প্রভাষক
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে কৃষিখাতে পরিবর্তনের ধারা
বাংলাদেশে কৃষিখাতে পরিবর্তনের ধারা বর্তমানে এক বৈপ্লবিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে সরে এসে প্রযুক্তি-নির্ভর, লাভজনক এবং জলবায়ু-সহিষ্ণু এক "স্মার্ট কৃষি" কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
কৃষিখাতে পরিবর্তনের প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Agriculture 4.0)
এআই (AI) ও রোবোটিক্স: ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন কৃষি স্টার্টআপগুলোর ৬০ শতাংশেরও বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কৃষি রোবট ব্যবহার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয়, সার ও পানির পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে ।
স্মার্ট কার্ড ও ডাটাবেস: ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সকল কৃষকের তথ্য নিয়ে একটি জাতীয় ডাটাবেস তৈরির লক্ষ্য নিয়ে "ফার্মার স্মার্ট কার্ড নীতিমালা ২০২৫" প্রণয়ন করা হচ্ছে।
যান্ত্রিকীকরণ: শ্রম সংকট কাটাতে এবং উৎপাদন খরচ কমাতে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলারের পাশাপাশি এখন ধান কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্টর এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
২. জলবায়ু-সহিষ্ণু ও টেকসই কৃষি
অভিযোজন: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ধান (যেমন- BRRI dhan67) এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলে খরা-সহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিকল্প চাষাবাদ: বন্যার পানি থেকে ফসল রক্ষায় ভাসমান বেডে সবজি চাষ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ধান-মাছ বা ধান-হাঁস চাষের সমন্বিত পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
সৌর সেচ: পরিবেশবান্ধব কৃষির অংশ হিসেবে ডিজেল চালিত পাম্পের বদলে সৌরশক্তি চালিত সেচ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
৩. বাণিজ্যিকীকরণ ও শস্য বহুমুখীকরণ
পুষ্টি নিরাপত্তা: শুধু ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে ডাল, তেলবীজ, ফল এবং সবজি চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে রবি মৌসুমে সরিষার আবাদ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (যেমন- এগ্রোশিফট, ফশল) সরাসরি কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করছে।
রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ: ফল ও সবজি নষ্ট হওয়া কমাতে আধুনিক হিমাগার (Cold Storage) এবং ভ্যালু-অ্যাডেড খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
৪. নীতিগত ও আর্থিক পরিবর্তন
বাজেট বরাদ্দ: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৯,৬২০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
ঋণ সুবিধা: প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার্থে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৯,০০০ কোটি টাকার কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি ব্যাংক জামানত ছাড়াই ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ প্রদান করছে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: আগামী ২৫ বছরের কৃষি রূপান্তরের পথনকশা হিসেবে সরকার "এগ্রিকালচার আউটলুক ২০৫০" প্রণয়ন করছে।
সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশের কৃষি এখন আর কেবল জীবনধারণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি আধুনিক, লাভজনক এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যবসায়িক খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
১
১ মন্তব্য