সিনিয়র শিক্ষক
০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:১১ অপরাহ্ণ
সবুজের অভিযান: আজ কার পক্ষে দাঁড়াবে রাষ্ট্র?
সবুজের অভিযান: আজ কার পক্ষে দাঁড়াবে রাষ্ট্র?
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সবুজের অভিযান”
"ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।"
কবিতাটি কোনো কাব্যিক বিলাস ছিল না; ছিল সমাজকে নাড়িয়ে দেওয়ার এক দুঃসাহসী আহ্বান।
সেখানে “সবুজ” মানে শুধু যৌবনের রঙ নয়—সবুজ মানে প্রাণ, প্রশ্ন, প্রতিবাদ, আর পরিবর্তনের সাহস।
আর “আধমরা” মানে তারা, যারা বেঁচে থেকেও ভেতরে ভেতরে মৃত; যারা অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে নিরাপদ থাকার দর্শন আবিষ্কার করেছে।
আজকের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মনে হয়—রবিন্দ্রনাথের সেই অভিযান আর প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সে অভিযান এখন রাস্তায়, মতামতে, বিতর্কে, সামাজিক চেতনায়। সমাজ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত—একদল তারুণ্যের পক্ষে, আরেকদল আধমরাদের পক্ষে।
এখানে তারুণ্য কোনো বয়সের পরিচয় নয়। তারুণ্য একটি মানসিকতা। তারুণ্য মানে প্রশ্ন করার সাহস, ভয়কে অগ্রাহ্য করার দৃঢ়তা, আর অন্যায়কে অন্যায় বলে নাম দেওয়ার স্পষ্টতা। বিপরীতে আধমরা মানে—নীরবতা, সুবিধাবাদ, এবং “সব জায়গায় এমনই” বলে দায় ঝেড়ে ফেলার আরাম।
আজকের সংকট মূলত ক্ষমতার নয়; এটি নৈতিকতার সংকট। আধমরা রাজনীতি টিকে থাকে ভয় দেখিয়ে, বিভাজন সৃষ্টি করে, ইতিহাসকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে এবং নাগরিককে ক্লান্ত করে তুলে। এই রাজনীতি প্রশ্ন চায় না, চায় আনুগত্য। চায় না অংশগ্রহণ, চায় নীরবতা। আর এই নীরবতাকেই তারা “স্থিতিশীলতা” নামে চালায়।
কিন্তু তারুণ্য এই জায়গাতেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কারণ তারুণ্য প্রশ্ন তোলে। তারুণ্য জানতে চায়—কেন? কার স্বার্থে? কতদিন? এই প্রশ্নই আধমরাদের সবচেয়ে বড় ভয়। তাই তারুণ্যকে কখনো দায়িত্বজ্ঞানহীন বলা হয়, কখনো উসকানিদাতা, কখনো অরাজক। ইতিহাস বলে—যখনই কোনো সমাজ তার তরুণদের ভয় পেতে শুরু করে, তখনই সেই সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
কবি তাই লিখেছিলেন—
“তোরে হেথায় করবে সবাই মানা।
হঠাৎ আলো দেখবে যখন
ভাববে এ কী বিষম কাণ্ডখানা।
সংঘাতে তোর উঠবে ওরা রেগে,
শয়ন ছেড়ে আসবে ধেয়ে ধেয়ে—
আয় প্রচণ্ড, আয় রে আমার কাঁচা।"
এটা হিংসার ডাক নয়; এটা চেতনার আঘাত। এটা জড়তা ভাঙার আহ্বান।
আজকের তারুণ্যের লড়াই কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির পক্ষে নয়। এই লড়াই স্বচ্ছতার পক্ষে, জবাবদিহির পক্ষে, মানবিক রাষ্ট্রের পক্ষে। এই লড়াইয়ে হার মানা মানে শুধু একটি প্রজন্মের পরাজয় নয়—এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—ইতিহাস কখনো সুবিধাবাদীদের মনে রাখে না। ভাষা আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থান—সব বড় পরিবর্তনের পেছনে ছিল তরুণদের অস্বস্তিকর প্রশ্ন। তখনও বলা হয়েছিল, “সময় উপযুক্ত নয়”, “চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ”। আজ সেই কথাগুলো ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।
আমি বিশ্বাস করি, আজকের এই দ্বন্দ্বেও তারুণ্যের পক্ষই জিতবে। কারণ তারুণ্য শেষ পর্যন্ত হারে না—সে হয়তো থামে, ক্লান্ত হয়, কিন্তু নিভে যায় না। আর এই জয়ের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি দেশেরই। কারণ কোনো রাষ্ট্র আধমরাদের কাঁধে ভর করে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
সবুজের অভিযান তাই থামার নয়।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমরা নিজেরা আজ কোন পক্ষে দাঁড়াব?
— মুফিদুল আলম
পরিবেশ চিন্তক ও শিক্ষক
রামু, কক্সবাজার
১
১ মন্তব্য