সহকারী অধ্যাপক
০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৬:১৯ অপরাহ্ণ
বৃদ্ধাশ্রম -মোঃ মুজিবুর রহমান
বৃদ্ধাশ্রম
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক,
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
বহুতল ফ্ল্যাট, ঝকঝকে বাড়ি,
লোহার গেট আর পাহারাদারি।
সোফার নরমে বসে আছেন,
ক্ষমতা-টাকার রাজা আপনি—মানেন?
কিন্তু একদিন সন্ধ্যা নামে,
ডোরবেল বাজে না আর নামে।
ছেলের ফোনে ব্যস্ততা,
মেয়ের চোখে অন্যমনস্কতা।
কারণ শিখাইনি আমরা কাল—
মনুষ্যত্বের সহজ পাঠ,
মানুষ মানুষকে আগলে রাখে,
এটাই তো নৈতিকতার আসল সাধ।
শিখাইনি বলি “বাবা” মানে
শুধু জন্মের হিসাব নয়,
শিখাইনি যে কাঁধে হাত রাখা
সবচেয়ে বড় মানবীয় পরিচয়।
আমরা শিখিয়েছি নাম্বার, গ্রেড,
বিলাস, পদ আর প্রতিযোগিতা—
কিন্তু শিখাইনি হৃদয়ের ব্যবহার,
করুণা, দায় আর কৃতজ্ঞতা।
ফলে একদিন সেই বাড়ির কর্তা,
যার কথায় কাঁপত সংসার,
হয়ে যান ফাইলের এক নাম মাত্র,
ঠিকানা—এক বৃদ্ধাশ্রমের দ্বার।
সেখানে দেয়াল শোনে দীর্ঘশ্বাস,
ঘড়ির কাঁটা গোনে দিন,
সবাই আছে, তবু কেউ নেই—
এই নিঃসঙ্গতাই সবচেয়ে কঠিন।
হে নতুন প্রজন্ম, আজই শোনো,
এই কবিতার সতর্ক ভাষা—
মানুষ হও, মানুষ শেখাও,
নইলে বিলাসই হবে শেষ ঠিকানা।
কারণ বাড়ি শুধু ইট-পাথর নয়,
ফ্ল্যাট নয় ভালোবাসাহীন—
মনুষ্যত্ব যেখানে বাঁচে না,
সেখানেই বৃদ্ধাশ্রম অনিবার্য দিন।
***
বহুতল প্রাসাদ, তালাবদ্ধ দ্বার,
লোহার হাসি, নিরাপত্তা-ভার।
বিত্তের দম্ভে বসে আছেন,
ভাবেন—সবই চিরস্থায়ী জানেন!
কিন্তু সময় বড় নির্মম বিচার,
গণনা করে প্রতিটি আচরণ-চার।
যে ঘরে শেখানো হয়নি দয়া,
সে ঘরেই জন্মায় শীতল প্রয়া।
শিশুকে শেখাও গণিত-বিদ্যা,
ডিগ্রি, পদ, আর জয়ের নেশা—
শেখাওনি কিন্তু মানুষ হওয়া,
ভুলে গেলে মানবিক ভাষা।
ফলে একদিন হিসাব মেলে,
পিতার নাম ফাইলেই ফেলে।
মায়ের ডাক “আছি বাবা”—
ডুবে যায় নোটিফিকেশনের দাবা।
যে কর্তা ছিল সংসার-স্তম্ভ,
কথায় চলত ঘর-গ্রাম-দম্ভ—
সে আজ নম্বর, সে আজ বোঝা,
ঠিকানা—বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজা।
সেখানে সকাল আসে নীরবে,
ঘড়ির কাঁটা হাঁটে নির্বোধে।
সব আছে—খাবার, বিছানা, ছাদ,
নেই শুধু আপন মানুষের স্বাদ।
শোনো হে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম,
এই কঠিন সত্যের শপথ-বচন—
নৈতিকতা যদি না শেখাও,
বিলাসই হবে শেষ আশ্রয়-ভবন।
কারণ মানবতা শূন্য হলে,
প্রাসাদও হয়ে যায় কারাগার।
আর সন্তানের হৃদয় মরলে,
বৃদ্ধাশ্রমই হয় শেষ দরবার।
***
**মানবতা-হীন উত্তরাধিকার **
উঁচু ইমারত, কাঁচে মোড়া ঘর,
মার্বেলের মেঝে, নীরব অহংকার।
গেটের বাইরে পাহারা জাগে,
ভেতরে হৃদয় ধীরে ধীরে ফাঁকে।
বিত্তশালী কর্তা, কঠিন উচ্চারণ,
কথার আদেশে নড়ে সংসার-প্রাণ।
ভাবেন—ক্ষমতা চিরকাল থাকে,
সময় নাকি তারই পদতলে ঝাঁকে!
কিন্তু ইট জানে না পিতৃঋণ,
দেয়াল বোঝে না মায়ের ক্ষণ।
প্রাসাদ দাঁড়ায়, মানুষ ক্ষয়,
এই সত্য ঢেকে রাখে টাকার ভয়।
শিশুর হাতে তুলে দাও বই,
বল—“জয়ই জীবন, হারই ক্ষয়।”
শেখাও নম্বর, শেখাও র্যাংক,
শেখাও দৌড়—মানুষ ভুলে ব্যাংক।
শেখাওনি কিন্তু নরম হওয়া,
শেখাওনি বৃদ্ধ হাত ধরে ধোয়া।
শেখাওনি যে বাবার কাশি
টাকার চেয়েও বড় আশি।
নৈতিকতা পড়ল না পাঠে,
মানবতা রইল না খাতায় সাথে।
ফলে মানুষ হলো যন্ত্রসম,
হৃদয়হীন এক চলমান গণ।
সময় আসে, নিঃশব্দ ছুরি,
কাটে কাটে—কোনোই না জুড়ি।
চুলে নামে রুপালি দাগ,
কণ্ঠে কাঁপে পুরোনো রাগ।
ছেলে বলে—“ব্যস্ত আছি,”
মেয়ে বলে—“পরে কথা বলি।”
একদিন ফোনও বেজে না আর,
নীরবতা ভাঙে শুধু ঘড়ির তার।
যে কর্তা ছিল গৃহের সূর্য,
আজ সে কেবল অতীতের স্মৃত্য।
তার নাম এখন ওয়ার্ড নম্বর,
বিছানা নম্বর, ওষুধের পর।
এখানে সকাল আসে তালিকা মেনে,
নাম ডাকা হয় নির্লিপ্ত জেনে।
সবাই আছে, তবু কেউ নেই,
এই শূন্যতাই সবচেয়ে ভয়ংকর সেই।
দেয়াল শোনে দীর্ঘ নিশ্বাস,
চোখে জমে অনুচ্চারিত ইতিহাস।
ছবির ফ্রেমে হাসে পরিবার,
বাস্তবে নেই কেউ—শুধু অপেক্ষার ভার।
এখানে কেউ ধনী, কেউ গরিব নয়,
সবাই সমান—পরিত্যক্ত পরিচয়।
এখানে প্রাসাদের কোনো দাম নেই,
শুধু মানবিকতার অনুপস্থিতি রয়েই।
হে আগামী প্রজন্ম, আজই থামো,
এই মহাকাব্যের সতর্ক বাণী শোনো।
ডিগ্রি দাও, সম্পদ দাও, শিক্ষা দাও—
কিন্তু আগে মানুষ হওয়া শেখাও।
শেখাও যে বাবা বোঝা নয়,
মা কোনো “অবসর-ফাইল” নয়।
শেখাও যে বৃদ্ধ হাত ধরা
ইবাদতসম—অমৃত ধারা।
কারণ নৈতিকতা ছাড়া সভ্যতা
শুধু বিলাসী বর্বরতা।
আর মানবতা ছাড়া উত্তরাধিকার
একটি ঠিকানা দেয়—বৃদ্ধাশ্রমের দ্বার।
আজ যদি হৃদয় শূন্য করো,
আগামীকাল প্রাসাদও হবে কারাগার।
আজ যদি মানুষ গড়তে ভুল করো,
আগামীকাল সন্তানই হবে বিচারকার।
স্মরণ রেখো—ইট বাঁচায় না মানুষ,
মানুষই মানুষকে রাখে অক্ষুণ্ণ।
যেখানে মানবতা মরে যায় আগে,
সেখানেই বৃদ্ধাশ্রম দাঁড়ায় শেষে।
১
২ মন্তব্য