প্রধান শিক্ষক
০৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৫:২৬ অপরাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক
কুয়াশার চাদর ও মেরুদণ্ডহীন সমাজ
খুরশীদুজ্জামান আহমেদ
৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
জানুয়ারির হাড়কাঁপানো শীতের সকাল। ঘন কুয়াশায় চারপাশ ধোাঁয়াশা হয়ে আছে। হাত-পা জমে যাওয়ার মতো ঠান্ডা। শহরের এক ব্যস্ত মোড়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, জনাব রাশেদ।
তাঁর পরনে পুরোনো একটা সোয়েটার, তার ওপর মলিন একটা শাল জড়ানো। তিনি রাস্তার এক পাশ দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছিলেন। কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা খুব কম। হঠাৎ পেছন থেকে তীব্র হর্ন বাজিয়ে একটা কালো পাজেরো গাড়ি সশব্দে ব্রেক কষল। রাশেদ সাহেব চমকে রাস্তার ধুলোবালি-মাখা ডিভাইডারের ওপর ছিটকে পড়লেন। গাড়ির চাকার ঘর্ষণে একরাশি শুকনো ধুলো উড়ে এসে তাঁর নাকে-মুখে লাগল।
গাড়ির গ্লাস নামিয়ে এক কোট-টাই পরা ভদ্রলোক চিৎকার করে বললেন, "এই বুড়ো! মরার শখ হয়েছে? কুয়াশার মধ্যে চোখে দেখেন না? ফুটপাতে জায়গা নেই?"
রাশেদ সাহেব ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর খুব অপমান বোধ হলো। তিনি ভাবলেন, "সারা জীবন মানুষ গড়ার কারিগর ছিলাম, আর আজ এই অসভ্যতার যুগে আমার কোনো মূল্য নেই। আমি যেন এই যান্ত্রিক শহরের চাকায় পিষ্ট হতে যাওয়া এক অসহায় পিঁপড়ে।"
হতাশ মনে তিনি যখন আবার হাঁটতে শুরু করবেন, তখনই তাঁর চোখ পড়ল রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ডে।
শীতের এই কনকনে বাতাসে, যেখানে মানুষ লেপ-কম্বলের নিচেও ওম পাচ্ছে না, সেখানে একটা ১০-১২ বছরের ছেলে হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরে রাস্তার মাঝখানে কাজ করছে। ছেলেটার ঠোঁট শীতে ফেটে চৌচির, হাত-পা কাঁপছে।
রাস্তা মেরামতের জন্য রাখা কিছু ইটের ভাঙা টুকরো আর খোয়া গতকাল রাতে হয়তো কোনো ট্রাক থেকে পড়ে রাস্তার মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ঘন কুয়াশায় দ্রুতগামী গাড়িগুলো ওগুলোর ওপর দিয়ে গেলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ছেলেটি সেই কনকনে শীতে খালি হাতেই সেই ধারালো ইটের টুকরোগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে একপাশে জমা করছে।
একজন পথচারী কানটুপি ঠিক করতে করতে ছেলেটিকে ধমক দিয়ে বলল, "এই পিচ্চি! এই শীতে মরতে রাস্তায় নেমেছিস? যা ভাগ, গিয়ে কোথাও আগুন পোহা।"
ছেলেটি হাতের তালু ঘষতে ঘষতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "আঙ্কেল, কুয়াশায় তো কিছু দেখা যায় না। একটু আগে একটা রিকশা এই ইটের টুকরায় বেকায়দায় বাড়ি খেয়ে উল্টে যাচ্ছিল। যাত্রীর কপাল ফেটে গেছে। আমি যদি এগুলো না সরাই, তবে বড় গাড়ি উল্টে তো মানুষ মরেই যাবে।"
লোকটি বিরক্ত হয়ে বলল, "তো তোর তাতে কী? এটা কি তোর বাপের রাস্তা? মিউনিসিপালিটির লোক এসে সরাবে।"
ছেলেটি মলিন মুখে হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত দীপ্তি। সে বলল, "মিউনিসিপালিটির লোক আসার আগে যদি কোনো মায়ের কোল খালি হয়, তখন কী হবে আঙ্কেল? শীতে আমার কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ মরে গেলে তো আরও বেশি কষ্ট হবে। কেউ না কেউ তো সরাতেই হবে।"
রাশেদ সাহেব থমকে গেলেন। হাড়কাঁপানো শীতের বাতাস যেন তাঁর শরীরে আর লাগছে না। তাঁর মনে হলো, এই ছেলেটি কোনো সাধারণ পথশিশু নয়, এ যেন এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখা।
তিনি দেখলেন, ওই দামি গাড়ির মানুষগুলো হিটার চালিয়ে ভেতরে বসে আছে, কিন্তু রাস্তা নিরাপদ করার কথা ভাবছে না। আর এই ‘নগণ্য’ ছেলেটি—যাকে সমাজ পোকামাকড়ের মতো দেখে—সে তার জমে যাওয়া হাত দিয়ে সভ্যতাকে দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচাচ্ছে।
রাশেদ সাহেব নিজের গায়ের শালটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন। কিন্তু এবার আর শীতে নয়, এক নতুন শক্তিতে। তিনি এগিয়ে গেলেন। ছেলেটির পাশে বসে নিজের হাতে ইটের টুকরোগুলো সরাতে শুরু করলেন।
ছেলেটি অবাক হয়ে বলল, "দাদু, আপনার ঠান্ডা লাগবে! আপনি যান।"
রাশেদ সাহেব হেসে বললেন, "দাদুভাই, বাইরেটা ঠান্ডা হতে পারে, কিন্তু তুমি আমার ভেতরটা গরম করে দিয়েছ। তোমরা যারা পৃথিবীটাকে টিকিয়ে রেখেছ, আমিও সেই দলের একজন হতে চাই।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। একজন রিকশাচালক, একজন ছাত্র এবং পাশের চায়ের দোকানি—সবাই এসে হাত লাগাল। যে রাস্তাটি দুর্ঘটনার ফাঁদ ছিল, দশ মিনিটের মধ্যে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। কুয়াশার চাদর ভেদ করে তখন সূর্যের এক চিলতে আলো এসে পড়ল তাদের ধুলোমাখা মুখে।
১৫
২৫ মন্তব্য