Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৯:০৭ পূর্বাহ্ণ

মস্তিষ্কে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন আর ট্রিলিয়ন সংযোগ: স্বপ্ন স্মৃতি আর ভালোবাসা কি শুধুই জৈব রাসায়নিক সংকেত?


মানুষের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল কাঠামোর একটি। মস্তিষ্কের গঠন এবং কার্যপ্রণালী নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা গত কয়েক দশকে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে মনে করা হতো মানব মস্তিষ্কে প্রায় একশ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে তবে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানী ডক্টর সুজানা হারকুলানো হাউজেল তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, এই সংখ্যাটি আসলে গড়ে ছিয়াশি বিলিয়ন। এই ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরনের মধ্যে প্রায় ষোলো বিলিয়ন নিউরন আমাদের সেরিব্রাল কর্টেক্সে অবস্থান করে, যা মূলত আমাদের সচেতন চিন্তা ও সিদ্ধান্তের কেন্দ্র। এই নিউরনগুলো একে অপরের সাথে কয়েক ট্রিলিয়ন সিন্যাপটিক সংযোগ তৈরি করে এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে যা প্রতিনিয়ত আমাদের চিন্তা ভাবনার সীমানা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।


এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূলে রয়েছে ইলেকট্রো কেমিক্যাল বা বৈদ্যুতিক রাসায়নিক সংকেতের এক নিপুণ সমন্বয়। যখন আমরা কোনো স্বপ্ন দেখি কিংবা কারও প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করি তখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের নিউরন সার্কিটে মানে সিন্যাপটিক সংযোগে বৈদ্যুতিক স্পন্দন প্রবাহিত হয় এবং একই সাথে ডোপামিন বা অক্সিটোসিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার নামক রাসায়নিক নির্গত হয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে আমাদের প্রতিটি স্মৃতি কেবল ক্ষণস্থায়ী বিদ্যুৎ নয় বরং এটি নিউরনের সংযোগস্থলে ঘটা স্থায়ী গাঠনিক পরিবর্তন এবং প্রোটিন সংশ্লেষণের ফলাফল। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এই সংকেতগুলো যখন একটি সুসংগত প্যাটার্ন তৈরি করে তখন সেখান থেকে  চেতনার জন্ম হয়। এটি অনেকটা একটি অর্কেস্ট্রার মতো যেখানে প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র আলাদা আলাদা শব্দ তৈরি করলেও সবাই মিলে যখন একটি সুরে বেজে উঠে তখন তা কেবল শব্দ থাকে না বরং একটি সুমধুর সংগীতে রূপ নেয়।

মস্তিষ্কের এই অবিশ্বাস্য ক্ষমতার নাম নিউরোপ্লাস্টিসিটি।


 ডক্টর হারকুলানো হাউজেল এবং সমসাময়িক গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, মানুষের মস্তিষ্ক কোনো স্থির বস্তু নয় বরং এটি একটি জীবন্ত ক্যানভাস যা অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নিজেকে রিওয়্যার বা পুনর্গঠন করে। আপনি যখন নতুন কিছু শিখছেন তখন আপনার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের মধ্যে নতুন নতুন ভৌত সংযোগ তৈরি করছে। আবার দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা অবহেলা এই সংযোগগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই নমনীয়তাই মানুষকে প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার শক্তি দেয় এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষমতা বজায় রাখে।


মস্তিষ্কের এই জটিলতা আমাদের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে কারণ মানুষের সচেতনতা কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশের কাজ নয় বরং এটি সমগ্র নেটওয়ার্কের একটি সমন্বিত ফলাফল। সামান্য রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা যেমন আমাদের মেজাজ বা আচরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে তেমনি সঠিক পরিবেশ এবং পরিচর্যা আমাদের সৃজনশীলতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বিবর্তনের ধারায় লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তিত এই অঙ্গটি কোনো পূর্বনির্ধারিত ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা নয় বরং এটি বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের এক শ্রেষ্ঠ অর্জন। তাই মস্তিষ্ককে কেবল একটি জৈবিক যন্ত্র হিসেবে না দেখে একে একটি পরম বিস্ময় হিসেবে যত্ন করা উচিত কারণ এটি আমাদের পরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রতিটি মুহূর্তকে অর্থবহ করে তোলে।



মন্তব্য করুন

ব্লগ