প্রধান শিক্ষক
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:০৬ অপরাহ্ণ
তারাবীহ নামাজের গুরুত্ব ও ফযীলত
তারাবীহ নামাজ: রমজানের বিশেষ ইবাদত ও এর অসামান্য ফজিলত
পবিত্র মাহে রমজান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক অনন্য উপহার। এ মাসের দিনের বেলায় সিয়াম (রোজা) পালন যেমন ফরজ, তেমনি রাতের বেলায় তারাবীহ নামাজ পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতে মুআক্কাদাহ (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত) । রমজানের এই রাতের ইবাদতকে হাদিসের পরিভাষায় 'কিয়ামু রমজান' বা 'রমজানের রাত্রি জাগরণ' বলা হয়েছে ।
তারাবীহ নামাজের পরিচিতি
'তারাবীহ' শব্দটি আরবি 'তারভিহাতুন' শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বিশ্রাম করা, আরাম করা বা প্রশান্তি লাভ করা । এই নামাজে প্রতি চার রাকাত পর পর একটু বিশ্রাম নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এ সময় মুসল্লিরা তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া বা কোরআন তেলাওয়াত করে থাকেন। এ কারণেই এই নামাজের নাম 'সালাতুত তারাবীহ' বা তারাবীহ নামাজ রাখা হয়েছে ।
তারাবীহ নামাজের সময় হলো এশার ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর থেকে ফজরের নামাজের আগ পর্যন্ত। সাধারণত এশার পরই তারাবীহ আদায় করা হয় এবং শেষে বিতর নামাজ পড়া হয় ।
তারাবীহ নামাজের ফজিলত
তারাবীহ নামাজের ফজিলত সম্পর্কে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও নির্ভরযোগ্য হাদিসটি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"যে ব্যক্তি রমজান মাসে ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় তারাবীহর নামাজ আদায় করে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।" (সহিহ বুখারি: ১৮৮২, সহিহ মুসলিম)
এই একটি হাদিসেই তারাবীহর গুরুত্ব ও ফজিলত অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়। এখানে "ঈমানের সঙ্গে" অর্থ হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে এবং "সওয়াবের আশায়" অর্থ হলো কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রতিদান লাভের উদ্দেশ্যে এই নামাজ আদায় করা ।
নবীজির (সা.) তারাবীহ পড়ার পদ্ধতি
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার রমজানের রাতে মসজিদে তারাবীহ নামাজ আদায় করলেন। তাঁর সঙ্গে আরও অনেক লোক নামাজে যোগ দিলেন। পরের দিন লোকসংখ্যা আরও বেড়ে গেল। তৃতীয় বা চতুর্থ দিনে লোকজন আরও বেশি সমবেত হলো, কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের কাছে এলেন না। সকালে তিনি বললেন:
"তোমাদের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমি লক্ষ্য করেছি। কিন্তু শুধু এ ভয়ে আমি তোমাদের কাছে আসা থেকে বিরত থেকেছি যে, আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, না জানি তোমাদের ওপর তা (তারাবীহ) ফরজ করে দেওয়া হয়।" (সহিহ বুখারি)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, তারাবীহ নামাজ এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, যদি নবীজি (সা.) নিয়মিত জামাতে পড়তেন, তাহলে তা উম্মতের ওপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফরজ হয়ে গেলে তা আদায় করা উম্মতের জন্য কষ্টকর হয়ে যেত। তাই তিনি উম্মতের প্রতি সদয়তা ও দয়ার খাতিরে জামাতে নিয়মিত না পড়লেও ঘরে একা একা পড়তেন ।
জামাতে তারাবীহ পড়ার ফজিলত
হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি দেখলেন, লোকেরা মসজিদে নববীতে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারাবীহ পড়ছে। তখন তিনি তাদের সবাইকে একজন ইমামের পিছনে একত্রিত করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করলেন। এভাবে সর্বপ্রথম তারাবীহর জামাতের প্রচলন শুরু হয়। তখন হজরত উমর (রা.) বলেছিলেন, "কতই না সুন্দর এই বিদআত (নতুন ব্যবস্থা)!"
তারাবীহ জামাতে পড়ার আরেকটি বড় ফজিলত হলো, ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত নামাজ আদায় করলে পূর্ণ রাত ইবাদত করার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে (তারাবীহ) শেষ পর্যন্ত আদায় করবে, তার জন্য পূর্ণ রাত জেগে ইবাদত করার সওয়াব লেখা হবে।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
তারাবীহ ও কোরআনের সম্পর্ক
তারাবীহ নামাজের সঙ্গে কোরআনের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। রমজান মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। এই মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) কোরআন মাজিদ খতম করতেন এবং নবীজি (সা.) শুনাতেন ।
তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম করা একটি সুন্নত। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত মক্কা ও মদিনার মসজিদসহ সারা বিশ্বের মসজিদগুলোতে তারাবীহতে কোরআন খতমের প্রচলন রয়েছে । শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন:
"মক্কা ও মদিনা শরীফে সাহাবায়ে কেরামের যুগ হতে আজ পর্যন্ত সব সময় ২০ রাকাত তারাবীহ খতমে কোরআনসহ জামাতের সঙ্গে পড়া হয়।" (মাজমুউল ফাতাওয়া)
তারাবীহ নামাজে কোরআন তেলাওয়াত যেমন সওয়াবের, তা মনোযোগ দিয়ে শোনাও সমান সওয়াবের। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন:
"যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নিশ্চুপ থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়।" (সূরা আল-আরাফ: ২০৪)
তারাবীহর রাকাত সংখ্যা
তারাবীহ নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও অধিকাংশ সাহাবি, তাবেঈন ও ইমামগণের মতে তারাবীহ ২০ রাকাত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে ২০ রাকাত তারাবীহ এবং বিতর পড়তেন । হজরত উমর (রা.), উসমান (রা.) ও আলী (রা.)-এর খিলাফতকালেও ২০ রাকাত তারাবীহ পড়ার প্রচলন ছিল এবং সাহাবায়ে কেরাম এর ওপর ঐকমত্য ছিলেন ।
করণীয় ও বর্জনীয়
তারাবীহ নামাজের কয়েকটি আদব ও করণীয় বিষয় রয়েছে:
· মনোযোগ সহকারে কোরআন শোনা: তারাবীহতে ইমাম যখন কোরআন তেলাওয়াত করেন, তখন মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং কোরআনের অর্থ উপলব্ধির চেষ্টা করা।
· পূর্ণ তারাবীহ পড়া: ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত তারাবীহ পড়া এবং অলসতা বা অন্যান্য ব্যস্ততায় তারাবীহ অসম্পূর্ণ না রাখা ।
· মহিলাদের জন্য: মহিলারাও তারাবীহ নামাজ ঘরে অথবা পর্দার ব্যবস্থা থাকলে মসজিদে আদায় করতে পারেন।
উপসংহার
তারাবীহ নামাজ রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি যেমন গুনাহ মাফের মাধ্যম, তেমনি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করারও একটি সুযোগ। নবীজি (সা.) তার উম্মতের প্রতি দয়ার কারণে এটি ফরজ হওয়ার আশঙ্কায় নিয়মিত জামাতে না পড়লেও এর গুরুত্ব ও ফজিলত অটুট রেখেছেন।
আমাদের উচিত, তারাবীহ নামাজকে শুধু একটি রুটিন ইবাদত হিসেবে না দেখে এর প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করা। ঈমানের সঙ্গে, একনিষ্ঠভাবে এবং সওয়াবের আশায় তারাবীহ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং এর শিক্ষা জীবন工作中 প্রয়োগের চেষ্টা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তারাবীহ নামাজের পূর্ণ ফজিলত লাভের তাওফিক দান করুন এবং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন। আমিন।
১
১ মন্তব্য