Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৬:৩৩ অপরাহ্ণ

জান্নাত ও জাহান্নামের সংলাপ মোঃ মুজিবুর রহমান

জান্নাত ও জাহান্নামের সংলাপ

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক,

মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

 

একদিন সৃষ্টির নীরব মঞ্চে,

ঘটিল এক গভীর ভাষ্য,

জান্নাত আর জাহান্নাম

করিল আলাদা আলাদা দাব্য।

জান্নাত কহিল বিনীত স্বরে—

“আমার পথে আসবে যারা,

দুর্বল হৃদয়, দরিদ্র দেহ,

অশ্রু ভেজা, ধৈর্যধরা।”

“যাদের নেই জৌলুস-গর্ব,

নেই দম্ভের মিথ্যা সাজ,

রবের উপর ভরসা রেখে

চলে যারা সোজা পথের কাজ।”

জাহান্নাম কহিল কঠিন ভাষায়—

“আমার মাঝে আসবে তারা,

যারা শক্তি, ক্ষমতা পেয়ে

অহংকারে ভরে উঠা সারা।

পরাক্রমে মত্ত যে জন,

নিজেকে ভাবে সবার ঊর্ধ্বে,

সত্যকে পায়ে দলিত করে

চলে দম্ভের অন্ধ গর্ভে।”

তখন রব্বুল আলামীন

বাণী দিলেন ন্যায়ভরে—

“হে জাহান্নাম! তুমি শাস্তির স্থান,

আমার ইচ্ছায় প্রতিশোধ হবে তোমার দ্বারে।

আর হে জান্নাত! তুমি রহমতের ঘর,

শান্তির অফুরন্ত ধারা,

আমার ইচ্ছায় যাকে চাই

করব রহম, পাবে তারা।”

শুনে কেঁপে উঠল বিশ্বচরাচর,

ভয়ে-ভক্তিতে নত হল প্রাণ,

কে যাবে কোন পথে—

সে তো নির্ধারিত আমলের মান।

অহংকার নয়, চাই বিনয়,

ক্ষমতা নয়, চাই তাকওয়া,

রবের রহম পেতে হলে

ভাঙতে হবে আত্মঅহমের প্রাচীর-ছাওয়া।

হে পথিক! শোনো এই বাণী,

ইতিহাসের নয়—আজকের ডাক,

রহমতের পথে চলাই বুদ্ধি,

অহংকার ডাকে ধ্বংসের ফাঁক।

 ***

সৃষ্টির প্রথম প্রভাতে উঠিল নীরব বিতর্ক,

দুটি অনন্ত আবাসে জাগিল বিচারক-তর্ক।

এক পাশে জান্নাত কহে নরম করুণ ভাষা,

আর পাশে জাহান্নাম গর্জে দম্ভের আশ্বাসা।

জান্নাত কহিল ধীরে, সংযত দীপ্ত স্বরে—

“আমার দ্বারে আসিবে যারা, ভাঙা হৃদয় ধরে।

দুর্বল যারা, দরিদ্র যারা, অশ্রু-ভেজা চোখ,

রবের উপর ভরসা যাদের—আমিই তাদের লোক।

ক্ষমতা নয়, অহং নয়, নেই জৌলুসের দাবি,

তাকওয়া যার অলংকার, সে-ই আমার যাত্রী।

রাতে যারা সিজদায় ভাঙে আত্মার অন্ধকার,

দিনে যারা ন্যায় বয়ে আনে ধৈর্যের উপহার।”

তখন জাহান্নাম কহে কঠিন দৃপ্ত বাণী—

“আমার দিকে আসিবে তারা, শক্তি যাদের প্রাণী।

পরাক্রমে মত্ত যারা, অহংকারে অন্ধ,

নিজেকে রব ভাবিয়া চলে, সত্য যাদের বন্ধ।

ক্ষমতা পেয়ে যারা ভোলে হিসাবের দিন,

দুর্বলদের পিষে যারা গড়ে দম্ভের চিহ্ন।

আইন ভেঙে, ন্যায় মুছে, হেসে করে অন্যায়,

আমার বুকে আগুন হয়ে জ্বলবে তাদের ছায়া।”

শুনে রব্বুল আলামীন দিলেন ন্যায়ফয়সালা,

কম্পিল বিশ্ব, থামিল কাল, স্তব্ধ হল জ্বালা।

বললেন তিনি জাহান্নামে, গম্ভীর আদেশে—

“তুমি শাস্তির স্থান আমার, প্রতিশোধ হবে দেশে।

আমার ইচ্ছায় যাকে চাই শাস্তি দেব তোমায়,

অন্যায়ের ফল বুঝাব তুমি আগুনের ছায়ায়।”

আর জান্নাতে কহিল তিনি করুণ স্নিগ্ধ সুরে—

“তুমি রহমতের আধার, শান্তি ঝরে পুরে।

আমার ইচ্ছায় যাকে চাই রহম করব আজ,

তোমার দ্বারেই পাবে সে জন অনন্তের সুরাজ।”

এই হলো ন্যায়বিধান, চিরন্তন সত্যকথা,

কাজে নয় বড় পরিচয়, কাজেই গন্তব্যতা।

অহংকার নয়, বিনয়েই মুক্তির সরল পথ,

ক্ষমতা নয়, তাকওয়াতেই আলোর চিররত্ন।

হে মানব! শোনো এ বাণী, জীবন ক্ষণিক ধারা,

রহমতের পথ বেছে নাও—আগুন নয়, নাও তারা।

আজ যে দম্ভে উঁচু হও, কাল সে দম্ভই ভার,

বিনয়ের মাটিতে নামো—সেখানেই জান্নাতদ্বার।

 ****

কালের ঊর্ধ্বে, সৃষ্টির আগে, নীরবতার রাজ্যে,

জ্বলে উঠিল বিধানদীপ অনন্ত সত্যের মাঝে।

আসমান-যমীন থামিল যেন শুনিবার তরে,

দুই আবাস দাঁড়াল মুখোমুখি ন্যায়সভা ঘিরে।

একদিকে জান্নাত—আলোর বাগান, শান্তির প্রসার,

অন্যদিকে জাহান্নাম—আগুনে গড়া হাহাকার।

কোনো মানুষ নেই, তবু মানবের ভাগ্যলেখা,

কথা বলিল আবাস দুটি, ভবিষ্যৎ দেখা।

জান্নাত কহিল নম্র কণ্ঠে, করুণার ধ্বনি—

“হে রব! আমার পথে আসিবে নতশির জননী।

যারা পৃথিবীতে চলেছে নীরব সহিষ্ণুতা,

অশ্রু ঢেকে রেখেছে বুকে, বাঁচিয়েছে সত্যতা।

দুর্বল যারা শক্তির কাছে, দরিদ্র যারা ধনে,

তোমার নামেই ভরসা রেখে কাটিয়েছে দিনে।

যাদের নেই ক্ষমতার তলোয়ার, নেই দম্ভের ঢাল,

তাকওয়াই যাদের অলংকার, আমলই সম্বল-ভাল।

রাতে তারা সিজদায় ভাঙে আত্মার অহংকার,

দিনে তারা ন্যায় বাঁচায়, ফিরায় অন্যায় ভার।

মানুষের চোখে তুচ্ছ যারা, তোমার চোখে দামী,

আমার বুকে তাদের জন্যই বিছানো সবুজ ভূমি।”

তখন জাহান্নাম গর্জে উঠে, আগুনে ভাষা—

“হে রব! আমার দিকে আসিবে শক্তির পিপাসা।

পরাক্রমে মত্ত যারা, ক্ষমতায় অন্ধ,

নিজেকে বড় ভেবে চলে, সত্য যাদের বন্ধ।

যারা দম্ভে বুক ফুলিয়ে ভাঙে ন্যায়বিধান,

দুর্বলকে পিষে যারা গড়ে প্রাসাদ-সিংহাসন।

ক্ষমতা পেয়ে ভুলে গেছে হিসাবের দিন,

হাসতে হাসতে অন্যায় করে, মুছে বিবেকচিহ্ন।

আইন কিনে, ন্যায় ভেঙে, অহংকারে উন্মাদ,

আমার আগুনে তাদের জন্য প্রস্তুত প্রতিফল-স্বাদ।

যে বলে—‘আমিই সব’, রবকে মানে না কেউ,

আমার গহ্বরে তার অহং চূর্ণ হবে ঢেউ।”

শুনে রব্বুল আলামীন উঠালেন আদেশবাণী,

কম্পিল আরশ, থরথর কাঁপিল সৃষ্টির প্রাণী।

বললেন তিনি জাহান্নামে কঠোর ন্যায়স্বরে—

“তুমি আমার শাস্তির স্থান, ন্যায় চলবে ধরে।

আমার ইচ্ছায় যাকে চাই প্রতিশোধ নেব আজ,

তোমার আগুনে বুঝাব তাকে আমলেরই সাজ।

জুলুমের ফল, দম্ভের ফল—সব হবে প্রকাশ,

কেউ পারিবে না এড়াতে এই চূড়ান্ত বিচার-কাশ।”

পরে জান্নাতের দিকে ফিরিল করুণ দৃষ্টি,

শান্তির বাণী ঝরিল যেন রহমতের বৃষ্টি—

“তুমি আমার রহমতের ঘর, অনন্ত প্রশান্তি,

আমার ইচ্ছায় যাকে চাই দেব মুক্তির শান্তি।

যারা ধৈর্যে থেকেছে দৃঢ়, পাপে করেছে তওবা,

তোমার দ্বারেই তাদের জন্য অনন্ত সুখ-শোভা।

কষ্টের পরে স্বস্তি, অশ্রুর পরে হাসি,

তোমার বুকেই লিখে দিলাম রহমতের ভাষী।”

হে মানুষ! শোনো এই কথা—ইতিহাস নয় শুধু,

এ বাণী আজও জীবিত, সময়ের গভীর তলু।

ক্ষমতা ক্ষণিক, দম্ভ ক্ষণিক, জীবন অল্পকাল,

আমলই হবে চিরস্থায়ী, ওটাই মূল ফল।

আজ যে উঁচু অহংকারে, কাল সে নত মাটিতে,

আজ যে নত বিনয়ে থাকে, কাল সে আলো-ঘাটিতে।

ধন নয়, পদ নয়, নাম নয় পরিচয়,

তাকওয়াই মাপে মানুষের সত্যিকারের রয়।

দুর্বলকে ভালোবাস যে, সে জান্নাতের পথিক,

অহংকার লালন যে করে, সে আগুনের অধিবাসিক।

রবের রহম চাইলে ভাঙো আত্মার প্রাচীর,

ন্যায়ের পথে চলো দৃঢ়—সেই পথে মুক্তির তীর।

এই হলো বিধান, অটল, পরিবর্তনহীন,

রহমত ও শাস্তি—দুটি পথ, দুই পরিণাম চিহ্ন।

জান্নাত ডাকছে নীরবে, জাহান্নাম সতর্ক করে,

মানুষই বেছে নেয় তার স্থান আমলের ভরে।

হে রব! আমাদের রেখো রহমতের সেই পথে,

যেখানে বিনয় আলো, অহং মুছে যায় সাথে।

শেষ নিঃশ্বাসে যেন বলি—তুমি দয়াময়,

জান্নাতেই দিও ঠিকানা—এই আমাদের রয়।

মন্তব্য করুন