Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:০৫ অপরাহ্ণ

কাপাসিয়া বাংলাদেশের প্রাচীনতম জনপদের ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক মহাকাব্য

বাংলাদেশের বুকে সুপ্রাচীন একটি ভূখণ্ডের নাম কাপাসিয়া, যার জন্মকথা প্রাগৈতিহাসিক যুগের গর্ভে নিহিত। প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর পূর্বে, যখন সময়ের কাঁটায় ধরা পড়ে না কোনো তারিখ, তখন সমুদ্রের অতল গহ্বর থেকে যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এই ভূমি। ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক জীবন্ত পাঠশালা এই কাপাসিয়া বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ভূ-খণ্ডগুলোর অন্যতম, যার সমগ্র অঞ্চলই এক টিকে থাকার গল্প বলে। দশ লক্ষ বছর পূর্বে এই ভূখণ্ডের ভীত রচনার সূচনা হয়েছিল বলে পণ্ডিত-গবেষকদের ধারণা। এরপর পাঁচ লক্ষ বছর আগে, প্রথম বরফ যুগে, সমুদ্রের গর্ভ থেকে সম্পূর্ণরূপে মাথা তুলে দাঁড়ায় এ অঞ্চল। সে সময় সমুদ্রের পানি বরফে রূপান্তরিত হয়ে আকাশে চলে যাওয়ায় বিশাল সামুদ্রিক হ্রদগুলো শুকিয়ে যায়, সমুদ্রের পানি অত্যন্ত নিচে নেমে যায়, এবং প্রায় আশি হাজার বছর স্থায়ী সে বরফ যুগের অবসানে শুরু হয় বরফগলা লাল পানির প্রবাহ। তিনটি বরফ গলা যুগের প্রবাহে সৃষ্ট মাটির স্তরগুলো লাল হয়ে যায়, আর দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এই প্রাচীন ভূখণ্ড গভীর অরণ্য ও বনভূমিতে পরিণত হয়। এই বনভূমির বিবর্তন ঘটেছে অসংখ্যবার, আর ভূ-তাত্ত্বিক স্তর বিন্যাসের জটিলতার কারণে অঞ্চলে ভূমির বিপর্যয় ঘটে, যার ফলে বনভূমির বিভিন্ন অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। হাজার হাজার বছরের ব্যবধানে সেই চাপা পড়া বনভূমি পরিণত হয় কয়লায়। কাপাসিয়ার বিভিন্ন স্থানে, পুকুর বা কূপ খননকালে আজও সেই প্রাগৈতিহাসিক অরণ্যের স্মৃতি হিসেবে কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়, যা এর অতীতের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৭৮ সালে কাপাসিয়া উপজেলার সাহার বিদ্যাকোট (দরদরিয়া) গ্রামের শীতলক্ষ্যা নদীর ভাঙন কবলিত পাড়ে লাল মাটির ১০/১২ হাত নিচে কয়লায় পরিণত একটি বৃহদাকার বৃক্ষ আবিষ্কৃত হয়, যা লক্ষাধিক বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে কয়লাকাঠে রূপান্তরিত হয়েছে বলে ঢাকা জাদুঘরের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. এনামুল হকের অভিমত ছিল। দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ-তারাগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গমস্থলে গড়ে উঠা বিশাল ধাঁধাঁরচর এলাকাতেও ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলনের সময় কয়লার বড় বড় টুকরো পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলের নদীগর্ভে চাপা পড়া বিপুল বনভূমিরই নিদর্শন।


ভূ-তাত্ত্বিক বিবর্তনের ধারায় বঙ্গোপসাগর বারবার হানা দিয়েছে এই স্থলভাগে, আবার নিজ স্থানে সরে গিয়েছে। কাপাসিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য খাল, বিল, নদী-নালা, জলমহল, উঁচু টেক-টিলা সবই সমুদ্রের সেই উদ্গীরণের ফসল। লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বে সমুদ্রের গর্ভ থেকে কাপাসিয়ার লাল মাটির ছোট ছোট পাহাড়ের মতো টেক-টিলা বা উঁচু ভূমিখণ্ডগুলি মাথা তুলে দাঁড়ায়, যার আশেপাশে বিস্তৃত ছিল সমুদ্রের গভীর জলরাশি। পরবর্তীতে সমুদ্র ভরাট হয়ে দূরে সরে গেলেও রেখে যায় গভীর খাদ নামক সামুদ্রিক চিহ্ন এবং উত্তরাধিকার হিসেবে শীতলক্ষ্যা, বানার, ব্রহ্মপুত্রের মতো খরস্রোতা নদ-নদী, বেলাইয়ের মতো বিল-ঝিল ও অসংখ্য খাল ও জলমহল। শীতলক্ষ্যা, বানার ও ব্রহ্মপুত্র—এই তিন নদী দ্বারা বেষ্টিত কাপাসিয়ার ভূমি সাধারণত বেলে মাটি, পলিমাটি, দো-আঁশ মাটি ও কাদা মাটি দ্বারা গঠিত। এটি চারটি ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল—মধুপুরের গড় অঞ্চল, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পলল ভূমি, মিশ্র মেঘনা মোহনা এবং নব্য ব্রহ্মপুত্র পলল ভূমি—দিয়ে গঠিত, যা যথাক্রমে উপজেলার শতকরা প্রায় ৭২.৯, ৭.০, ১.৪ ও ১৩.৬ ভাগ এলাকায় বিস্তৃত। সামগ্রিকভাবে কাপাসিয়ার ভূমি ভাওয়াল ও মধুপুর গড় এলাকার অন্তর্ভুক্ত, যা ভূতাত্ত্বিকগণের মতে 'প্লাইসটোসিন চত্বর' নামে পরিচিত এবং এর অনুমানিক বয়স দশ লক্ষ বছর।


ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে কাপাসিয়া মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের সমসাময়িক, এমনকি সোনারগাঁও, বিক্রমপুর, সাভার ও ময়নামতির চেয়েও প্রাচীনতম জনপদ। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকেই এই অঞ্চলে কার্পাস বা তুলার ব্যাপক চাষাবাদ হতো। সংস্কৃত ও হিব্রু ভাষায় তুলার অপর নাম কার্পাস, যা পারসি ভাষায় 'কারবস' এবং বাংলা ও হিন্দিতে 'কাপাস' হয়েছে। এই কার্পাস শব্দ থেকেই কালক্রমে 'কাপাসিয়া' নামের উদ্ভব হয়েছে বলে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন। এই অতি সুক্ষ্ণ আঁশের কার্পাস তুলা থেকে যে মিহি মসলিন বস্ত্র তৈরি হতো, তা বিশ্বব্যাপী কিংবদন্তির খ্যাতি অর্জন করেছিল। গ্রীক ভৌগোলিক দিউ গোরাস খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতেই কাপাসিয়া অঞ্চলের সূতীবস্ত্র ও তার রংয়ের উপকরণ সম্পর্কে মন্তব্য করেন। মসলিন কাপড় শুধু বঙ্গদেশের সুলতান বা দিল্লির মোগল সম্রাটদের বেগমদেরই প্রিয় ছিল না, রোমান সাম্রাজ্যের অভিজাতরাও এর জন্য উন্মুখ থাকতেন। এই বস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য কাপাসিয়া ছিল একটি বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র, যা প্রাচীন বাংলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে, ইংরেজ শাসনামলে এই গৌরবময় মসলিন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়।


প্রাচীনকাল থেকেই কাপাসিয়া ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মিশরীয় জ্যোতির্বিদ টলেমির বিবরণে ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত 'তোগমা', 'হাতিবন্ধ', 'এন্টিভাল', 'কার্পাস' ইত্যাদি নামের উল্লেখ রয়েছে। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ 'কার্পাসি'কে কাপাসিয়া, 'তোগমা'কে টোক এবং 'হাতিবন্ধ'কে হাতিবান্ধা রূপে সনাক্ত করেছেন। নবম শতকের মুসলিম পরিব্রাজকগণ 'তাগমা' শহরকে 'তাউফ' বা 'তাফেক' নামে উল্লেখ করেছেন। উনবিংশ শতকের ত্রিশের দশকে ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলর তাঁর 'টপোগ্রাফি অব ঢাকা' গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, শীতলক্ষ্যা ও বানার নদীর সংযোগস্থলে 'এন্টিবোল' শহর অবস্থিত ছিল, যা অনেক গবেষকের মতে 'তাগমা' শহরেরই আরেক নাম। কাপাসিয়ার উত্তর সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক টোক নগর ছিল এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। 'টোক' একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ পোতাশ্রয় বা সমুদ্রতীরে জাহাজ রাখার নিরাপদ স্থান। ধারণা করা হয়, ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে টোক একটি সামুদ্রিক বন্দর ছিল এবং এই পথ দিয়েই আরব বণিক, আউলিয়া ও দরবেশগণ ব্যবসা ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে কাপাসিয়া অঞ্চলে আগমন করেন। ১৮৭০ সালের দিকে ভারতের জৈনপুরের পীর মাওলানা কেরামত আলী (রহ.) নদীপথে বজরা নিয়ে কাপাসিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।


কাপাসিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসও অতুলনীয়। গুপ্ত সম্রাটদের অনৈক্যের সুযোগে ৫০৭-৫০৮ খ্রিস্টাব্দের পর বৈন্যগুপ্ত বঙ্গে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তাঁর রাজধানী ছিল শ্রীপুর, যা একসময় কাপাসিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বৈন্যগুপ্তের পরে বাণিয়া রাজা শিশুপাল শ্রীপুরের দীঘলিছিট এলাকায় রাজধানী স্থাপন করেন, যিনি বাংলার পাল রাজাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কাপাসিয়া উপজেলার কপালেশ্বর নামক সুপ্রাচীন গ্রামে রাজা শিশুপালের রাজধানী ছিল বলে জানা যায়, যেখানে একটি শানবাঁধানো বিরাট দিঘি রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দরদরিয়া গ্রামের শাহারবিদ্যা কোট ছিল শিশুপালের দুর্গ, যেখানে তাঁর অন্তঃপুর রানি ভবানী অবস্থান করতেন এবং একটি ভিটি এখনও 'রাণীবাড়ি' নামে পরিচিত। একাদশ শতাব্দীর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় রাজা কর্ণের মেয়ে যৌবনশ্রীকে রাজা বিগ্রহপালের কাছে বিবাহ দেন, এবং কাপাসিয়ার সিংহশ্রী গ্রামের নামকরণের সাথে রাজা কর্ণের পরিবার ও যৌবনশ্রীর স্মৃতি জড়িত থাকতে পারে।


কাপাসিয়ার দুর্গাপুর ইউনিয়নের তারাগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে ইতিহাসখ্যাত একডালা দুর্গ অবস্থিত ছিল। জেমস টেলরের বর্ণনানুসারে, এই দুর্গটি অর্ধচন্দ্রাকারে নদীর পাশে নির্মিত ছিল, এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ মাইল ও প্রস্থ ২ মাইল, এবং এটি পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। এটি 'রাণীবাড়ি' নামেও পরিচিত ছিল এবং ধারণা করা হয় রানি ভবানী এ দুর্গে বসবাস করতেন, যিনি বাণিয়া রাজাদের শেষ বংশধর ছিলেন। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলার স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এই একডালা দুর্গে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু ফিরোজ শাহ তুগলক শেষ পর্যন্ত দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হন।


মোগল আমলে এই অঞ্চল বার ভূইয়াদের অন্যতম নেতা ঈসা খাঁর আধিপত্যে আসে। কাপাসিয়ার উত্তরাঞ্চল টোক নগরের ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীতে ঐতিহাসিক 'এগারসিন্ধু' অবস্থিত। ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি শাহবাজ খান 'এগারসিন্ধু' দখল করে টোকে একটি নৌ-ঘাটি স্থাপন করেন, কিন্তু ঈসা খাঁর কৌশলের কাছে পরাজিত হন। ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আকবরের সেনাপতি মানসিংহের সাথে ঈসা খাঁর নৌ-সংঘর্ষ হয়, যুদ্ধে মানসিংহ পরাজয় স্বীকার করলে ঈসা খাঁকে কাপাসিয়া অঞ্চলসহ বাইশ পরগনার জমিদারি প্রদান করা হয়। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার ইসলাম খান মুর্শিদাবাদের রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কাপাসিয়ার দ্বার-ই-দরিয়া আসেন, কিন্তু স্থানটি উঁচু-নিচু হওয়ায় তিনি রাজধানী স্থাপন না করে ঢাকায় চলে যান।


কাপাসিয়া শুধু ইতিহাস-ঐতিহ্যেই সমৃদ্ধ নয়, এটি খনিজ সম্পদেও পরিপূর্ণ। মোগল আমলে আকবরের সময় প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর 'আইন-ই-আকবরি'তে উল্লেখ করেন যে, ঢাকার অদূরেই কাপাসিয়া অঞ্চলে লোহা পাওয়া যেত, যা দিয়ে কামারগাঁওয়ের কামাররা অস্ত্র তৈরি করে ঈসা খাঁকে সরবরাহ করত। কাপাসিয়া উপজেলার লোহাদী গ্রামের নামই এসেছে লৌহ খনি থেকে। ইংরেজ চিকিৎসক ও ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজের মতে, কাপাসিয়ার উত্তরাঞ্চল লৌহ সম্পদে সমৃদ্ধ। এছাড়াও, কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ ইউনিয়নের বেলাসী, সিংহশ্রী ইউনিয়নের কুড়িয়াদী এবং বারিষাব ইউনিয়নের বর্জাপুর গ্রামে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এর অনুসন্ধানে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে দুর্গাপুর ইউনিয়নের রাওনাট-বড়ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বে খালের জমিতে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলেও স্বল্প মজুদ ও ব্যয়বহুল হওয়ায় তা উত্তোলন করা হয়নি, শুধু লোহার পিলার দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছিল।


প্রাচীন সভ্যতারও নিদর্শন পাওয়া যায় এই অঞ্চলে। নরসিংদীর বেলাবো-মনোহরদীর ওয়ারী-বটেশ্বরে মাটির নিচে আড়াই হাজার বছর আগের যে সভ্যতা আবিষ্কৃত হয়েছে, অনেকের ধারণা সেই সভ্যতার সাথে কাপাসিয়ার টোক নগরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভবত একদিন ওয়ারী-বটেশ্বরের মতোই কাপাসিয়ার টোক বা অন্য কোনো স্থানে সমসাময়িক নগর সভ্যতার সন্ধান মিলবে। শুধু তাই নয়, ১৯৭৬-৭৭ সালে বারাব বাজারের মসজিদের কূপ খননকালে ২২ হাত মাটির নিচে একটি বড় নৌকার সন্ধান পাওয়া যায়, যার পাশেই একটি বিরাট হিজল গাছের সন্ধান মেলে। ১৯৮৫-৮৬ সালে চরখামের গ্রামে পুকুর খননকালে ৮/১০ ফুট মাটির নিচে পদ্ম ফুলের সারি সারি পাতা দেখা যায়, যা থেকে ধারণা করা হয়, এখানে কোনো এক কালে খাল-বিল বা নদীর অস্তিত্ব ছিল। ২০০৪ সালে শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী দস্যুনারায়ণপুর গ্রামের বিশাল এলাকা হঠাৎ ২০/২৫ ফুট নিচে দেবে যায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানে সেখানে প্রচুর পরিমাণে পিট কয়লা থাকার বিষয় নিশ্চিত হন।


শাসনকার্যের ইতিহাসেও কাপাসিয়ার বিবর্তন ঘটেছে। ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসানের পর ১৮৬১ সালে কাপাসিয়া অঞ্চলে কতগুলো কোতয়ালী থানা সৃষ্টি করা হয়। ১৮৬৫ সালে কাপাসিয়া-গফরগাঁও থানার মধ্যে 'কংশ' নামে একটি পুলিশ থানা স্থাপিত হয়, যা ৫ বছর পর বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৮০ সালে পুনরায় কাপাসিয়া থানা স্থাপন করা হয় এবং শ্রীপুর তার অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৯১০ সালের দিকে ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার্থে কাপাসিয়াকে কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুর—এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করে। ১৯২৪ সালে কাপাসিয়া থানাকে ভেঙে তিনটি থানা গঠন করা হয়: ১ থেকে ১০ নং ইউনিয়ন নিয়ে কাপাসিয়া থানা, ১১ থেকে ২০ নং ইউনিয়ন নিয়ে কালীগঞ্জ থানা এবং ২১ থেকে ২৮ নং ইউনিয়ন নিয়ে শ্রীপুর থানা। ১৯৫৯ সালে কাপাসিয়া থানার সিংহশ্রী ইউনিয়নকে বিভক্ত করে সিংহশ্রী ও রায়েদ ইউনিয়ন গঠন করা হয়। সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৮২ সালে কাপাসিয়া থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে কাপাসিয়া উপজেলার মোট আয়তন ৩৫৬.৯৮ বর্গকিলোমিটার, যা প্রায় ২৩°০৫´ থেকে ২৪°০১´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০°০২´ থেকে ৯০°৪৩´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।


সবমিলিয়ে, প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এই জনপদ কাপাসিয়া কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলই নয়; এটি বাংলাদেশের গভীরতম প্রাকৃতিক ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন, প্রাচীন বাণিজ্যিক গৌরব, সামরিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং অফুরান প্রাকৃতিক সম্পদের এক জীবন্ত সংগ্রাহক। প্লাইসটোসিন যুগের লাল মাটি থেকে শুরু করে মোগল যুগের লৌহ খনি এবং একবিংশ শতকের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র পর্যন্ত—কাপাসিয়ার মাটির প্রতিটি স্তরই কথা বলে এক একটি অধ্যায়ের, যার সমষ্টি তৈরি করেছে বাংলার এই অনন্য প্রাচীনতম জনপদের মহাকাব্যিক ইতিহাস।


তৌফিক সুলতান,প্রধান নির্বাহী পরিচালক - ওয়েলফশন মানব কল্যাণ সংঘ।

প্রভাষক - বি.জে.এস. এম মডেল কলেজ,মনোহরদী, নরসিংদী।

[email protected]

01301483833

মন্তব্য করুন