সহকারী শিক্ষক
১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৩:২৮ অপরাহ্ণ
দায় ও বিদায় @ বৃত্তি পরীক্ষার্থী
দায় ও বিদায়
একদিন জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার্থী হয়ে হলে গিয়েছিলাম, আজ সেই একই কক্ষে ঢুকলাম কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব নিয়ে- আজ গণিত, গতকাল ইংরেজি।
সময় বদলেছে, বেঞ্চ-টেবিল বদলায়নি; বদলেছে কেবল আমাদের সততার মাপজোখ ও বিবেকের উচ্চতা!
অভিভাবকদের আগ্রহ দেখে আশান্বিত হয়েছিলাম-ভাবলাম, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুবই চিন্তিত। কিন্তু অনৈতিক দাবি-দাওয়া শুনে বুঝলাম, চিন্তাটা ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, ফলাফল নিয়ে!অভিভাবকদের চোখে সন্তানের সাফল্যের যে আগুন দেখলাম, তাতে আশার আলো আরোও জ্বলে উঠেছিল বটে; কিন্তু সেই আগুনে যখন অনৈতিক দাবির ধোঁয়া আবারও উঠল, তখনই হৃদয়টা ভারী হয়ে এল।
আমরা বৃত্তির বোঝা সন্তানের কাঁধে চাপাই অথচ মনুষ্যত্ব সম্পন্ন মানুষ হওয়ার দায়টা যেন ভুলেই যাই। অনৈতিক ও মনুষ্যত্বহীন মেধা দিয়ে যদি দেশ গড়ি, তবে সেই দেশ দাঁড়াবে কোন খুঁটির উপর?সে দেশ হবে কেবল নম্বরের দালান-ভিত মজবুত নয়?
এইসব ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল-খুলনার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বেসিক ৫৬ দিনের প্রশিক্ষণের কথা। চোখের সামনেই দেখেছি, কীভাবে ChatGPT নামক আধুনিক আলাদিনের চেরাগ ঘষে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন থেকে লিখিত উত্তর পর্যন্ত পরীক্ষার খাতায় টিকচিহ্ন ও বাক্য হয়ে নামে। আমি ভীরু নিরবিবাদী মানুষ; জীবনে নকল করতে সাহস পাইনি; তাই চুপ থাকতেও পারিনি। বলেই ফেললাম-“জোহরা ম্যাডাম, এ তো সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না!” অথচ তখনও লিখিত একটি পরীক্ষার মূল্যায়ন বাকি ছিল। আমার সহকর্মীরা একবাক্যে আশ্বাস দিলেন-“ChatGPT? আরে না না, এমন কিছুই হয়নি!” জোহরা ম্যাডাম এর দায়সারা উত্তর-আপনারা শিক্ষক? এটা আশা করি না।
কিন্তু কী আশ্চর্য!
‘বেস্ট অ্যাওয়ার্ড’-এর পর সেই সহকর্মীরাই উচ্চস্বরে ঘোষণা দিলেন—সব কৃতিত্ব ChatGPT-এর!
যিনি শীর্ষে বসলেন, তিনিই প্রথম পরীক্ষার দিন মোবাইল বের করে লিখিতেছিলেন। মৃণাল কান্তি সাধু স্যার বলেছিলেন, “মোবাইলটা ভেতরে রাখুন।” ভেতরে রাখা হলো কি না জানি না; তবে সচেতন বিবেক যে বাইরে ছিল, তা নিশ্চিত!
জানি শুধু-যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তবে যোগ্যতার জয়ও লজ্জায় মুখ লুকোবে?সততার পথে জিতে যাওয়া পরীক্ষার্থী একদিন বিবেকের কাছে বলবে-আমি জিতেছি, কিন্তু ছেড়ে দিয়ে বেঁচে গেছি?আর যারা অনৈতিক সুবিধায় জেতে,অভিনন্দনে ভাসে-তারা আয়নার সামনে দাঁড়াবে কী করে? ছলচাতুরির বৃত্তি কোন মুখে আমরা সন্তানকে দেখাবো?
আর সেই সন্তানই বা কেন আগামীকাল একই সুবিধা চাইবে না?
শেষমেশ ভাবি-এই দেশ আমাদের মা। মা কি সন্তান বেছে নেয়? কানা হোক, খোঁড়া হোক-মা তো মনের মাধুরী মিশিয়ে সন্তান মেনে নেয়।
তেমনি বাংলাদেশও আমাদের মা। ভালো হোক, মন্দ হোক-আমরা মা-কে ভালোবাসি। কারণ আমরা এখনো সত্য ও সুন্দরের পূজারি; আর সেই পূজায় নকলের ধূপ জ্বলে না, জ্বলে কেবল বিবেকের প্রদীপ।
৪
৪ মন্তব্য