সহকারী শিক্ষক
০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
টাইমলেস রিঅ্যালিটি: মহাবিশ্বের ডায়েরিতে নেই কোনো 'সময়' !
টাইমলেস রিঅ্যালিটি: মহাবিশ্বের ডায়েরিতে নেই কোনো 'সময়' !
আপনার চোখের সামনে টিকটিক করে চলতে থাকা ঘড়িটি কি আসলে মিথ্যা বলছে? আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় সময় হলো একটি অবিরাম বয়ে চলা নদী, যা আমাদের অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় সময়ের এই পরিচিত সংজ্ঞাটি মিথ্যে প্রমাণিত হচ্ছে। বর্তমানের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে, সময়ের আসলে কোনো মৌলিক অস্তিত্ব নেই বরং এটি আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় এবং মস্তিষ্কের তৈরি করা একটি জটিল বিভ্রম মাত্র। মহাবিশ্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটি হলো এটি একটি স্থির এবং সময়হীন বাস্তবতা যেখানে শুরু এবং শেষ বলে আলাদা কিছু নেই।
এই বৈপ্লবিক ধারণার মূলে রয়েছে আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। তার থিউরি অনুযায়ী, সময় সবার জন্য সমান নয়। মহাকাশের কোনো এক স্থানে আপনার কাছে যা বর্তমান অন্য কারো কাছে তা অতীত বা ভবিষ্যৎ হতে পারে। এর মানে হলো মহাবিশ্বের প্রতিটি মুহূর্তই আসলে কোথাও না কোথাও বর্তমানে বিদ্যমান। একে বিজ্ঞানীরা ব্লক ইউনিভার্স থিওরি বলে অভিহিত করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব অনেকটা একটি বড় পাউরুটির মতো যেখানে সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত পাউরুটির এক একটি স্লাইস। আপনি যদি পাউরুটিটি হাতে ধরেন তবে যেমন সব স্লাইস একসাথে আপনার হাতে থাকে তেমনি মহাবিশ্বের ডায়েরিতে বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে আপনার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সবকিছু একই সাথে খোদাই ক
সময়ের এই অস্তিত্বহীনতার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছেন প্রখ্যাত ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী কার্লো রভেলি। তার গবেষণার মূল ভিত্তি হলো লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। রভেলি এবং তার পূর্বসূরি জন হুইলার এবং ব্রাইস ডিউইট গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন যে, মহাবিশ্বের মৌলিক সমীকরণগুলোতে সময়ের কোনো ঠাঁই নেই। যাকে আমরা হুইলার ডিউইট ইকুয়েশন বলি সেখানে দেখা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়াই পুরো মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা সম্ভব। রভেলির মতে, আমাদের মস্তিষ্ক তাপগতিবিদ্যার বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপি বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে সময় হিসেবে ভুল করে। পৃথিবী যেহেতু একটি বিশাল এবং বিশৃঙ্খল জায়গা তাই আমাদের চারপাশের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোকে আমরা একটি কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা হিসেবে সাজিয়ে নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম স্তরে দেখা যায় সেখানে কোনো অতীত বা ভবিষ্যৎ নেই।
বিজ্ঞানীরা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য দিচ্ছেন। আমরা যাকে 'বর্তমান' বলি তা আসলে একটি মানসিক সংকলন মাত্র। একটি ঘটনা ঘটার পর আমাদের স্নায়ু সেই সংকেতটি মস্তিষ্কে পৌঁছাতে এবং প্রসেস করতে সামান্য কিছু সময় নেয়। অর্থাৎ আমরা সবসময়ই একটি বাসি বর্তমানের মধ্যে বাস করছি। যদি মহাবিশ্বের ডায়েরিতে সময় নাই থাকে তবে আমরা কেন জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি বলে মনে করি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের স্মৃতিতে। আমাদের মস্তিষ্ক অতীতকে সংরক্ষণ করতে পারে কিন্তু ভবিষ্যৎকে পারে না বলেই আমরা কেবল একমুখী প্রবাহ অনুভব করি। বাস্তব সত্যটি হলো আপনার শৈশব এবং আপনার বার্ধক্য মহাজাগতিক ক্যানভাসে দুটি আলাদা স্থির বিন্দুর মতো সারাক্ষণ উজ্জ্বল হয়ে আছে।
গবেষণার এই থিউরি যদি সম্পূর্ণ সঠিক প্রমাণিত হয় তবে আমাদের অস্তিত্বের মানে বদলে যাবে। সময় তখন আর কোনো ঘাতক থাকবে না যা সবকিছু কেড়ে নেয় বরং এটি হবে একটি বিশাল মানচিত্রের মতো যেখানে আপনি সবসময়ই কোথাও না কোথাও সশরীরে উপস্থিত আছেন। সময়ের কোনো নিজস্ব সত্তা নেই বরং এটি কেবল আমাদের বোঝার সুবিধার জন্য তৈরি করা একটি পরিমাপ। তাই মহাবিশ্বের সেই বিশাল ডায়েরিতে আসলে কোনো সময় নেই আছে কেবল অগণিত মুহূর্তের একটি স্থির এবং মহিমান্বিত সমাহার।
১৫
২৫ মন্তব্য