Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:২৭ অপরাহ্ণ

কবি মাজেদুল হকের লেখার পাঠ প্রতিক্রিয়া। ব্যক্ত করেছেন তিতাস আহমেদ





বিরহী কবি মাজেদুল হকের কব্যগ্রন্থ
..............চোখের জলে নদী...............
                       -তিতাস আহমেদ
        ========================
কবি মাজেদুল হকের কথা বলার আগে জীবনানন্দ দাশের কথা বলি। কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করে জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার কবি থেকে প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ হয়েছিলেন। প্রাবন্ধিক জীবনানন্দ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন- 
'সমস্ত অসঙ্গতির জট খসিয়ে নতুন একটি আনন্দের দিকে শোভাযাত্রার নাম কবিতা'(কবিতার কথা, পৃ. ১৫)।'

কিন্তু কবি মাজেদুল হকের কবিতার ব্যাখ্যাও সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণাত্মক। তিনি বলেছেন-
 
"কবিতা,
ক--বি--তা--;
কবি বিবেক তাপস,
জীবন প্রেম যশ।" 

উপরিউক্ত চরণগুলোর আলোকে কবি বুঝাতে চেয়েছেন- একজন কবি ,কবির চিন্তাশীল বিবেক এবং কবির সাধনাসুলভ তাপস বা তপসা যার সাথে যুক্ত হয়েছে একটি জীবন। তার মানে কবিতায় থাকে একটি জীবনের কথা, থাকে মানবপ্রীতি কিংবা প্রকৃতি, বস্তু ইত্যাদির প্রতি প্রেম। আরও আছে যশ অর্থাৎ কবির কবিতা লেখার পারদর্শীতা বা খ্যাতি (সূত্রঃ মাজেদুল হকের সাথে ব্যাক্তিগত সাক্ষাতকার)।

একটি দেশের সংবিধানে যেমন নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত, কবিতার ব্যাকরণেও কবি ও কবিতাকে সংজ্ঞায়িতকরণে কবির নিজস্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের অধিকার স্বীকার্য। কবি মাজেদুল হক সেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চাটিই উপরিউক্ত চরণগুলোয় হয়তো করেছেন। তাই বলে কবিতার সুন্দর বিশ্লেষণ করলেই কেউ কবি নয়, বরং তার জন্য তিনি হবেন কবিতার শুধুই একজন বিশ্লেষক কিংবা সমালোচক। উপরন্তু, জীবনানন্দ দাশ বলেছেন-

"সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি"(দাশ, জীবনানন্দ, পৃ.৭) ।" 

কবির কাছে কবিতা শুধু এক লোকশিল্প নয়। কিংবা লোকশিল্পকে রসমণ্ডিত করে পরিবেশনও কবিতা নয়। কবিতা মানেই শুধু সমাজকে, সভ্যতাকে ভেঙে সাজাবার কোনো ছান্দসিক বিদ্রোহও নয়। সাহিত্যে সত্যানুসন্ধ্যানও যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ "সত্য কাব্যের লক্ষ্য নয়, কাব্যের উপাদান মাত্র"(দাশ, শ্রীশচন্দ্র, ২০১৩. পৃ. ১৩৯ তে উল্লিখিত)। কবির সাধক মননে জমে থাকা ও সেখানে নিরবে সযতনে বাস করা কষ্টের কথা ছন্দে ছন্দে প্রকাশের নামও কবিতা। এবং কবি সেই, যার "হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা রয়েছে..."(দাশ, জীবনানন্দ, পৃ. ৭) ।

মাজেদুল হক তেমনই একজন লেখক যার ভেতরে কল্পনা বিরাজ করে এবং তাঁর কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তাও রয়েছে বলেই জীবনের অতীত ও বর্তমানের অভিজ্ঞতালব্দ নব নব কাব্য বিকিরণ তাকে কবিতা লিখতে সাহায্য করেছে। সুতরাং শেষোক্ত সংজ্ঞাগুলোর বিচারে মাজেদুল হক একজন কবি তাতে সন্দেহ নেই। কেননা জীবনের অভিজ্ঞতালব্দ কষ্টের কথা ছন্দে ছন্দে বলতে গিয়ে মাজেদুল হকের বিরহী আত্মার আর্তনাদ থেকে সৃষ্ট চোখের জল যেন নদীর জলের মতই বহমান হয়েছে। সেজন্যই কবি মাজেদুল হককে 'বিরহী কবি' বলে(উপাধিতে) বিশেষায়িত করে আমি আত্মতৃপ্ত হতে চাই। 

বিরহী কবির হৃদয়ে ভালোবাসা আছে বলেই কবির নদী, প্রকৃতি, বর্গাচাষী কিংবা প্রতিবন্ধীদের প্রতি অসীম সহানুভূতি। তিনি তার 'সহানুভূতি' নামক কবিতায় সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের অবহেলাকে দূরে ঠেলে সাম্য ও ভালোবাসা জানিয়ে লিখেছেন- 

"স্রষ্টার কাছে মানুষ সবাই সমান,
রক্তে মাংসে গড়া দেহ নাহি ব্যবধান।
অন্ধ ল্যাংড়া হাবা বোবা যত সৃষ্টি ভবে, 
স্রষ্টা করেছেন সৃষ্টি বিভেদ কি তবে? 
...যত প্রতিবন্ধী আছে মানুষ ওরাও
অবহেলা কর না তুমি পাশে দাঁড়াও।"

কংশ নদীর টলোমলো জলকে যারা ভালোবেসেছেন, তাঁদেরই একজন কবি মাজেদুল হক। পাড়ে বসে শান্ত নদীটির স্নিগ্ধ জলে প্রিয়ার আনত মুখ তার কাছে কতইনা মায়াময়ী! তিনি লিখেছেন-

"শুধু মনে লয় যতটা সময় 
চুপচাপ বসে থাকি
শ্যামল চিত্তে নব সাহিত্যে 
প্রিয়ার ছবিটা আঁকি।" ('কংশনীড়' কবিতা)

সময় পেড়িয়ে একদিন কংশের পাড়ে ঝড় আসে। শান্ত-স্নিগ্ধ জলের উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটা একদিন কবির বুকের ঝড়ের প্রতিরূপ হয়ে আবির্ভূত হয়। কংশ তীরের কবির কষ্টজাত চোখের জল যেন কংশের শান্ত নদীকে স্রোতস্বীনি করেছে। বুকের জমে থাকা কষ্টে কবির চোখ ফেটে যে জলধারা বয় তাই এখন কংশের বান হয়ে বইছে। কিন্তু চোখের জলে কী আর জীবনের সব দায় সুদ করা যায়? কারণ কবিকে নিকট অতীতের এক প্রিয়জন দীর্ঘশ্বাসে বলেছিল (কবির ভাষায়)-

"তাহার মাথায় রেখে আমার দু'হাত,
কসম দিয়াছে মোরে থাকিতে হায়াত;
হয়তো ঝড় উঠিবে
কত কি বলিবে-
ছাড়িয়া যাবে না মোরে দু'টি পায়ে ধরি,
তোমার জীবন সাথী হয়ে যেন মরি।
('অপহরণ' কবিতা)

কবি হয়তো সেদিন তাঁর হারানোর ভয়কে মিলনের আশা দিয়ে জয় করতে পারেননি। সেজন্য নিজের ব্যর্থতার কারণটির পেছনে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তাঁর 'ব্যর্থতা' নামক কবিতার একটি স্তবকে-

"নিরুপায় আমি উত্তর দিতে,
আশায় ছিলাম সাথী করে নিতে;
ভয় ছিল তবু,
শপথ রাখিতে না পারিলে কভু।"

সত্যি, উপনদীর মত দুটি মন পাশাপাশি পথ চলতে চলতে একদিন তারা এক মোহনায় মিলিত হয়ে আজ হঠাৎ শাখানদী হয়ে দু'জনের বিপরীত দিকে চলে যাওয়া কবির মনকে বেদনায় ছিন্নভিন্ন করেছে। 
কবি দীর্ঘশ্বাসে বলেছেন-

"বিধির কি যে বিধান পারিনা বুঝিতে, 
প্রিয়জন কেড়ে নিল কঠোর নীতিতে;"

তবে কবির চোখের জল শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর উৎসজাত জল নয়। এই বেদনা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান কঠিন কঠোর সমাজ বাস্তবতা থেকেও সৃষ্ট হয়েছে। কবি মন সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী। পাশাপাশি তথাকথিত আধুনিকতা আর যুক্তিবর্জিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ কবিমনে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যখন কবি দেখেন সন্তান মতিভ্রমে পড়ে সে তার বয়োঃবৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসে('বৃদ্ধাশ্রম' কবিতা), যখন গরিবের প্রতি সমাজের অবিচার নেমে আসে, নিয়ম-নীতি উলটে গিয়ে স্বার্থের বেড়াজালে আটকে সত্য যখন নির্বাসিত থাকে ('সত্য কলংকিত' কবিতা), তখন এসব কবির বেদনা-বিরহকে আরো তীব্রতায় পর্যবসিত করে। তাই কবি মাজেদুল হকের বিরহ শুধু প্রিয়া হারানোর ব্যথা-বিরহ নয়। সমাজের অসংগতি, দুর্নীতি, অবিচার ও মিথ্যারাও কবিমনের এই ব্যথা-বিরহের জন্য দায়ী। তবে ব্যথাতুর কবির মাঝে মাঝে ভাবনায় আসে-

"থাকিতে হায়াৎ
কভু দু'জনে কি হবে সাক্ষাৎ? 
নিয়ে গেল তাকে নিদয়ার মত,
সে তাকায় ফিরে তাই চেয়ে থাকি হৃদয়ে রয়েছে ক্ষত।" 
('সাক্ষাত' কবিতা)

আর সে ক্ষত থেকে অনুভূত ব্যথায় কাতর হয়ে কবির চোখের লবণাক্ত অশ্রু প্রবাহিত হয়েই "চোখের জলে নদী" কাব্যগ্রন্থটির সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।

জীবনানন্দ দাশ বলেছেন-
 "কবিতা জীবনের নানা রকম সমস্যার উদঘাটন; কিন্তু উদঘাটন দার্শনিকের মত নয়; যা উদঘাটিত হলো তা যে কোনো জটরের থেকেই হোক আসবে সৌন্দর্যের রুপে," 'যা আমার কল্পনাকে তৃপ্তি দেবে; যদি তা না দেয় তাহলে তা কবিতা নয়, উদঘাটিত এই সিদ্ধান্ত হয়তো পুরনো চিন্তার শুধুই এক নতুন আবৃত্তি মাত্র' (কবিতার কথা, পৃ. ১০)  
সুতরাং বাহিরের জগতের রুপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ বা আপন মনের ভাবনা, বেদনা ও কল্পনাকে অনুভূতিস্নিগ্ধ ছন্দবদ্ধ তনুশ্রী দান করতে গিয়ে মাজেদুল হকের কবিতা দার্শনিক সুলভ না হলেও তার কবিতা পাঠকের আপন বিরহ-ব্যাথা, হাসি-কান্না ও সৌন্দর্য রুপেই কল্পনায় ধরা দেয়। সেই দিকটি তাঁর কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলেই মাজেদুল হক বাংলা সাহিত্যের একজন স্বার্থক কবি। তাই, নেত্রকোণার সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরা আজ কে-কোথায়? চলুন ব্যথাকাতর এই বিরহী কবির প্রতি আমরা ভালোবাসা ও প্রিয়া হারানোর সমবেদনা জানাই।
   
. *****

গ্রন্থপঞ্জিঃ
=======
দাশ, জীবনানন্দ(২০০০). কবিতার কথা. সিগনেট প্রেস, কলকাতা.
দাশ, শ্রীশচন্দ্র(২০১৩). সাহিত্য সন্দর্শন. বুকস ফেয়ার. ঢাকা.
হক, মাজেদুল(২০২১). চোখের জলে নদী. বিভাস. ঢাকা.

পাঠপ্রতিক্রিয়ায়ঃ-
-তিতাস আহমেদ(তিতাস মিয়া)২১-০৯-২০২১খ্রীস্টাব্দ
প্রভাষক, নেত্রকোণা সরকারী কলেজ,নেত্রকোণা
তথ্য সূত্রঃ-
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, নেত্রকোণা(,অনলাইন গ্রুপ) 
মন্তব্য করুন

ব্লগ