সহকারী শিক্ষক
১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:০৭ অপরাহ্ণ
The world is an illusion: কোয়ান্টাম ফিজিক্সের চোখে আমাদের অস্তিত্ব কেবলই 'মহাজাগতিক বিভ্রম' !
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এই দাবিটি কেবল বিজ্ঞানের কোনো তাত্ত্বিক বিস্ময় নয় বরং এটি আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মূলে আক্রমনাত্মক এক চরম সত্য। জন্মগতভাবে আমাদের অস্তিত্বের জগতটি নিরেট এবং বাস্তব বলে প্রতিয়মান হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আমরা যা অনুভব করি তা মূলত এক বিশাল রহস্যময় জগতের উপরিভাগ মাত্র। এই ধারণাটি আপাতদৃষ্টিতে বিচলিত করার মতো হলেও এর পেছনে রয়েছে গণিত এবং পরীক্ষিত সত্যের এক সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
আমাদের পরিচিত চিরায়ত ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান ভুল নয় তবে এটি অসম্পূর্ণ। এটি কেবল সেই জগতকে ব্যাখ্যা করতে পারে যা মানুষের ইন্দ্রিয় দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব। এই স্তরে সবকিছুই স্থিতিশীল এবং নিশ্চিত মনে হয়, যা আমাদের মস্তিষ্ক অনুভব করতে স্বস্তিবোধ করে। কিন্তু মৌলিক কনা তথা পারমাণবিক স্তরে পৌঁছালে আমাদের পরিচিত নিশ্চয়তা কর্পূরের মতো উবে যায় এবং সেখানে রাজত্ব করে অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনা। চেয়ার বা টেবিলের মতো বস্তুগুলো আমাদের কাছে কঠিন মনে হয় কারণ পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রনগুলোর পারস্পরিক বিকর্ষণ বল কঠিন আকার তৈরিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। মূলত একটি পরমাণুর নিরানব্বই শতাংশের বেশি স্থানই ফাঁপা। অর্থাৎ আপনি যখন কোনো কিছু স্পর্শ করছেন তখন আপনি আসলে তার শূন্যতাকে শুধু স্পর্শ করছেন না বরং তার শক্তির ক্ষেত্রকে অনুভব করছেন। আমাদের মস্তিষ্ক এই বিচ্ছুরিত সংকেতগুলোকে সাজিয়ে একটি স্থিতিশীল এবং কঠিন বস্তুর অনুভূতি তৈরি করে।
এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখার একজন অন্যতম গবেষক হলেন নীলস বোর। তিনি ছিলেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম পথিকৃৎ এবং নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। নীলস বোর এবং তার সমসাময়িক বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, কোয়ান্টাম স্তরে একটি কণা একই সাথে একাধিক জায়গায় থাকতে পারে যতক্ষণ না কেউ তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। অর্থাৎ আমাদের পর্যবেক্ষণ বা মিথস্ক্রিয়া ছাড়া কোনো বস্তুর নির্দিষ্ট আকার বা অবস্থান তথা তার অস্তিত্ব নেই । জগতটি আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে নেই বরং আমাদের পর্যবেক্ষণ এবং মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই এর অস্তিত্ব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এই তত্ত্বটি অস্তিত্বের সংজ্ঞাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয় যেখানে স্থিতিশীলতা কোনো জন্মগত গুণ নয় বরং এটি মিথস্ক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া একটি কাঠামো।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করে না বরং তাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। আপনার ব্যবহৃত আসবাবপত্র বা চারপাশের জগতটি এখনো কার্যকর। তারা ঠিক সেভাবেই কাজ করে যেভাবে একটি প্রতিচ্ছবি বা ছায়া কাজ করে। ছায়া যেমন অন্ধকার এবং নির্দিষ্ট আকৃতির হয়ে আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয় কিন্তু তা আসল বস্তুর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় বহন করে না ঠিক তেমনি আমাদের এই কঠিন জগতটিও কোয়ান্টাম স্তরের এক ছায়া মাত্র। এই সত্যটি অনুধাবন করা আমাদের জন্য কিছুটা কঠিন কারণ এটি আমাদের বিবর্তনীয় অভিজ্ঞতার বিপরীত। কিন্তু এটি আমাদের শেখায় যে, জগতটি যতটা না অনমনীয় তার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় এবং প্রতিক্রিয়াশীল।
বাস্তবতার এই স্তরবিন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অস্তিত্বের গভীরে মহাবিশ্ব অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং আন্তঃসংযুক্ত। এটি কোনো বিশৃঙ্খলা নয় বরং এক কঠোর শৃঙ্খলার অংশ যেখানে অনিশ্চয়তাই একমাত্র ধ্রুবক। এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্য আমাদের মধ্যে যেমন বিনয় তৈরি করে তেমনি অজানাকে জানার জন্য সীমাহীন কৌতুহল সৃষ্টি করে। জগতটি মায়ার বিভ্রম হতে পারে কিন্তু সেই বিভ্রমের প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রহস্য।
১
১ মন্তব্য