সহকারী শিক্ষক
০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৮:০২ পূর্বাহ্ণ
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের জীবনী।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ রা ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার ধাত্রীগ্রামে মাতুলালয়ে। তার পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুড়াপ গ্রামে।১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রভাতকুমার জামালপুর হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং পাটনা কলেজ থেকে এফ.এ ও ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে বি.এ.পাশ করেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে আইন পড়তে বিলেত যান এবং ব্যারিস্টারি পাশ করে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে দেশে ফেরেন। তখন থেকেই ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দার্জিলিং, রংপুর, গয়া প্রভৃতি স্থানে আইন ব্যবসায় নিযুক্ত থাকেন। নাটোরের রাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়ের উৎসাহে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে মানসী ও মর্মবাণী পত্রিকার সম্পাদনা করতে শুরু করেন। পরে এই মহারাজেরই প্রচেষ্টায় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এখানে অধ্যাপনায় লিপ্ত থাকেন।প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ছিলেন। সাহিত্যজীবনের শুরুতে প্রভাতকুমার কবি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথই তাঁকে গদ্য লিখতে উৎসাহিত করেন। দুজনে বাংলাসাহিত্যে সমকালীন হলেও রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি আর প্রভাতকুমার সফল ও দক্ষ গদ্যকার। রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ ছোটগল্পগুলো যেখানে কল্পনাপ্রসূত, প্রভাত কুমারের লেখা সেখানে বাস্তবসত্যে নিষ্ঠাবান। প্রভাতকুমার তার গল্পে ভাব-উচ্ছ্বাস হ্রাস করে তুলে ধরেছেন বাস্তবসত্যকে। যা মানুষের দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছেন নিজের শৈল্পিকগুণে তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য "প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠগল্প'' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন —
"রবীন্দ্র-কবিমানসের স্বমন্দাকিনীই ছোটগল্পে মর্ত্যভাগীরথীরূপে মানুষের কাছে আনন্দ-বেদনায় কলনাদিনী, তাই তার পাবনপ্রবাহে মৃৎপুত্তলিকাও ক্ষণে ক্ষণে দেবতার অমর মহিমায় দীপ্তমান। প্রভাতকুমারের যমুনা মৃত্যু সহোদরা কালিন্দী, তার নির্মল জলে পার্থিব জীবনেরই স্বমহিমচ্ছায়া প্রতিবিম্বিত।"
— অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য
সূক্ষ্ম জীবনবোধের কারণেই রবীন্দ্রনাথের কালে থেকেও বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পেতে প্রভাতকুমারের এতটুকু বেগ পেতে হয়নি। বিচিত্রমুখী গল্পের জন্য তিনি সমকালেই খ্যাত হয়েছিলেন ‘বাংলার মপাসাঁ’ নামে।
তার গল্পগুলি ইংরাজীতেও অনুদিত হয়েছে। তবে তিনি ছোটগল্পকার হিসাবে যতখানি সফল ঔপন্যাসিক হিসাবে ততটা নন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুল পাঠ্য হিসাবে কিছু রচনা, প্রবন্ধ বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।প্রভাত কুমারের জীবনের বৃহত্তম এবং মহত্তম কীর্তি তথা সর্বশ্রেষ্ঠ অনন্য সৃষ্টি হল চার খণ্ডে রচিত "রবীন্দ্রজীবনী"। জীবনীটি লিখতে তার সময় লেগেছে দীর্ঘ পঁচিশ বছর (১৯২৯ - ৫৪)। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন-
"১৯০১ সালের শেষ দিকে আমি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসি। তারপর দীর্ঘ ৩২ বছর রবীন্দ্রনাথকে দেখবার,জানবার,তার কথা শোনবার, অপার স্নেহ পাওয়ার, কবির সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক এমনকি সভা সমিতিতে তার বিরোধিতা করার সুযোগ পেয়েছিলাম।... লাইব্রেরিতে আমার ঘরে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে যে সব লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হত তা রাখা থাকত। রবীন্দ্রনাথ সে সব লেখার ক্লিপিং আমার হেফাজতে রেখেছিলেন। আমি একজন সহকারীর সাহায্যে সেগুলো সাজানো গোছানো করতাম। তারপর খণ্ডে খণ্ডে তা বাঁধিয়ে রাখা হত। এইসব কার্তিকা খণ্ডগুলির দিকে তাকাতাম আর ভাবতাম এগুলিকে ব্যবহার করব না? সেগুলি হল আমার রবীন্দ্রজীবনী লেখার প্রেরণা।"
প্রভাত কুমার রবীন্দ্রনাথের জীবৎকালে কেবলমাত্র প্রথম খণ্ডটিই ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত করতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে তার অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল —
- 'রবীন্দ্রগ্রন্থপঞ্জি' (১৯৩২)
- 'রবীন্দ্র জীবনকথা'
- 'রবীন্দ্রনাথের চেনাশোনা মানুষ'
- 'রবি কথা'
- 'শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী'
- 'রবীন্দ্রগ্রন্থপরিচিতি'
- 'গীতবিতান-কালানুক্রমিক। সূচী' (স্ত্রী সুধাদেবীর সাথে যুগ্মভাবে)
অধ্যাপক শিশিরকুমার ঘোষ 'রবীন্দ্রজীবনকথা' ইংরাজীতে অনুবাদ করেন - 'Life of Tagore' নামে।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রচিত অন্যান্য গ্রন্থ গুলি হল —
- 'ভারতের জাতীয়তা'
- 'ভারত পরিচয়' (১৩২৮ ব)
- 'ভারতের জাতীয় আন্দোলন ' (১৩৩১ ব)
- 'প্রচীন ইতিহাসের গল্প'
- 'বঙ্গপরিচয়' - দুই খণ্ড (১৩৪২ ব ও ১৩৪৩ ব)
- 'চীনে বৃদ্ধ সাহিত্য'
- 'জাতীয় পরিষদের দিনগুলি'
- 'ফিরে ফিরে চাই' (১৯৭৮)
- 'বাংলা ধর্মসাহিত্য' (১৯৮১)
- 'সোভিয়েত সফর'।প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় জীবনে বহু সম্মান পুরস্কার পেয়েছেন। নানা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট. উপাধিতে ভূষিত করেছে। রবীন্দ্র জীবনীকার হিসাবে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয় 'দেশিকোত্তম' ও ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের 'পদ্মভূষণ' উপাধি প্রদান করে।বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কৃত্যবিদ্যা প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর ৯৩ বৎসর বয়সে প্রয়াত হন।
৭
৭ মন্তব্য