সহকারী অধ্যাপক
০৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৯:০৩ অপরাহ্ণ
আমিই তোমাকে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল
আমিই তোমাকে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
সূরাঃ আল-কাহফ আয়াতঃ ১০-১৪ মাক্কী
১০ اِذۡ اَوَی الۡفِتۡیَۃُ اِلَی الۡكَهۡفِ فَقَالُوۡا رَبَّنَاۤ اٰتِنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ رَحۡمَۃً وَّ هَیِّیٴۡ لَنَا مِنۡ اَمۡرِنَا رَشَدًا
যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল অতঃপর বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকান্ড সঠিক করে দিন’।
-আল-বায়ান
যুবকরা যখন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করল তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তোমার নিকট হতে আমাদেরকে রহমত দান কর আর আমাদের ব্যাপারটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন কর।’
-তাইসিরুল
যুবকরা যখন গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিলঃ হে আমাদের রাব্ব! আপনি নিজ হতে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।
-মুজিবুর রহমান
[Mention] when the youths retreated to the cave and said, "Our Lord, grant us from Yourself mercy and prepare for us from our affair right guidance."
-Sahih International
১০. যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব! আপনি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।(১)
(১) এ ধরনের দো'আ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও করতেন এবং উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেনঃ اللَّهُمَّ مَا قَضَيْتَ لَنَا مِنْ قَضَاءٍ فَاجْعَلْ عَاقِبَتَهُ رُشْدًا “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আপনি যা ফয়সালা করেছেন সেগুলোর সুন্দর সমাপ্তি দিন”। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৮১]
তাফসীরে জাকারিয়া
(১০) যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি নিজের তরফ থেকে আমাদেরকে করুণা দান কর এবং আমাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা কর।’[1]
[1] এরা হল সেই যুবকদল, যাদেরকে ‘আসহাবে কাহ্ফ’(গুহার অধিবাসী) বলা হয়েছে। (বিস্তারিত আলোচনা ১৪৮নং টীকায় আসছে।) তারা যখন নিজেদের দ্বীনের রক্ষার্থে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল, তখন এই প্রার্থনা করেছিল। আসহাবে কাহ্ফদের এই ঘটনায় যুবকদের জন্য রয়েছে গুরুতত্ত্বপূর্ণ শিক্ষা। বর্তমানে যুবকদের বেশীর ভাগ সময় নষ্ট হয় অনর্থক কার্যকলাপে তথা আল্লাহর প্রতি তাদের তেমন কোন ভ্রূক্ষেপ থাকে না। আজকের মুসলিম যুবকেরা যদি তাদের যৌবনকালকে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করত, তাহলে কতই না ভাল হত!
১১ فَضَرَبۡنَا عَلٰۤی اٰذَانِهِمۡ فِی الۡكَهۡفِ سِنِیۡنَ عَدَدًا
ফলে আমি গুহায় তাদের কান বন্ধ করে দিলাম অনেক বছরের জন্য।
-আল-বায়ান
অতঃপর আমি তাদেরকে গুহায় ঘুমন্ত অবস্থায় কয়েক বছর রেখে দিলাম।
-তাইসিরুল
অতঃপর আমি তাদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে দিলাম।
-মুজিবুর রহমান
So We cast [a cover of sleep] over their ears within the cave for a number of years.
-Sahih International
১১. অতঃপর আমরা তাদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম,(১)
(১) (فَضَرَبْنَا عَلَىٰ آذَانِهِمْ) এর শাব্দিক অর্থ কর্ণকুহর বন্ধ করে দেয়া। অচেতন নিদ্রাকে এই ভাষায় ব্যক্ত করা হয়। কেননা, নিদ্রায় সর্বপ্রথম চক্ষু বন্ধ হয়, কিন্তু কান সক্রিয় থাকে। আওয়াজ শোনা যায়। অতঃপর যখন নিদ্ৰা পরিপূর্ণ ও প্রবল হয়ে যায়, তখন কানও নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। জাগরণের সময় সর্বপ্রথম কান সক্রিয় হয়। আওয়াজের কারণে নিদ্রিত ব্যক্তি সচকিত হয়, অতঃপর জাগ্রত হয়। [দেখুন, কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(১১) অতঃপর আমি গুহায় কয়েক বছর তাদের কানে পর্দা দিয়ে রাখলাম।[1]
[1] অর্থাৎ, কানে পর্দা সৃষ্টি করে তা বন্ধ করে দিলাম। যাতে বাইরের শব্দের কারণে তাদের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। অর্থাৎ, আমি তাদেরকে গভীরভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১২ ثُمَّ بَعَثۡنٰهُمۡ لِنَعۡلَمَ اَیُّ الۡحِزۡبَیۡنِ اَحۡصٰی لِمَا لَبِثُوۡۤا اَمَدًا
তারপর আমি তাদেরকে জাগালাম, যাতে আমি জানতে পারি, যতটুকু সময় তারা অবস্থান করেছিল, দু’দলের মধ্যে* কে তা অধিক নির্ণয়কারী।
-আল-বায়ান
পরে তাদেরকে জাগ্রত করলাম এটা জানার জন্য যে, (গুহাবাসীরা আর যাদের যুগে তারা জাগ্রত হয়েছিল সে যুগের লোকেরা এ) দু’টি দলের মধ্যে কোনটি তাদের অবস্থানকালের সঠিক হিসাব করতে পারে।
-তাইসিরুল
পরে আমি তাদেরকে জাগরিত করলাম এটা জানার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থিতি কাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।
-মুজিবুর রহমান
Then We awakened them that We might show which of the two factions was most precise in calculating what [extent] they had remained in time.
-Sahih International
* গুহায় অবস্থান কাল নিয়ে দু’টি দল হয়েছিল। একদল বলেছিল, আমরা অবস্থান করেছি এক দিন অথবা এক দিনের কিছু কম সময়; অন্যদল বলেছিল, দীর্ঘ সময়।
১২. পরে আমরা তাদেরকে জাগিয়ে দিলাম জানার জন্য যে, দু'দলের মধ্যে কোনটি(১) তাদের অবস্থিতিকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।
(১) অর্থাৎ মতবিরোধে লিপ্ত দু’টি দলের মধ্যে কারা তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারে। এখানে জানা অর্থ, প্রকাশ করা। [ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(১২) পরে আমি তাদেরকে জাগরিত করলাম এই জানবার জন্য যে, দুই দলের মধ্যে কোনটি তাদের অবস্থানকাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।[1]
[1] এই দু’টি দল বলতে তারা, যারা মতবিরোধ করেছিল। এরা হয়তো সেই যুগেরই মানুষ ছিল, যাদের মধ্যে এদের ব্যাপারে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। অথবা নবী (সাঃ)-এর যুগের মু’মিন ও কাফেররা। আবার কেউ বলেছেন, এরা ছিল গুহারই অধিবাসী। তাদের মধ্যে দু’টি দল হয়ে গিয়েছিল। একদল বলল, আমরা এত দিন এখানে ঘুমিয়ে ছিলাম। অন্য দল এ কথা অস্বীকার করে প্রথম দলের চেয়ে কিছু কম-বেশী সময়-কাল বলল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৩ نَحۡنُ نَقُصُّ عَلَیۡكَ نَبَاَهُمۡ بِالۡحَقِّ ؕ اِنَّهُمۡ فِتۡیَۃٌ اٰمَنُوۡا بِرَبِّهِمۡ وَ زِدۡنٰهُمۡ هُدًی﴾
আমিই তোমাকে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
-আল-বায়ান
আমি তাদের সঠিক বৃত্তান্ত তোমার কাছে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ঈমান এনেছিল আর আমি তাদের হিদায়াত (ঈমানী চেতনাকে) বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।
-তাইসিরুল
আমি তোমার কাছে তাদের সঠিক বৃত্তান্ত বর্ণনা করছিঃ তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের রবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎ পথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম।
-মুজিবুর রহমান
It is We who relate to you, [O Muhammad], their story in truth. Indeed, they were youths who believed in their Lord, and We increased them in guidance.
-Sahih International
১৩. আমরা আপনার কাছে তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি; তারা তো ছিল কয়েকজন যুবক(১), তারা তাদের রব-এর উপর ঈমান এনেছিল।(২) এবং আমরা তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।(৩)
(১) فتية শব্দটি فتي এর বহুবচন, অর্থ যুবক। [ফাতহুল কাদীর] তাফসীরবিদগণ লিখেছেন, এ শব্দের মধ্যে ইঙ্গিত আছে যে, কর্ম সংশোধন, চরিত্র গঠন এবং হেদায়াত লাভের উপযুক্ত সময় হচ্ছে যৌবনকাল। বৃদ্ধ বয়সে পূর্ববর্তী কর্ম ও চরিত্র এত শক্তভাবে শেকড় গেড়ে বসে যে, যতই এর বিপরীত সত্য পরিস্ফুট হোক না কেন, তা থেকে বের হয়ে আসা দুরূহ হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাওয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারী সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন যুবক। [ইবন কাসীর]
(২) আসহাবে কাহফের স্থান ও কাল নির্ণয়ে বিভিন্ন মত এসেছে। এগুলোর কোনটি যে সঠিক সে ব্যাপারে সঠিক কোন সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। আলেমগণ এ ব্যাপারে দুটি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাদের একদলের মত হলো, আমাদেরকে শুধু এ ঘটনার শুদ্ধ হওয়া ও তা থেকে শিক্ষা নেয়ার উপরই প্রচেষ্টা চালানো উচিত। তাদের স্থান ও কাল নির্ধারনে ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্য একদল মুফাসসির ও ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে বিভিন্ন মত পেশ করার মাধ্যমে কাহিনীটি বোঝার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে চেয়েছেন।
তাদের অধিকাংশের মতে, আসহাবে কাহফের ঘটনাটি ঘটে আফসোস নগরীতে। হাফেয। ইবন কাসীর রাহেমাহুল্লাহ তার তাফসীরে এ সাতজন যুবকের কালকে ঈসা আলাইহিস সালামের পূর্বেকার ঘটনা বলে মত দিয়েছেন। ইয়াহুদীগণ কর্তৃক এ ঘটনাটিকে বেশী প্রাধান্য দেয়া এবং মক্কার মুশরিকদেরকে এ বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করতে শিখিয়ে দেয়াকে তিনি তার মতের সপক্ষে দলীল হিসেবে পেশ করেন। [দেখুন, ইবন কাসীর]
কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ এ ঘটনাটিকে ঈসা আলাইহিস সালামের পরবর্তী ঘটনা বলে বর্ণনা করে থাকেন। তাদের মতে, ঈসা আলাইহিস সালামের পর যখন তার দাওয়াত রোম সামাজ্যে পৌঁছতে শুরু করে তখন এ শহরের কয়েকজন যুবকও শির্ক থেকে তাওবা করে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে তাদের যে বর্ণনা এসেছে তা সংক্ষেপ করলে নিম্নরূপ দাঁড়ায়ঃ তারা ছিলেন সাতজন যুবক। তাদের ধর্মান্তরের কথা শুনে তৎকালীন রাজা তাদেরকে নিজের কাছে ডেকে পাঠান।
তাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ধর্ম কি? তারা জানতেন, এ রাজা ঈসার অনুসারীদের রক্তের পিপাসু। কিন্তু তারা কোন প্রকার শংকা না করে পরিষ্কার বলে দেন, আমাদের রব তিনিই যিনি পৃথিবী ও আকাশের রব। তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদকে আমরা ডাকি না। যদি আমরা এমনটি করি তাহলে অনেক বড় গুনাহ করবো। রাজা প্রথমে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, তোমাদের মুখ বন্ধ করো, নয়তো আমি এখনই তোমাদের হত্যা করার ব্যবস্থা করবো।
তারপর কিছুক্ষণ থেমে থেকে বললেন, তোমরা এখনো শিশু। তাই তোমাদের তিনদিন সময় দিলাম। ইতিমধ্যে যদি তোমরা নিজেদের মত বদলে ফেলো এবং জাতির ধর্মের দিকে ফিরে আসো তাহলে তো ভাল, নয়তো তোমাদের শিরশ্ছেদ করা হবে। এ তিন দিন অবকাশের সুযোগে এ সাতজন যুবক শহর ত্যাগ করেন। তারা কোন গুহায় লুকাবার জন্য পাহাড়ের পথ ধরেন। পথে একটি কুকুর তাদের সাথে চলতে থাকে। তারা কুকুরটাকে তাদের পিছু নেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য বহু চেষ্টা করেন।
কিন্তু সে কিছুতেই তাদের সংগ ত্যাগ করতে রাযী হয়নি। শেষে একটি বড় গভীর বিস্তৃত গুহাকে ভাল আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়ে তারা তার মধ্যে লুকিয়ে পড়েন। কুকুরটি গুহার মুখে বসে পড়ে। দারুন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত থাকার কারণে তারা সবাই সংগে সংগেই ঘুমিয়ে পড়েন। কয়েকশত বছর পর তারা জেগে উঠেন। তখন ছিল অন্য রাজার শাসনামল। রোম সাম্রাজ্য তখন নাসারা ধর্ম গ্ৰহণ করেছিল এবং আফসোস শহরের লোকেরাও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেছিল।
এটা ছিল এমন এক সময় যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে মৃত্যু পরের জীবন এবং কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে জমায়েত ও হিসেব নিকেশ হওয়া সম্পর্কে প্ৰচণ্ড মতবিরোধ চলছিল। আখেরাত অস্বীকারের বীজ লোকদের মন থেকে কিভাবে নির্মূল করা যায় এ ব্যাপারটা নিয়ে কাইজার নিজে বেশ চিন্তিত ছিলেন। একদিন তিনি আল্লাহর কাছে দো'আ করেন যেন তিনি এমন কোন নির্দশন দেখিয়ে দেন যার মাধ্যমে লোকেরা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। ঘটনাক্রমে ঠিক এ সময়েই এ যুবকরা ঘুম থেকে জেগে উঠেন। জেগে উঠেই তারা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করেন, আমরা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি?
কেউ বলেন একদিন, কেউ বলেন দিনের কিছু অংশ। তারপর আবার একথা বলে সবাই নীরব হয়ে যান যে এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন। এরপর তারা নিজেদের একজন সহযোগীকে রূপার কয়েকটি মুদ্রা দিয়ে খাবার আনার জন্য শহরে পাঠান। তারা ভয় করছিলেন, লোকেরা আমাদের ঠিকানা জানতে পারলে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে এবং মূর্তি পূজা করার জন্য আমাদের বাধ্য করবে। কিন্তু লোকটি শহরে পৌঁছে সবকিছু বদলে গেছে দেখে অবাক হয়ে যান। একটি দোকানে গিয়ে তিনি কিছু রুটি কিনেন এবং দোকানদারকে একটি মুদ্রা দেন।
এ মুদ্রার গায়ে অনেক পুরাতন দিনের সম্রাটের ছবি ছাপানো ছিল। দোকানদার এ মুদ্রা দেখে অবাক হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, এ মুদ্রা কোথায় পেলে? লোকটি বলে, এ আমার নিজের টাকা, অন্য কোথাও থেকে নিয়ে আসিনি। এ নিয়ে দু'জনের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হয়। লোকদের ভীড় জমে উঠে। এমন কি শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নগর কোতোয়ালের কাছে পৌছে যায়। কোতোয়াল বলেন, এ গুপ্ত ধন যেখান থেকে এনেছো সেই জায়গাটা কোথায় আমাকে বলে। সে বলেন, কিসের গুপ্তধন? এ আমার নিজের টাকা। কোন গুপ্তধনের কথা আমার জানা নেই।
কোতোয়াল বলেন, তোমার একথা মেনে নেয়া যায় না। কারণ তুমি যে মুদ্রা এনেছো এতো কয়েক শো বছরের পুরনো। তুমি তো সবেমাত্র যুবক, আমাদের বুড়োরাও এ মুদ্রা দেখেনি। নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন রহস্য আছে। লোকটি যখন শোনেন অত্যাচারী যালেম শাসক মারা গেছে বহুযুগ আগে তখন তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোন কথাই বলতে পারেন না। তারপর আস্তে আস্তে বলেন, এ তো মাত্ৰ কালই আমি এবং আমার ছয়জন সাথী এ শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম এবং যালেম বাদশার যুলুম থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। লোকটির একথা শুনে কোতোয়ালও অবাক হয়ে যান।
তিনি তাকে নিয়ে যেখানে তার কথা মতো তারা লুকিয়ে আছেন সেই গুহার দিকে চলেন। বিপুল সংখ্যক জনতাও তাদের সাথী হয়ে যায়। তারা যে যথার্থই অনেক আগের সম্রাটের আমলের লোক সেখানে পৌঁছে। এ ব্যাপারটি পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যায়। এ ঘটনার খবর তৎকালীন সম্রাটের কাছেও পাঠানো হয়। তিনি নিজে এসে তাদের সাথে দেখা করেন। তারপর হঠাৎ তারা সাতজন গুহার মধ্যে গিয়ে সটান শুয়ে পড়েন এবং তাদের মৃত্যু ঘটে। এ সুস্পষ্ট নির্দশন দেখে লোকেরা যথার্থই মৃত্যুর পরে জীবন আছে বলে বিশ্বাস করে। এ ঘটনার পর সম্রাটের নির্দেশে গুহায় একটি ইবাদাতখানা নির্মাণ করা হয়। [বিস্তারিত দেখুন, কুরতুবী; বাগভী; ইবন কাসীর; তাফসীর ও আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহঃ ২/৫৭০]
(৩) আয়াতের অর্থ হলো, যখন তারা খাঁটি মনে ঈমান আনলো তখন আল্লাহ তাদের ঈমান বৃদ্ধির মাধ্যমে সঠিকপথে চলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দিলেন এবং তাদের ন্যায় ও সত্যের উপর অবিচল থাকার সুযোগ দিলেন। তারা নিজেদেরকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে কিন্তু বাতিলের কাছে মাথা নত করবে না। এ আয়াত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের একটি সুস্পষ্ট দলীল যে, ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। অনুরূপ দলীল সূরা মুহাম্মদ এর ১৭, সূরা আত-তাওবার ১২৪ এবং সূরা আল-ফাতিহ এর ৪ নং আয়াতেও এসেছে।
তাফসীরে জাকারিয়া
(১৩) আমি তোমার কাছে তাদের সঠিক বৃত্তান্ত বর্ণনা করছিঃ তারা ছিল কয়েকজন যুবক,[1] তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম ।
[1] সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এখন বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে। এই যুবকদের ব্যাপারে কেউ কেউ বলে, তারা খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিল। কেউ বলে, তাদের যুগ হল ঈসা (আঃ)-এর পূর্বের যুগ। হাফেয ইবনে কাসীর এ কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, দাকয়ানুস নামে একজন রাজা ছিল। সে লোকদেরকে মূর্তিপূজা করতে এবং তাদের নামে নজরানা পেশ করতে উদ্বুদ্ধ করত। মহান আল্লাহ এই যুবকদের অন্তরে এ কথা প্রক্ষিপ্ত করলেন যে, ইবাদতের যোগ্য তো একমাত্র সেই আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা এবং বিশ্বজাহানের প্রতিপালক। فِتْيَةٌ হল ‘জাময়ে কিল্লাত’ (স্বল্প সংখ্যাবোধক বহুবচন)। এ (فِتْيَةٌ) থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তারা সংখ্যায় ৯জন ছিল অথবা তার থেকেও কম ছিল। এরা (লোকালয়) থেকে পৃথক হয়ে কোন এক স্থানে এক আল্লাহর ইবাদত করত। ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে তাদের আকীদা তাওহীদের চর্চা হতে লাগল। পরিশেষে রাজার নিকট পর্যন্ত তাদের কথা পৌঁছে গেলে সে তাদেরকে নিজ দরবারে ডেকে এনে ঘটনা জিজ্ঞাসা করল। সেখানে তারা পরিষ্কারভাবে আল্লাহর তাওহীদের কথা বর্ণনা করল। শেষ পর্যায়ে রাজা এবং মুশরিক জাতির ভয়ে নিজেদের দ্বীনকে রক্ষা করার জন্য লোকালয় থেকে বেরিয়ে এক পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করল। সেখানে মহান আল্লাহ তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন এবং ৩০৯ বছর পর্যন্ত তারা ঘুমিয়ে থাকল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
শেয়ার লিঙ্ক কপি হয়েছে!
১৪ وَّ رَبَطۡنَا عَلٰی قُلُوۡبِهِمۡ اِذۡ قَامُوۡا فَقَالُوۡا رَبُّنَا رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ لَنۡ نَّدۡعُوَا۠ مِنۡ دُوۡنِهٖۤ اِلٰـهًا لَّقَدۡ قُلۡنَاۤ اِذًا شَطَط﴾
যখন তারা উঠেছিল, আমি তাদের অন্তরকে দৃঢ় করেছিলাম। তখন তারা বলল, ‘আমাদের রব আসমানসমূহ ও যমীনের রব। তিনি ছাড়া কোন ইলাহকে আমরা কখনো ডাকব না। (যদি ডাকি) তাহলে নিশ্চয় আমরা গর্হিত কথা বলব’।
-আল-বায়ান
আর তাদের দিল মযবুত করে দিয়েছিলাম যখন তারা (মুশরিক রাজা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে) দাঁড়িয়ে গেল তখন বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক তো তিনিই যিনি আসমানসমূহ যমীনের প্রতিপালক। আমরা কক্ষনো তাঁকে ত্যাগ করে অন্য কোন ইলাহকে ডাকব না। যদি আমরা ডাকি তাহলে মহা অপরাধের কথাই বলা হবে।
-তাইসিরুল
আর আমি তাদের চিত্ত দৃঢ় করেছিলাম; তারা যখন উঠে দাঁড়াল তখন বললঃ আমাদের রাব্ব আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রাব্ব; আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন মা‘বূদকে আহবান করবনা; যদি করি তাহলে তা অতিশয় গর্হিত হবে।
-মুজিবুর রহমান
And We made firm their hearts when they stood up and said, "Our Lord is the Lord of the heavens and the earth. Never will we invoke besides Him any deity. We would have certainly spoken, then, an excessive transgression.
-Sahih International
১৪. আর আমরা তাদের চিত্ত দৃঢ় করে দিলাম; তারা যখন উঠে দাঁড়াল তখন বলল, আমাদের রব। আসমানসমূহ ও যমীনের রব। আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহকে ডাকব না; যদি ডাকি, তবে তা হবে খুবই গৰ্হিত কথা।
তাফসীরে জাকারিয়া
(১৪) আর আমি তাদের অন্তরকে সুদৃঢ় করেছিলাম;[1] তারা যখন উঠে দাঁড়াল[2] তখন বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক; আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না; যদি করে বসি তাহলে তা অতিশয় গর্হিত হবে। [3]
[1] অর্থাৎ, হিজরত করার কারণে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন থেকে পৃথক এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ধাক্কা যেহেতু তাদের উপর আসছে, তাই আল্লাহ তাদের অন্তরকে সুদৃঢ় করে দিলেন। যাতে তারা তাদের জীবনের বিপদ-আপদকে খুশী মনে বরণ করে নিতে পারে। অনুরূপ হক বলার দায়িত্বকেও যেন সাহস ও উৎসাহের সাথে পালন করতে পারে।
[2] এই দাঁড়ানো অধিকাংশ মুফাসসিরের নিকট রাজার দরবারে ছিল, তারা রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তাওহীদের ওয়ায করেছিল। কেউ কেউ বলেন, শহর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আপোসে একে অপরকে তাওহীদের সেই কথা শুনাতে লাগলেন, যা এক এক করে প্রত্যেকের অন্তরে ভরে দেওয়া হয়েছিল এবং এইভাবে তারা আপোসে একত্রিত হয়ে গেল।
[3] شَطَطًا অর্থ, মিথ্যা অথবা সীমালঙ্ঘন করা।
১
১ মন্তব্য