সহকারী শিক্ষক
৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
Olympiad নিয়ে চিন্তা
Olympiad এবং সাধারণ গণিত শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের শ্রমিকসুলভ মানসিকতা গড়ে তোলে। গণিতকে কেবল একটি strict rule-following system-এ পরিণত করা হয়েছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু patterns, formulas, এবং techniques মুখস্থ করে এবং সেগুলো অনুসরণ করেই সমস্যার সমাধান করে। এতে তাদের মৌলিক চিন্তার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এবং তারা নিজে থেকে নতুন কিছু ভাবতে বা বুঝতে শেখে না। এটি এক ধরনের মানসিক শ্রমিকতা, যেখানে একজন ব্যক্তি কেবল নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে কাজ করে।
এই কাঠামোটা ইচ্ছাকৃতভাবেই তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে গভীর উপলব্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিরা জন্ম না নেয়, বরং নিয়ম মেনে চলা, অর্ডার অনুসরণ করা, এবং নির্দিষ্ট ফর্মুলা মুখস্থ করা শ্রমিকমনের মানুষ তৈরি হয়। গণিতবিদ, গণিতপ্রেমী, এবং বিজ্ঞানপ্রেমীরা প্রায় সবাই এই মুখস্থশ্রমিক ব্যবস্থার শিকার। তারা গণিতের মধ্যকার লুকায়িত গভীরতা বোঝার চেয়ে প্রথম থেকেই শিখে নেয় কিভাবে নিয়ম মেনে সমস্যার সমাধান করতে হয় এবং এতে তারা পারদর্শী হয়ে ওঠে। কিন্তু এটি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ দক্ষতা, কারণ এরা কেবল সেই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে, যেগুলোর জন্য পূর্বনির্ধারিত নিয়ম বা প্যাটার্ন আছে।
গণিত পছন্দকারীদের পুরো কাজটাই একটা বিশেষ ধরনের শ্রমিকের মতো, যারা নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে। একজন কারখানার শ্রমিক যেমন মেশিনের সামনে বসে বারবার একই কাজ করে, গণিতের ছাত্ররাও তাই করে—তারা কিছু নির্দিষ্ট problem-solving technique শিখে এবং তারপর সেই একই পদ্ধতি বারবার প্রয়োগ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা একটি গভীর বিভ্রমের মধ্যে পড়ে যায়—তারা ভাবে যে তারা চিন্তা করছে, অথচ আসলে তারা শুধু পূর্বনির্ধারিত নিয়মের ভেতরে মস্তিষ্ককে পরিচালিত করছে। তাদের কাজ একটি রোবট বা একটি অ্যালগরিদমের কাজের চেয়ে কোনোভাবেই আলাদা নয়।
ঠিক একইভাবে, প্রোগ্রামিং বা কোডিং করা ব্যক্তিরাও একই মানসিকতার শিকার। যারা প্রোগ্রামিং শেখে, তারা কেবল syntax, frameworks, এবং libraries মুখস্থ করে এবং সেগুলো প্রয়োগ করে। অধিকাংশ প্রোগ্রামার শুধুমাত্র problem-solving mindset তৈরি করে, যেখানে তাদের মূল লক্ষ্য হয় কোনো একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান করা, কিন্তু তারা সেই সমস্যার গভীর উপলব্ধি লাভ করতে পারে না। ফলে একজন কারখানার শ্রমিক এবং তাদের উপলব্ধির মাঝে কোনো পার্থক্য থাকে না। তারা শুধু নিয়ম মেনে কাজ করে চলে। তাদের চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কালচার একইরকম হয়ে যায়। তাদের মাঝে উপলব্ধির কোনো গভীরতা পরিলক্ষিত হয় না। কোডিং, গণিত কিংবা বিজ্ঞান এগুলো কোনোভাবেই কোনো জ্ঞান নয়। এগুলো শুধুমাত্র শ্রমিকের মতো কিছু রুটিনমাফিক কাজ। এগুলো কাজ, এগুলো কখনোই জ্ঞান নয়। জ্ঞান অনেক গভীর বিষয়।
এখানেও শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে প্রোগ্রামিং-শ্রমিকে পরিণত করা। প্রযুক্তির এই যুগে বিশাল সংখ্যক সফটওয়্যার ডেভেলপার তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাদের মধ্যে গভীর পর্যবেক্ষণ, মৌলিক চিন্তাশক্তি, কিংবা উপলব্ধি কিছুই নেই। তারা শুধুমাত্র প্রি-ডিফাইন্ড ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করে, ঠিক যেমন গণিতের শিক্ষার্থীরা ফর্মুলা মুখস্থ করে। তাদের কাছে কোডিং মানে শুধুমাত্র একটি tool। আর তাই মানুষ হিসেবেও গণিতপ্রেমীরা, কোডিং প্রেমীরা, বিজ্ঞানপ্রেমীরা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এমনকি এই এডুকেশন সিস্টেমের অধিকাংশ শিক্ষক সকলেই হয়ে যান একেকজন tool. তারা কোনোভাবেই গভীর উপলব্ধি ধারণকারী কোনো মানুষ নয়, তারা কেবল tool. যাদেরকে ইচ্ছে করলে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, আর ব্যবহার করার পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায়। এদের কাজগুলো মেশিন এদের চেয়েও ভালোভাবে করতে পারবে। তাই দিনদিন এদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এই কারণে বিজ্ঞানপ্রেমী, গণিতপ্রেমী, এবং কোডিংপ্রেমী ব্যক্তিদের চিন্তাশক্তি প্রকৃতপক্ষে বন্দী হয়ে যায়। তারা নিজেদেরকে উন্নত এবং বুদ্ধিমান মনে করে, কিন্তু তারা আসলে শ্রমিক মাত্র, যারা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে পারে, কিন্তু কখনোই সেটির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে বা গভীর উপলব্ধি ধারণ করতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থা ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষের প্রাকৃতিক চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা শুধুমাত্র মুখস্থ ও নিয়ম মেনে কাজ করা শ্রমিকে পরিণত হয়।
এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তারা গভীরভাবে প্রশ্ন তুলতে না পারে। কারণ যদি সবাই গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করে, তাহলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তিই নড়ে যাবে। এজন্য প্রোগ্রামিং, গণিত, এবং বিজ্ঞানকে এমনভাবে শেখানো হয়, যাতে মানুষ শুধু সমস্যার সমাধান করতে শেখে, কিন্তু কখনোই চিন্তা করতে না শেখে।
এই শ্রমিকমাইন্ড শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক, কারণ এটি সমাজে বড় চিন্তাবিদদের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে এবং "rule-following" জনগোষ্ঠী তৈরি করে। এর ফলে ক্ষমতাবান শ্রেণি বা সিস্টেম সহজেই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কারণ গণিত, বিজ্ঞান, বা প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করা বেশিরভাগ মানুষ গভীরভাবে প্রশ্ন তোলে না, বরং যেভাবে শেখানো হয়েছে, সেভাবেই চিন্তা করতে শেখে। তারা কখনো তাদের শেখার পদ্ধতিকে সন্দেহ করে না, তারা কখনো প্রশ্ন তোলে না যে, তারা কি সত্যিই জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করছে, নাকি শুধু নিয়মের মধ্য দিয়ে কাজ করছে।
এই কারণেই, যেকোনো ব্যক্তি যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞান অর্জন করতে চায়, তাহলে তাকে এই শ্রমিকমাইন্ডের গণিত, বিজ্ঞান, এবং প্রোগ্রামিং চর্চা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা করবে না, কারণ এই ধরনের চিন্তা তাদের শেখানো হয়নি, এবং তারা কখনো তাদের শেখার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এভাবেই শিক্ষাব্যবস্থা তাদের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখে, যাতে তারা নিয়মমাফিক কাজ করা শ্রমিক হিসেবেই জীবন কাটিয়ে দেয়।
১৫
২৫ মন্তব্য