কার’, ‘ছোটদের হাট’, ‘কোয়াল খাইয়ে’, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’, ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘সুকুমার বড়ুয়ার ছড়াসম্ভার’ (দুই খণ্ড), ‘যুক্তবর্ণ’, ‘চন্দনার পাঠশালা’ ও ‘জীবনের ভেতরে বাইরে’—এই দীর্ঘ তালিকা শুধু বইয়ের নাম নয়, বরং বাংলা শিশুসাহিত্যের এক বিস্তৃত মানচিত্র। প্রতিটি গ্রন্থে তিনি নতুন রঙ, নতুন ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন, কখনো নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেননি।
একুশে পদকপ্রাপ্ত এই প্রখ্যাত ছড়াকার ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি ভোরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। দীর্ঘদিন নানা জটিল রোগে ভুগে ৮৮ বছর বয়সে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন মানুষের প্রস্থান নয়; এটি এক যুগের অবসান, এক ধারার সমাপ্তি। তবে সাহিত্যিকের প্রকৃত মৃত্যু হয় না—তাঁর লেখা বেঁচে থাকে পাঠকের মনে, নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে।
সুকুমার বড়ুয়ার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এই যে, তিনি শিশুসাহিত্যকে কখনো ছোট করে দেখেননি। শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে তিনি নিজেকে ছোট করেননি, বরং নিজের ভেতরের শিশুটিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর ছড়ায় তাই কৃত্রিমতা নেই, উপদেশের ভার নেই; আছে খেলাচ্ছলে শেখানোর মাধুর্য। এই কারণেই তাঁর লেখা আজও প্রাসঙ্গিক, আজও পাঠযোগ্য।
বাংলা শিশুসাহিত্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সুকুমার বড়ুয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি দেখিয়ে গেছেন কীভাবে সাধারণ জীবনের উপাদান দিয়েই অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, কীভাবে ছন্দের ভেলায় চড়ে শিশুদের নিয়ে যাওয়া যায় আনন্দ ও বোধের মিলনস্থলে। তাঁর প্রয়াণ আমাদের শোকাহত করে, কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্বও দেয়—এই উত্তরাধিকারকে ধারণ করার, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।
ছন্দের এই আলোকবর্তিকা নিভে গেলেও তার আলো রয়ে গেছে অগণিত শিশুমনে, পাঠকের স্মৃতিতে, বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায়। সুকুমার বড়ুয়া তাই শুধু একজন ছড়াকার নন; তিনি এক নিরব শিক্ষক, যিনি ছন্দের মাধ্যমে জীবনের পাঠ দিয়ে গেছেন—সহজ, সরল, কিন্তু গভীর।
লেখকঃ শিক্ষক ও লেখক
১
১ মন্তব্য