সহকারী শিক্ষক
১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
কপালের কালো দাগ ও ধূসর গোধূলি
কপালের কালো দাগ!
আমার তেমন কোনো গুণ নেই।এই ধারণাটা আমি বহুদিন ধরেই বয়ে বেড়াই। বড় করে কিছু দাবি করার মতো মানুষ আমি নই। তবে খুব ছোট্ট একটা গুণ আছে। বোধহয় আমি যেকোনো পরিবেশের সাথে দ্রুত মিশে যেতে পারি। কেন পারি, জানি না। হয়তো বেশি কথা বলি না বলেই মানুষ কাছে টেনে নেয়।
সেদিন ট্রেনে খুলনার পথে আসছি।
আমার সিট ১৩ নম্বর—জানালার পাশে। পাশের সিটগুলোতে ১৪, ১৫, ১৬—তিনজন পরিচিত মানুষ, আর আমি একমাত্র অপরিচিত। প্রচণ্ড শীত। জানালার ফাঁক গলে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। এমন সময় পাশের মহিলাটি,না, দিদি বলাই ভালো।অকারণ মমতায় একটা চাদর এগিয়ে দিলেন, পা ঢাকার জন্য।
দিদির পরনে কালো সুয়েটার, খয়েরি টুপি আর একই রঙের মাফলার। মুখখানা শান্ত, অথচ চোখে গভীর ক্লান্তি। কথা বলতে বলতে বুঝলাম, উনি হিন্দু। জীবনের গল্প বলতেও খুব বেশি সময় নিল না।
দিদির ভালোবাসার মানুষটির নাম ইসমাইল। কলেজ জীবন থেকেই প্রেম। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। বিশ্বাস ছিল—ভবিষ্যৎও হবে একসাথে। দিদির আগে বড় একটা চাকরি হয়। মাইনে ভালো, যদিও সরকারি নয়। ইসমাইল তখনও বেকার। তবু দিদির বিশ্বাসে ফাটল ধরেনি। ইসমাইল ভালো ছাত্র, চাকরি হবেই—এই ছিল ধারণা।
হলোও তাই।
ইসমাইলের চাকরি হলো।
আর ঠিক তখনই দিদির কপাল পুড়লো।ইসমাইল অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করল।সংবাদটা দিদিকে ভেঙে দিল। শুধু মন না,পুরো জীবনটাই যেন থমকে গেল। চাকরি ছেড়ে দিলেন। মানুষটা কেমন করে যেন হারিয়ে গেল নিজের ভেতরেই। দীর্ঘদিনের প্রেম—এত সহজে মানুষকে ছেড়ে দেয় না।
এরপর বহুদিন।
দিদির আর কোনো চাকরি হলো না। চেষ্টা থামেনি, কপাল সায় দেয়নি। বাড়ি নীলফামারিতে। যাচ্ছেন যশোর একটা ভাইভা দিতে। হয়তো চাকরিটা হয়ে যাবে। হয়তো আবার হবে না।ট্রেন ছুটছিল। জানালার বাইরে শীতল অন্ধকার।
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
ভাবছিলাম,প্রেম হোক কিংবা বন্ধুত্ব, বিশ্বাস না থাকলে সবই ভেঙে পড়ে।
আর কিছু ভাঙন এমন হয়, যার শব্দ শোনা যায় না,শুধু মানুষটা নীরবে বদলে যায়।ট্রেন থামল।
দিদি নেমে গেলেন।চাদরটা ফেরত দিতে গিয়ে মনে হলো,
এই শীতটা আসলে বাইরে নয়, অনেক সময় মানুষের ভেতরেই জমে থাকে। হয়তো আবার কোন এক অচেনা সময়ে, কোন এক ট্রেনে তাদের সাথে দেখা হবে। ওই রাতে দিদির আপ্যায়ন ও ছিল অসাধারণ।
১৫
২৫ মন্তব্য