সহকারী শিক্ষক
০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ
পারমাণবিক ফিউশন: হাতের মুঠোয় নক্ষত্র
সূর্য প্রতিদিন সকালে আমাদের জানালায় যে আলোর পরশ বুলিয়ে দেয়, তা কোনো সাধারণ আলো নয়। তা হলো মহাজাগতিক এক চুল্লির অবিনশ্বর তেজ। কোটি কোটি বছর ধরে সূর্য যে অফুরন্ত শক্তি বিলিয়ে দিচ্ছে, তার মূলে রয়েছে একটি জাদুকরী প্রক্রিয়া—পারমাণবিক ফিউশন বা নিউক্লীয় সংযোজন। মানুষ যুগ যুগ ধরে এই নক্ষত্রের শক্তিকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেছে। আজ সেই স্বপ্ন আর কেবল সায়েন্স ফিকশনের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তা এখন বাস্তবতার দ্বারপ্রান্তে।
বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলেছিলেন:
"আমরা সবাই নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি (We are made of star-stuff)." যদি আমরা নক্ষত্রের উপাদান দিয়েই তৈরি হই, তবে নক্ষত্রের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও কি আমাদের নেই? এই প্রশ্নই আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
🌞 ফিউশন: সহজ পাঠে নক্ষত্রের রসায়ন
বিজ্ঞানের পরিভাষায় 'ফিউশন' মানে হলো জুড়ে যাওয়া। যখন দুটি হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস (সাধারণত হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম) প্রচণ্ড তাপ ও চাপে একে অপরের সাথে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় একটি ভারী নিউক্লিয়াস (হিলিয়াম) এবং নির্গত হয় অবিশ্বাস্য পরিমাণ শক্তি।
সহজভাবে বলতে গেলে, মনে করুন দুটি ছোট মাটির দলা আপনি প্রচণ্ড জোরে একে অপরের দিকে ছুড়ে মারলেন। তারা মিলে গিয়ে বড় একটি দলা তৈরি করল এবং সেই সংঘর্ষের ফলে চারদিকে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ল। এই 'ফুলকি'ই হলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত শক্তি।
বিপরীতে, বর্তমানে আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে চলে ফিশন (Fission) প্রক্রিয়া, যেখানে বড় পরমাণুকে ভেঙে শক্তি বের করা হয়। ফিশনে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ভয় থাকে, কিন্তু ফিউশন হলো একদম 'ক্লিন এনার্জি' বা পরিচ্ছন্ন শক্তি।
🌞 কেন ফিউশনই আমাদের শেষ গন্তব্য?
পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আমরা কয়লা, গ্যাস বা তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এগুলো পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে। অন্যদিকে সৌর বা বায়ু শক্তি ভালো হলেও তা প্রকৃতির মর্জির ওপর নির্ভরশীল। এখানেই ফিউশন হয়ে ওঠে এক 'মিরাকল'।
১. কার্বন-মুক্ত সমাধান: ফিউশন প্রক্রিয়ায় কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয় না। এর প্রধান উপজাত হলো হিলিয়াম, যা সম্পূর্ণ ক্ষতিকরহীন।
২. অফুরন্ত জ্বালানি: ফিউশনের জন্য দরকার হাইড্রোজেন, যা সমুদ্রের পানিতে প্রচুর পরিমাণে আছে। বলা হয়, এক গ্লাস সমুদ্রের পানি থেকে যে পরিমাণ ফিউশন জ্বালানি পাওয়া সম্ভব, তা দিয়ে একটি বড় শহরের কয়েক দিনের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব।
৩. নিরাপত্তা: ফিউশন প্রক্রিয়ায় চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ বিস্ফোরণের কোনো ঝুঁকি নেই। কোনো সমস্যা হলে রিঅ্যাক্টর নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়।
🌞 ইটার (ITER): পৃথিবীর বুকে কৃত্রিম সূর্য
বর্তমানে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চলছে, যার নাম ITER (International Thermonuclear Experimental Reactor)। ভারত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—এই সাতটি পক্ষ মিলে তৈরি করছে এক দানবীয় যন্ত্র।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো একটি 'টোকামাক' (Tokamak) রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা তৈরি করা। ভাবুন তো একবার, যেখানে সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেখানে মানুষ পৃথিবীতে তৈরি করতে চাইছে তার চেয়ে দশ গুণ বেশি উত্তাপ! এই প্রচণ্ড তাপে গ্যাস তখন 'প্লাজমা' অবস্থায় চলে যায়, আর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে সেই প্লাজমাকে ধরে রাখা হয়।
🌞 বিজ্ঞানের পথে কাঁটা: কেন এতো দেরি?
আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2 দিয়ে শক্তির উৎস বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই শক্তিকে বশে আনা চাট্টিখানি কথা নয়।
বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন:
"পারমাণবিক ফিউশন হবে মানবজাতির জন্য এক পরম প্রাপ্তি। এটি আমাদের পরিবেশ দূষণ ছাড়াই অনন্ত শক্তির যোগান দেবে।"
কিন্তু সমস্যা হলো, ফিউশন ঘটাতে যে পরিমাণ শক্তি খরচ করতে হয়, বর্তমানে তার চেয়ে কম শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। একে বলা হয় 'এনার্জি গেইন' সমস্যা। তবে ২০২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার ন্যাশনাল ইগনিশন ফ্যাসিলিটি (NIF) প্রথমবারের মতো 'নেট এনার্জি গেইন' অর্জন করে ইতিহাস গড়েছে। অর্থাৎ, তারা যতটুকু শক্তি দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পেরেছে।
🌞 ফিউশন ও মানব ভবিষ্যৎ:
যদি ফিউশন সফল হয়, তবে পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি পুরোপুরি বদলে যাবে। জ্বালানি নিয়ে যুদ্ধ থাকবে না, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং হিমালয় থেকে আন্টার্কটিকা পর্যন্ত পরিবেশ আবার সজীব হয়ে উঠবে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিজয় হবে না, বরং এটি হবে মানুষের মেধার এক কাব্যিক সার্থকতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় —
"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।" মানুষ সত্যিই আজ মহাজাগতিক সেই আগুনের পরশমণি ছুঁতে চাইছে। ফিউশন সফল হওয়া মানে হলো আগুনের ওপর মানুষের দ্বিতীয়বার বিজয় লাভ করা। প্রথমবার আদিম মানুষ পাথর ঘষে আগুন জ্বালিয়েছিল, আর এবার মানুষ নক্ষত্রের আগুনকে বোতলবন্দি করতে শিখছে।
☀️শেষ কথা: পারমাণবিক ফিউশন হয়তো আজকেও আমাদের বাড়ির লাইট জ্বালাচ্ছে না, কিন্তু ২০৪০ বা ২০৫০ সাল নাগাদ এটিই হবে পৃথিবীর প্রধান চালিকাশক্তি। এটি ব্যয়বহুল, জটিল এবং সময়সাপেক্ষ; কিন্তু এর পুরস্কার হলো একটি সুন্দর, সবুজ এবং শক্তিতে সমৃদ্ধ পৃথিবী।
আমরা এমন এক ভোরের অপেক্ষায় আছি, যেখানে বিদ্যুতের বিল নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা থাকবে না এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের চাদরে পৃথিবী আর দমবন্ধ হয়ে পড়বে না। নক্ষত্রের শক্তি যখন আমাদের হাতের মুঠোয় আসবে, তখন হয়তো মহাকাশ জয়ের স্বপ্নটাও আরও সহজ হয়ে উঠবে।
৪
৬ মন্তব্য