
কুরআন মাজিদে ব্যবহৃত এক চমৎকার শব্দ হলো ‘ইবাদুর রহমান’। অর্থাৎ রহমানের বান্দা। এই শব্দ বলে আল্লাহ তায়ালা এরপর বারোটা বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। তার অর্থ হলো, এই বারো গুণবিশিষ্ট ব্যক্তিরা হলেন ইবাদুর রহমান তথা দয়াময়ের বান্দা। আমরা এখানে সেই বারোটা গুণ নিয়ে আলোচনা করবো।
নম্রভাবে চলাফেরা করা : কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তারাই রহমানের বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩)। নম্রভাবে চলার অর্থ এই নয় যে, তারা খুব আস্তে আস্তে, ধীরে ধীরে চলাফেরা করে। তারা হাঁটার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক দ্রুতই চলে। প্রয়োজন ছাড়া খুব আস্তে হাঁটা সুন্নাহ নয়। হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) খুব আস্তে হাঁটতেন না। হাদিসের ভাষাটা এমন, ‘চলার সময় পথ যেন নবীজির জন্য সংকুচিত হতো’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৬৩০৯)। এখান থেকে বোঝা যায়, তিনি দ্রুতই হাঁটতেন। তাহলে চলাফেরার ক্ষেত্রে নম্রতার অর্থ কী? চলাফেরার ক্ষেত্রে নম্রতার অর্থ অহংকারীর ন্যায় পা না ফেলা। গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে না চলা। চলাফেরায় বিনয়ী থাকা। এগুলোই হলো পৃৃথিবীতে নম্রভাবে চলার অর্থ।
শান্তিপূর্ণ কথা বলা : রহমানের বান্দাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ‘অজ্ঞ লোকজন যখন তাদেরকে লক্ষ্য করে অজ্ঞতাসুলভ কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩)। অজ্ঞ লোক যারা, যারা খারাপ মানুষ; তাদের স্বভাব হচ্ছে কটু কথা বলা, গালি দেওয়া। রহমানের বান্দাগণ তার জবাবে কটু কথাও বলে না, গালিও দেয় না। বরং তারা শান্তিপূর্ণ কথা তথা ভালো কথা বলে। ভদ্র ব্যবহার করে।
রাত জেগে নামাজ পড়া : তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, ‘তারা রাত অতিবাহিত করে নিজ প্রতিপালকের উদ্দেশে সেজদায়, দণ্ডায়মান অবস্থায়’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৪)। রাতকে আল্লাহ বানিয়েছেন ঘুমানোর জন্য। বিশ্রাম গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু রহমানের বান্দা যারা, তারা রাতে খুব কম ঘুমাই। নামাজ পড়ে, দুয়া করে, একাকি আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে। আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এসব জান্নাতবাসী ছিল এমন, যারা রাতে সামান্যই ঘুমাতো। ভোর রাতে মাগফিরাতের দোয়া করতো’ (সুরা যারিয়াত, আয়াত : ১৭-১৮)। অর্থাৎ রহমানের বান্দাগণ রাতে ঘুমাই ঠিক, তবে একটা নির্দিষ্ট সময় আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকে।
আল্লাহর ভয় রাখা :আরও বলা হয়েছে, ‘যারা বলে, হে আমাদের রব! জাহান্নামের আজাব আমাদের থেকে দূরে রাখুন। নিশ্চয় জাহান্নামের আজাব অত্যন্ত ভয়াবহ’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৫)। এটা রহমানের বান্দাগণের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, রহমানের বান্দাগণ রাতে আল্লাহর ইবাদত করে, আবার ভয়ও পায়, কোনো ভুলের কারণে জাহান্নামে যেতে যেন না হয়। আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি চায়।
খরচে পরিমিতিবোধ : পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো, ‘তারা যখন ব্যয় করে, অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থাকেন’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭)। অপচয় করা অপরাধ। বৈধ ও অনুমোদিত কাজেও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যয় করা নিষেধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ২৭)। আবার প্রয়োজনে খরচ না করা, এটাও অন্যায়। সুতরাং এখান থেকে বোঝা যায়, রহমানের বান্দাগণ অপচয় ও কৃপণতা থেকে বেঁচে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থাকেন।
শিরক থেকে বেঁচে থাকা : আল্লাহর সঙ্গে অন্য মাবুদের ইবাদত না করা রহমানের বান্দাদের ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর বাণী, ‘তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য মাবুদের ইবাদত করে না’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৮)। আল্লাহর সঙ্গে অন্য মাবুদের ইবাদত করার অর্থ হলো শিরক করা। এটা অনেক বড় অপরাধ। কুরআন মাজিদের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের শিরক থেকে বিরত থাকার নির্দেশ করেছেন। শিরককে সবচেয়ে বড় জুলুম হিসেবেও অবিহিত করেছেন।
হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে থাকা : রহমান বান্দাদের সপ্তম বৈশিষ্ট্য, ‘যথাযথ কারণ ছাড়া আল্লাহ যাকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন তাকে হত্যা না করা’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৮)। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, এটা অনেক বড় অপরাধ। একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে হত্যা করার শামিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কেউ যদি কাউকে হত্যা করে আর সেটা অন্য কাউকে হত্যা করা বা পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তারের কারণে না হয়, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে হত্যা করলো’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৩২)। এই আয়াতের সারাংশ হলো, যথাযথ কারণ ছাড়া অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। এটা চরম পর্যায়ের অপরাধ। রহমানের বান্দাগণ এমন জঘন্য অপরাধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে।
অবৈধ সম্পর্কে না জড়ানো : অষ্টম বৈশিষ্ট্য, ‘তারা ব্যভিচার করে না’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৮)। ব্যভিচারও অনেক বড় গোনাহের কাজ। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা যে গোনাহগুলো উল্লেখ করেছেন, শুধু সেগুলো থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। কিন্তু ব্যভিচারের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনা ভিন্ন। তিনি ব্যভিচারের কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন এবং সেটা কঠিন ভাষায়। আল্লাহর আয়াত, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৩২)।
মিথ্যা সাক্ষী না দেওয়া : রহমানের বান্দাদের নবম বৈশিষ্ট্য, ‘তারা মিথ্যা সাক্ষী দেয় না’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭২)। মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াকে নবীজি (সা.) সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৭)
আত্মসম্মান ঠিক রাখা : দশম বৈশিষ্ট্য, ‘যখন খারাপ কাজের কাছ দিয়ে যায়, তখন আত্মসম্মান বাঁচিয়ে যায়’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭২)। অর্থাৎ দুনিয়ায় চলাফেরার ক্ষেত্রে একজন মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, নানান কাজ করতে হয়। এর মধ্যে কোথাও খারাপ কাজ বা কথা হচ্ছে, সেখানে যদি রহমানের বান্দারা উপস্থিত হয়ে পড়েন, তারা সেখানে অংশগ্রহণ করেন না। বরং নিজের সম্মান বাঁচিয়ে খারাপ কাজ ও কথার স্থান থেকে দূরে থাকেন।
আল্লাহর আদেশ মান্য করা : বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহর আয়াতগুলো শুনে তারা অন্ধ ও বধিরের মতো আচরণ করে না’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৩)। এটা রহমানের বান্দাদের এগারোতম গুণ। এর অর্থ হলো, তাদের সামনে যখন আল্লাহর কোনো আদেশ বা নিষেধ উপস্থাপন করা হয়, তারা সেগুলো শুনেও না শোনার, দেখেও না দেখার ভান করে না। অথবা আগের যুগের মুনাফেকদের মতো, সামনে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো, কিন্তু পরে সেটা অস্বীকার করতো। রহমানের বান্দারা এমন নয়। বরং তাদের সামনে আল্লাহর নির্দেশনাবলি উপস্থাপন করলে তারা সেগুলো আগ্রহের সাথে সংরক্ষণ করে এবং আমল করার চেষ্টা করে।
পরিবারের জন্য দোয়া :সুরা ফুরকানে উল্লিখিত রহমানের বান্দাদের সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, ‘তারা দুয়া করার সময় বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এমন স্ত্রী সন্তান দিন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানান’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৪)। আমরা যদি আমাদের জীবনে এই বারোটা বিষয় বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। পরবর্তী দুই আয়াতে আল্লাহ সেটা বর্ণনা করেছেন। সারসংক্ষেপ হলো-এই বারো গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের জান্নাতে সুউচ্চ কক্ষ দেওয়া হবে। সালাম এবং অভিবাদন জানানো হবে সেখানে। আর বিশেষ এই স্থান তথা জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষে তারা সর্বদা থাকবে। তারা সেখানের স্থায়ী বাসিন্দা।
(সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৫-৭৬)।
১৫
২৫ মন্তব্য