সহকারী অধ্যাপক
০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:৪৭ অপরাহ্ণ
অঙ্গীকারের আয়না - মোঃ মুজিবুর রহমান
অঙ্গীকারের আয়না
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক,
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
স্মরণ কর সেই ক্ষণ—মহাকালের সাক্ষী,
যখন অঙ্গীকার নিলেন রব বিশ্ববাসী।
বললেন—আল্লাহ ছাড়া করবে না ইবাদাত,
ভাঙবে না তাওহীদের পবিত্র ইমারাত।
পিতা-মাতার প্রতি রেখো ইহসানের হাত,
তাদের সেবাতেই লুকায় জান্নাতের পথ।
আত্মীয়ের অধিকার ভুলে যেয়ো না কভু,
রক্তের বন্ধনে আছে রহমতের সুবাসও।
ইয়াতীমের চোখে যেন না নামে অশ্রু,
মিসকীনের দুয়ারে ফিরো করুণা-ভরু।
মানুষে মানুষে বলো উত্তম ভাষা,
কঠিন কথায় ভেঙো না হৃদয়ের আশা।
সালাত কায়েম করো—আত্মার আলো জ্বালাও,
যাকাত দাও—সম্পদের অহংকার ভাঙাও।
এই ছিল শপথ, এই ছিল পথনির্দেশ,
এতেই ছিল সমাজের ন্যায়ভিত্তি, বিশেষ।
তবু হায়! কতজন ফিরল মুখ ঘুরিয়ে,
অঙ্গীকার ভেঙে গেল নাফসের ডাকে ছুটিয়ে।
অল্প ক’জন রইল সত্যের প্রহরী,
বাকিরা হল উদাসীন, গাফিলতিতে ভরী।
এই আয়াত আজও ডাকে—হে বিবেকবান!
ফিরে এসো অঙ্গীকারে, হও ঈমানদার প্রাণ।
কারণ কথা নয়—আমলই সত্যের প্রমাণ,
আল্লাহর কাছে সেটাই চূড়ান্ত সম্মান।
***
স্মরণ করো—রবের শপথ, ইতিহাসের দিন,
বনী-ইসরাঈল নত, কাঁপে মরুর ঋণ।
বললেন তিনি—আল্লাহ ছাড়া নাই উপাস্য,
ভাঙিলে এ শপথ, ভাঙে মানবতা-স্বাক্ষ্য।
পিতা-মাতার পদতলে রহমতের ধারা,
অবহেলায় ফেলিলে—জান্নাত দূরে সারা।
আত্মীয়ের হক কেটে নিলে, হৃদয় হয় পাথর,
রক্তের বন্ধন ছিন্ন—সমাজ হয় ভস্মস্তর।
ইয়াতীমের অশ্রু যদি পড়ে ভূমির বুকে,
আল্লাহর আরশ কাঁপে নীরব সেই দুঃখে।
মিসকীনের হক গ্রাস করে যে লোভী জন,
তার ইবাদাতও সাক্ষী—মিথ্যারই ধ্বনন।
মানুষের সাথে বলো উত্তম বাক্যবাণী,
কঠোর জিহ্বা জন্ম দেয় ফিতনার আগুনখানি।
সালাত কায়েম—না হলে ঈমানের কি দাম?
যাকাতহীন সম্পদ শুধু জমা করা ধাম।
এই ছিল অঙ্গীকার—স্পষ্ট, দৃঢ়, কঠিন,
নাফসের কাছে হেরে গেলে রইল না সে ঋণ।
তবু হায়! অধিকাংশ ফিরল মুখ ঘুরিয়ে,
সত্যের ডাকে সাড়া না দিয়ে গেল ছুটিয়ে।
অল্প ক’জন দাঁড়াল বুকে ভয় ও আশা,
বাকিরা হারাল দিশা—গাফিলতির বাসা।
আজও আয়াত দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী,
জিজ্ঞেস করে—তুমি কার পক্ষে আছো, কী?
অঙ্গীকার মুখে নয়—আমলে তার ওজন,
ভাঙিলে সে মীসাক, ভাঙে মানুষ-সমাজ-ধ্বজন।
ফিরে এসো! সময় এখনো শেষ হয়নি আজ,
নইলে সাক্ষ্য দেবে এই আয়াত—হাশরের মিজাজ।
****
অঙ্গীকারের ইতিহাস ও মানুষের পতন
(সূরা আল-বাকারা : ৮৩-)
স্মরণ করো, হে মানব—স্মরণ করো সে কাল,
যখন আসমান নীরব, জমিন স্থির-অচল।
রব্বুল আলামীন তুললেন অঙ্গীকারের ভার,
ইতিহাসের বুকে লেখা হলো দীপ্ত অক্ষরহার।
বনী ইসরাঈল দাঁড়াল—ভয় আর আশার মাঝে,
মীসাক বাঁধা হলো তাওহীদেরই সাজে।
ধ্বনিত হলো বাণী—গভীর, অটল, দৃঢ়:
“আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত নয় কদাচিৎ নির্ভর।”
এই এক বাক্যে ভাঙল সকল মিথ্যা মূর্তি,
নাফসের রাজ্য, শয়তানের দুর্গ-প্রাচীর।
কারণ তাওহীদ মানে শুধু সিজদার রীতি নয়,
তাওহীদ মানে জীবনব্যবস্থা—ন্যায় ও ভয়।
এরপর এলো নির্দেশ—মানবতার স্তম্ভ,
পিতা-মাতার প্রতি ইহসান—প্রথম ধর্ম।
যাদের ঘামে গড়া দেহ, যাদের দোয়ায় প্রাণ,
তাদের অবহেলা মানে রবের অবমান।
আত্মীয়-স্বজন—রক্তের যে পবিত্র বন্ধন,
ছিন্ন হলে সমাজ হয় শূন্য ও নির্জন।
হক কেটে নিলে, মুখ ফিরিয়ে নিলে দায়,
তখন আত্মীয়তা শুধু নামফলকই হয়।
ইয়াতীম—যার মাথায় নেই ছায়ার ঘর,
যার চোখে জমে থাকে নিঃশব্দ ক্ষুধার জলর।
তার অশ্রু পড়ে যখন মাটির গভীরে,
আরশ কেঁপে ওঠে ন্যায়বিচারের তীরে।
মিসকীন—যার হাতে নেই সঞ্চয়ের চিহ্ন,
যার জীবন কাঁপে দৈনিক রিযিকের চিন্তায় ভিন্ন।
তার হক গ্রাস করে যে, সে যত নামাজীই হোক,
তার ইবাদাত সাক্ষ্য দেয়—সে আত্মপ্রবঞ্চক লোক।
তারপর বলা হলো—মানুষের সাথে কথা বলো সুন্দর,
ভাষাই তো প্রকাশ করে হৃদয়ের ভিতর।
কঠোর জিহ্বা আগুন জ্বালে সমাজের বুকে,
উত্তম বাক্য শান্তি আনে শত দ্বন্দ্ব ঢেকে।
এরপর স্তম্ভ দাঁড়াল—সালাতের মিনার,
যা ছাড়া ঈমান পড়ে শূন্য বাজার।
সালাত কায়েম মানে সময়ের শাসন,
নাফসকে ভাঙা, আত্মাকে দেয়া শুদ্ধ আসন।
যাকাত এলো—সম্পদের ত্রাস ভাঙতে,
লোভের শিকল ছিঁড়তে, সমাজ জাগাতে।
যাকাতহীন ধন পাহাড় হয় অভিশাপ,
দুনিয়ায় ভার, আখিরাতে ভয়ংকর হিসাব।
এই ছিল মীসাক—পরিপূর্ণ, সুস্পষ্ট,
কোনো অস্পষ্টতা নয়, কোন ফাঁক নয় স্পষ্ট।
তাওহীদ থেকে সমাজ—এক সূত্রে বাঁধা,
ইবাদাত মানে জীবন—শুধু মসজিদে দাঁড়া নয় সাধা।
কিন্তু হায়! ইতিহাস সাক্ষী হয়ে বলে,
অধিকাংশই ফিরল—নাফসেরই ছলে।
অঙ্গীকার মুখে ছিল, আমলে ছিল না,
সত্যের ভার বহন করার শক্তি তারা দিল না।
কিছু সংখ্যক দাঁড়াল—ভয় ও আশায় ভেজা,
রবের সন্তুষ্টিকে করল জীবনের পেজা।
বাকিরা মুখ ফিরিয়ে নিল উদাসীনতায়,
গাফিলতির পর্দায় ঢেকে দিল আয়াতের ডাকটায়।
আজও এই আয়াত দাঁড়িয়ে আছে—নীরব বিচারক,
প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—তুমি কোন পথে চলক?
অঙ্গীকার কি শুধু ইতিহাসের কাহিনি?
নাকি আজও তা জীবনের চালিকা শক্তি?
হে পাঠক! হে শ্রোতা! হে সময়ের সন্তান!
এই অধ্যায় তোমার প্রতিও সমান।
কারণ কুরআনের কথা সময় মানে না সীমা,
যে উপেক্ষা করে আজ—কাল তার সাক্ষ্য দেবে মিজান-মীযান।
ফিরে এসো অঙ্গীকারে—শব্দে নয়, কাজে, নইলে আয়াতই দাঁড়াবে বিপক্ষে, হাশরের সাজে। এই অধ্যায় শেষ নয়—এ এক জীবন্ত ডাক, যে শুনে আমল করে, সেই প্রকৃত মুমিন-সচেতন পথিকই পাক।
ফিরে এসো অঙ্গীকারে—শব্দে নয়, কাজে,
নইলে আয়াতই দাঁড়াবে বিপক্ষে, হাশরের সাজে।
এই অধ্যায় শেষ নয়—এ এক জীবন্ত ডাক,
যে শুনে আমল করে, সেই প্রকৃত মুমিন-সচেতন পথিকই পাক।
১৫
২৫ মন্তব্য