Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৯:১২ পূর্বাহ্ণ

"অ্যালগরিদমিক বায়াস": খাঁচায় বন্দী মানবচিন্তা



​ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুড়ো আঙুলের প্রথম স্পর্শ থেকেই শুরু হয় আমাদের এক সমান্তরাল জীবন। ফেসবুকের নিউজফিড, ইউটিউবের সাজেস্ট করা ভিডিও কিংবা গুগলের সার্চ রেজাল্ট—সবই যেন আমাদের মনের গহীনের কোনো এক গোপন ইচ্ছাকে বারবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে। আমরা ভাবি, প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করছে, আমাদের পছন্দকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি, পর্দার আড়ালে থাকা এই 'অ্যালগরিদম' নামক অদৃশ্য সুতোটি আসলে কার ইশারায় নাচছে? সে কি নিরপেক্ষ এক বিচারক, নাকি আমাদেরই লালন করা সামাজিক কুসংস্কারের এক ডিজিটাল সংস্করণ?


​অ্যালগরিদমিক বায়াস: এক অদৃশ্য শৃঙ্খল

​অ্যালগরিদমিক বায়াস বা অ্যালগরিদমের পক্ষপাতিত্ব হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা মতাদর্শের প্রতি অন্যায্যভাবে ঝুঁকে পড়ে। আমরা অনেক সময় মনে করি, কম্পিউটার যেহেতু মানুষের মতো রক্ত-মাংসের নয়, তাই সে আবেগহীন এবং নিরপেক্ষ। কিন্তু সত্যটা হলো, এআই নিজে থেকে কিছু শেখে না; সে শেখে আমাদের দেওয়া 'ডেটা' বা তথ্য থেকে। যদি আমাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে শত বছরের সামাজিক বৈষম্য, তবে এআই সেই বিষবৃক্ষকেই মহীরুহে রূপান্তর করে।

​একে বলা হয় "Garbage In, Garbage Out"। অর্থাৎ, যদি ইনপুট হিসেবে আমরা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিই, তবে আউটপুট হিসেবে আমরা বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তই পাব।


​সোশ্যাল মিডিয়া: চিন্তার এক 'ইকো চেম্বার'

​সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমগুলো ডিজাইন করা হয়েছে একটি মাত্র উদ্দেশ্যে—আপনাকে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখা। একে বলা হয় 'এঙ্গেজমেন্ট'। আপনি যা পছন্দ করেন, অ্যালগরিদম আপনাকে বারবার ঠিক সেটিই দেখায়। এর ফলে তৈরি হয় এক 'ফিল্টার বাবল' (Filter Bubble)।

​ভাবুন তো, আপনি যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ পছন্দ করেন, তবে আপনার ফিডে শুধু সেই মতের মানুষের কথা এবং খবরই আসতে থাকবে। বিরোধী পক্ষের কোনো যুক্তি আপনার সামনে পৌঁছাবেই না। এভাবেই ধীরে ধীরে আপনি একটি 'ইকো চেম্বার'-এর ভেতর আটকা পড়েন, যেখানে নিজের গলার প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কারো আওয়াজ শোনা যায় না। এভাবেই অ্যালগরিদম আমাদের অজান্তেই চরমপন্থী করে তোলে এবং সমাজের মেরুকরণকে তীব্রতর করে।


​সার্চ ইঞ্জিন: সত্যের রঙ যেখানে নির্ধারিত

​আমরা যখন গুগলে কিছু খুঁজি, আমরা ধরে নিই এটিই পরম সত্য। কিন্তু সার্চ রেজাল্টও সবসময় নিরপেক্ষ নয়। দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু পেশার নাম লিখে সার্চ দিলে অ্যালগরিদম একটি নির্দিষ্ট বর্ণের বা লিঙ্গের মানুষের ছবি বেশি দেখায়। যেমন—দীর্ঘদিন ধরে 'সিইও' (CEO) লিখে সার্চ দিলে কেবল শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের ছবি প্রাধান্য পেত। এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক পক্ষপাতিত্বের প্রতিফলন। যখন একজন কিশোর বা শিশু এই রেজাল্টগুলো দেখে, তার মনে অজান্তেই গেঁথে যায় যে, উচ্চপদস্থ হওয়া মানেই বোধহয় একটি বিশেষ লিঙ্গ বা বর্ণের অধিকারী হওয়া।


​আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি বর্ণবাদী বা লিঙ্গবাদী হতে পারে?

​বাস্তবতা হলো—হ্যাঁ। এর কিছু ভয়ংকর উদাহরণ চিকিৎসা এবং বিচার ব্যবস্থায় দেখা গেছে:


​অপরাধ শনাক্তকরণ: আমেরিকায় ব্যবহৃত কিছু এআই সফটওয়্যার (যেমন COMPAS) দেখা গেছে কৃষ্ণাঙ্গ অপরাধীদের পুনরায় অপরাধ করার হার শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অনেক বেশি দেখায়, যদিও বাস্তবে তার কোনো ভিত্তি ছিল না।


​নিয়োগ প্রক্রিয়া: অ্যামাজনের একটি এআই নিয়োগ টুল একসময় নারীদের সিভি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দিচ্ছিল, কারণ সে শিখেছিল যে গত ১০ বছরে টেক ইন্ডাস্ট্রিতে পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল।


​অ্যালগরিদমের মায়া: ​অ্যালগরিদম যেন অনেকটা গ্রিক পুরাণের সেই 'নার্সিসাস'-এর মতো, যে জলের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মোহিত হয়েছিল। আমরা যখন ইন্টারনেটে সার্চ করি বা স্ক্রল করি, অ্যালগরিদম আমাদের সামনে আমাদেরই পছন্দ-অপছন্দের একটি আয়না ধরে। আমরা সেই মায়াবী আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ভাবি এটাই জগত। অথচ সেই আয়নার বাইরে এক বিশাল বৈচিত্র্যময় পৃথিবী রয়ে গেছে, যা আমরা কখনোই দেখতে পাই না। এই প্রযুক্তি যেন এক 'আধুনিক ধৃতরাষ্ট্র', যার চোখের ওপর নিয়ম-নীতির পট্টি বাঁধা, কিন্তু যার বিচারকার্য পরিচালিত হয় স্বার্থান্বেষী ডেটার ইশারায়।

"আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করছি যেখানে অ্যালগরিদম আমাদের মনের জানলাগুলো একে একে বন্ধ করে দিচ্ছে, এবং আমরা ভাবছি আমরা বিশ্বকে দেখছি।"


​পরিত্রাণের উপায় কী?

​অ্যালগরিদমিক বায়াস থেকে মুক্তি পাওয়া রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে কিছু সচেতনতা প্রয়োজন:

​ডেটা ডাইভারসিটি: এআই-কে প্রশিক্ষিত করার সময় সব ধরণের গোষ্ঠী ও মতাদর্শের তথ্য ব্যবহার নিশ্চিত করা।

​অ্যালগরিদমিক অডিট: প্রতিটি বড় টেক কোম্পানিকে তাদের অ্যালগরিদম নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে যে সেটি কোনো বৈষম্য করছে কি না।

​ব্যক্তিগত সচেতনতা: নিজের ইকো চেম্বার ভাঙার চেষ্টা করুন। মাঝেমধ্যে ভিন্নমতের খবর পড়ুন বা সার্চ হিস্ট্রি পরিষ্কার করে দেখুন জগতটা আসলে কত বড়।

​

শেষ কথা: ​প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা হবে এক ধরণের আত্মহনন। অ্যালগরিদম আমাদের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু আমাদের গন্তব্য ঠিক করার ক্ষমতা কেবল আমাদেরই থাকা উচিত। মনে রাখতে হবে, মানুষের বিবেক আর নৈতিকতা যদি যন্ত্রের ওপর স্থান না পায়, তবে একদিন আমরা এমন এক পৃথিবীর বাসিন্দা হব, যেখানে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে কেবল একটি 'ইউনিক আইডি' বা 'প্রোফাইল', আর আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে যাবে কয়েক লাইন কোডিংয়ের গোলকধাঁধায়।


​

মন্তব্য করুন

ব্লগ