সহকারী শিক্ষক
০৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৫:১৩ অপরাহ্ণ
এক রাতের রিকশা ভ্রমণ!
এক রাতের রিকশা ভ্রমণ!
আমাদের বাসার পাশের ডজন খানেক রিকশাওয়ালারা আব্বাকে দোলা ভাই ডাকত। তাই আমিও তাদের মামা বলে ডাকতাম। মামা মানে একটা বিশেষ সম্পর্ক—রক্তের না হলেও আত্মার। সেই মামাদের ভিড়ে জাহিদ মামা ছিল খুব খুব কাছের।আমার আর আমার আব্বার খরচের হাত একটু বেশিই। আমার চেয়ে আব্বারই বোধহয় বেশি। শুধু টাকা হাতে পেলে হয়! জীবনে কোনোদিন দামী সিগারেট মুখে দিতে পারিনি—এই আফসোসটা রয়ে গেছে। তবে আফসোসের মাঝেও একটা তৃপ্তি ছিল—অনেক মানুষকে খেতে দিয়েছি। সেই তালিকায় জাহিদ মামাও ছিল। দেখা হলেই সিগারেট,গোল্ড লিফ অথবা বেনসন। ওদের চোখে যে আনন্দটা দেখতাম, সেটাই যেন আমার পুরস্কার।এক রাতে হঠাৎ বাইরে বের হলাম। উদ্দেশ্য এক কাপ চা। এই চায়ের নেশা আমার নানার কাছ থেকে পাওয়া, আর খরচ করার সাহসটা আব্বার কাছ থেকে শেখা।
রাত তখন বেশ গভীর। রাস্তা ফাঁকা। হলুদ স্ট্রিট লাইটের আলোয় রিকশার ঘণ্টা আর চাকার শব্দ আলাদা এক ভাষায় কথা বলছিল। চায়ের দোকান বন্ধ। একটু হতাশ হলাম।ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক— “মামা, উঠবেন নাকি?”
ফিরে দেখি—জাহিদ মামা। মুখে সেই চেনা হাসি, চোখে সারাদিনের ক্লান্তি।
রিকশায় উঠলাম। কোথায় যাব,কোনো ঠিকানা নেই। শুধু চলা। রাতের শহরকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছে।
রিকশা চলতে লাগল। বাতাস মুখে এসে লাগছে। মাথার ভেতর নানা স্মৃতি—আব্বা, নানা, ফেলে আসা মানুষ, না পাওয়া সিগারেট, পাওয়া মানুষগুলো। জাহিদ মামা গল্প করছিল—দিনের আয়, বাসার চিন্তা, সন্তানের স্কুল।একসময় বুঝলাম, এই রিকশা ভ্রমণ শুধু রাস্তার নয়,জীবনেরও। কেউ টানে, কেউ বসে থাকে, কেউ গন্তব্য ঠিক করে না,তবু চলতে থাকে।
একটা খোলা চায়ের দোকান পেলাম। নামলাম। দু’কাপ চা। সঙ্গে একটা গোল্ড লিফ। সিগারেটটা জাহিদ মামার হাতে তুলে দিলাম।
সে তাকিয়ে বলল, “মামা, আপনি না খেয়ে আমাদের খাওয়ান কেন?”
হাসলাম। উত্তর দিলাম না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর আসলে কথায় দেওয়া যায় না—রিকশার চলার মতোই, নিঃশব্দে বুঝে নিতে হয়।
সেই রাতে চায়ের ধোঁয়ার সাথে মিশে গেল অনেক না বলা কথা। আর একটা সাধারণ রিকশা ভ্রমণ হয়ে রইল জীবনের এক টুকরো গল্প।
৪
৪ মন্তব্য