Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

জোনাকির আলোয় ঝুলন্ত বাসা: হারানো সম্পর্কের স্মৃতি

জোনাকির আলোয় ঝুলন্ত বাসা: হারানো  সম্পর্কের স্মৃতি

ছোটবেলার গ্রামীণ সন্ধ্যার স্মৃতি।  এক অদ্ভুত মায়াবী ছবি। অন্ধকার মানেই শূন্যতা নয়—বরং এক গভীর রহস্যের আলিঙ্গন। বিদ্যুতের আলো তখনো স্বপ্নাতীত। কেরোসিনের লণ্ঠনের দোলায়মান আলো রাতের খাবারের সাক্ষী। তারপর, ক্লান্ত দেহ এলিয়ে অন্ধকারের সঙ্গে নীরবতা।

বাইরে সেই অন্ধকারে প্রকৃতির ডালে ডালে ঝুলে শত শত বাসা। কারিগর বাবুই পাখির স্বপ্নের বুনন।তাল, খেজুর বা নারকেলের উঁচু শাখায়। আলোর ঝিলিক মৃদু সবুজ-হলুদ আলোয়।  প্রকৃতির নিজস্ব এক অলৌকিক প্রদীপ। সে আলো মানুষের তৈরি নয় —জোনাকির।

বাবুই পাখি শুধু বাসা বানাত না, সে বানাত স্থাপত্য। তালপাতা, ঘাসের ফাইবার, কাশফুলের আঁশ দিয়ে নিখুঁত নকশায় বোনা বাসার মুখ থাকত নিচের দিকে—ঝড়, বৃষ্টি কিংবা সাপ-বেজির হাত থেকে নিরাপদ। পুরুষ বাবুই দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একাধিক বাসা তৈরি করত, যেন আকাশে ঝুলে থাকা শিল্পকর্ম। তারপর বিকেলে খুঁজে খুঁজে জোনাকি পোকা ধরে,বাসায় আটকিয়ে রাখতো।

রাতের গভীরে বাসার ভেতরে গোবরের ফোটায় আটকানো জোনাকি পোকা। তার লেজ থেকে নির্গত মৃদু আলো সারারাত জ্বলত।

পুরো গাছটাই হয়ে উঠত এক স্বর্গীয় লণ্ঠন-কলোনি। দূর থেকে মনে হতো, আকাশের তারাগুলো নেমে এসেছে ডালে ডালে। সেই দৃশ্য শুধু চোখে নয়, কানে ভর করত—বাবুইয়ের কিচিরমিচিরে ভরে উঠত প্রকৃতির সিম্ফনি।

ভোরের আলো ফুটতেই তাকে মুক্তি দেওয়া হতো—প্রকৃতির এক নীরব সৌজন্যের চুক্তিতে। এখানে লুকিয়ে ছিল এক গভীর দর্শন: আলো ধার নেওয়া যায়, কিন্তু কেড়ে নেওয়া যায় না।

কিন্তু আজ সেই কবিতা প্রায় হারিয়ে গেছে।
আজকের রাত কৃত্রিম আলোয় ভরা—LED-এর নীলাভ ঝলক, মোবাইল স্ক্রিনের ঠান্ডা আভা। আলো দূষণে জোনাকি আর জ্বলতে পারে না। কীটনাশকের বিষে পোকামাকড়ের জগৎ ধ্বংসপ্রায়, জোনাকির প্রজননচক্র ভেঙে পড়েছে। পুকুরপাড়, ধানক্ষেতের আইল, জলাভূমি—সব ভরাট হচ্ছে।

আর বাবুই পাখি? তার আশ্রয়—তালগাছ, খেজুরগাছ—আজ বিলুপ্তির পথে। কারণ, তালগাছ ফলন দেয় ১৫–২০ বছর পরে। এতো ধৈর্য, আধুনিক মানুষের কাছে অস্বস্তিকর। এখন মানুষ চায়, দ্রুত ফলন। তাল, খেজুরগাছ কাটা পড়ে জমির দামের লোভে। বাবুইয়ের খাদ্যও কমছে বিষাক্ত কৃষির চাপে।

বনবিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বাবুইয়ের তিনটি প্রজাতি ছিল—দেশি, দাগি ও বাংলা। আজ দাগি ও বাংলা প্রায় নিঃশেষ, দেশি বাবুইও ক্রমে বিরল।


রজনীকান্ত সেনের সেই অমর পঙ্‌ক্তি—
“কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়”—
আজ যেন নির্মম ব্যঙ্গ। কারণ “নিজের বাসা” বানানোর জায়গাটাই নেই।

আমরা আকাশছোঁয়া অট্টালিকা বানাচ্ছি, কিন্তু প্রকৃতির কুঁড়েঘরগুলো ভেঙে দিচ্ছি নীরবে। আমরা স্বাধীনতা খুঁজছি ইট-পাথরের জঙ্গলে, ভুলে যাচ্ছি—একদিন সেই স্বাধীনতা ঝুলে থাকত বাবুইয়ের বাসায়, জোনাকির আলোয়।

হয়তো এখনো দূরের কোনো গ্রামের নির্জন তালবাগানে এক-দুটো কলোনি টিকে আছে—অতীতের শেষ প্রতিধ্বনি হয়ে। যদি কখনো কোনো বাবুইয়ের বাসা চোখে পড়ে, যদি জোনাকির আলো দেখেন, তাকিয়ে থাকুন। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এগুলো হবে কেবল গল্প—“আগেকার দিনে…” দিয়ে শুরু হওয়া।

এটা শুধু পাখি বা পোকার হারানো নয়। এটা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মৃত্যু।
আর সেই সম্পর্ক বাঁচানোই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

— মুফিদুল আলম
পরিবেশ চিন্তক
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, রামু, কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ