সহকারী শিক্ষক
১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:০১ পূর্বাহ্ণ
RMS Titanic....... ….
কালের দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া এক কিংবদন্তি জলযান, যা প্রায় পৌনে এক শতাব্দীরও আগে তার প্রথম সমুদ্রযাত্রাতেই আকস্মিকভাবে আটলান্টিকের বুকে ডুবে যায়!
টাইটানিক এবং এর মর্মান্তিক পরিনতি সম্পর্কে কম-বেশি আমাদের সবারই জানা । তো চলুন জেনে আসা যাক এই ঐতিহাসিক জলযান সম্পর্কে না জানা ১৫ টি ফ্যাক্ট যা সত্যিই আপনাকে অবাক করে দিবে !⚓
✒️ টাইটানিক ছিল তখনকার সময়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরী ও সর্ববৃহৎ জাহাজ। এটি ব্যয়হুলতা ও চকাচিক্যের দিক দিয়ে তৎকালীন সব জাহাজকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বৃহাদাকার এই জলযানে চারটি লিফট, সুইমিং পুল, ক্যাফে, লাইব্রেরি, জিমনেসিয়াম, ৫০০ মানুষের খাবারের জন্য বিশাল ডাইনিং লাউঞ্জ,এমনকি নৃত্যশিল্পীদের জন্য বিলাসবহুল প্লাটফর্মও ছিল! টাইটানিকে ১ম শ্রেণির যাত্রীদের ভাড়া ছিল জনপ্রতি ৩১০০ ডলার মানে প্রায় তিন লাখ টাকা! এখনকার সময়ে মামুলি মনে হলেও এ সবই তখনকার যুগে ছিল কল্পনা করার মতো!
✒️ নির্মানের পর থেকেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য টাইটানিককে বলা হতো ' The Unsinkable Ship ' মানে যেই জাহাজ কখনো ডুবে যাবে না, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে তৎকালীন বড়ো বড়ো স্থপতিরা এ কথায় সম্মতি দিয়েছিল। তাদের এমন বড়াইয়ের অবশ্য কারন ছিল, টাইটানিককে এমনভাবে ইঞ্জিনিয়ার করা হয়েছিল যে এটির চারটি কামরা সম্পূর্ন পানিতে ভরে গেলেও ভেসে থাকতে পারতো। এতে ছিল লাইফবোটের ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক জলরোধী গেইট! কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এত সুরক্ষা ব্যবস্থার পরেও তাদের এরকম অহংকারই যেন কাল হয়ে দাড়াঁলো টাইটানিকের জন্য। প্রথম যাত্রাতেই আইসবার্গের সামান্য ধাক্কায় টাইটানিক উত্তর আটলান্টিকের অদূরে নিউফাউন্ডল্যান্ড নামক জায়গায় প্রায় ২২২৩ জন যাত্রীসহ আকস্মিকভাবে ডুবে যায়!
✒️ আইসবার্গ থেকে ধাক্কা খাওয়ার আগের দিন কয়েকটি জাহাজ ( RMS America, Mesaba,Californian) টাইটানিকে বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছিলো, যে তাদের যাত্রাপথে একটি বড়োসড়ো আইসবার্গ আছে। তারা যেন অবশ্যই জাহাজটিকে মোড় নেয়। কিন্তু টাইটানিকের বেতার অপারেটরেরা বার্তাটি পেলেও তাদের কাছ থেকে মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে খবরটি পৌছাতে ক্রু মেম্বারেরা অবহেলা করেছিল। জলযানটির অনেক অফিসারই এটিকে হালকাভাবে নিয়েছিল যে আইসবার্গ টাইটানিকের কিচ্ছু করতে পারবে না। বলা যায় পরিচালনা কমিটির এমন অবহেলার কারণেই টাইটানিক ডুবেছে! জাহাজটি দ্রুতগতি নিয়ে ক্রমেই আইসবার্গের কাছে অগ্রসর হতে থাকে।
✒️দূর্ঘটনার ৪০ মিনিট আগে টাইটানিকের রেডিও অপারেটর জ্যাক ফিলিপসকে 'Californian' জাহাজ থেকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য করেন নি এবং ঘুমোতে চলে যান। পরে আরেকজন অপারেটর হেরল্ড ব্রিড অপারেটিংয়ে আসার পর বিষয়টি লক্ষ্য করেন। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, তিনি যখন বার্তাটি শেষবারের মত পান তখন বেতার ট্রাফিকে প্রচুর জ্যাম ছিল এবং তিনি জাহাজের ফার্স্ট ও সেকোন্ড ক্লাস যাত্রীদের সাথে যোগাযোগে ব্যস্ত ছিলেন। তাই আইসবার্গের খবরটি ধামাচাপা পড়ে যায়,সেটি মূল নিয়ন্ত্রনকেন্দ্র পর্যন্ত আর যায়নি , ফলস্রুতিতে যা হবার তাই হলো। ক্যাপ্টেন বিষয়টি জানতে জানতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল এবং মোড় নেয়ার আগেই অপ্রত্যাশিতভাবে জাহাজটি আইসবার্গকে ধাক্কা দেয়। ফলে এর পাশ জুড়ে বিরাট ফাটল দেখা যায়। পরে এই ফাটল দিয়েই পানি প্রবেশ করে এবং জাহাজটি ধীরেধীরে তলিয়ে যেতে থাকে!
✒️টাইটানিকে যাত্রীসংখ্যার তুলনায় লাইফবোটের সরবরাহ ছিল কম! যদিও যাত্রার আগে নিশ্চিত করে বলা হয়েছিল তারা সব যাত্রীদের জন্যই প্রয়োজনীয় লাইফবোট নিবে !
✒️টাইটানিককে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে এটি সর্বোচ্চ জলভর্তি চারটি কমপার্টম্যান্ট নিয়েও ভেসে থাকতে পারতো। চারিদিক থেকে পানি আসার কারণে দূর্ভাগ্যবশত টাইটানিকের অধিকাংশ কমপার্টম্যান্টই তলিয়ে যায়। এতে করে জাহাজটি তার পানি ধারনক্ষমতা হারায়। আবার টাইটানিকে অত্যাধুনিক ১৫ টি জলরোধী গেট ছিলো, কোন একটি কম্পার্টমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা পানিতে তলিয়ে গেলে এগুলো ইমার্জেন্সি বন্ধ করে দিয়ে বাকি কম্পার্টম্যান্টগুলোতে পানির অনুপ্রবেশ বাধা দিতে পারত। কিন্তু ফাটল বড় হওয়ার কারণে চারিদিক থেকে এত দ্রুত পানি এসে পড়েছিল যে, সেগুলো বন্ধ করতে করতে বাকি কমপার্টম্যন্টগুলোও পানিতে তলিয়ে একাকার হয়ে যায়, ভাগ্য সেখানেও সাথে দেয় নি টাইটানিকের! 'The Unsinkable ' নামটিকে ভুল প্রমাণিত করে আটলান্টিকের গর্ভে চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যায় এই বিরাট জলযান!
✒️টাইটানিক বিপর্যয় হলো স্মরনকালের সবচেয়ে বড় নৌ-দূর্ঘটনা! এতে ২২২৪ জন মোট যাত্রীর মধ্যে প্রায় ১৫০০ (৬৭%) জনেরই সলিল সমাধি হয়েছিল! মাত্র ৭০০ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল।দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেকে লাইফজ্যাকেট পরা অবস্থাতেই হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুবরণ করে। টাইটানিকের একসাথে এত যাত্রী নিয়ে প্রথম যাত্রাতেই ডুবে যাওয়া মেরিটাইম ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা!
✒️প্রথম যাত্রার রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিতে তখনকার সময়ের অনেক জনপ্রিয় ও ধনী লোকেরা টাইটানিকে উচ্চমূল্য দিয়ে চড়েছিল। যেমন: তৎকালীন ধনী ব্যবসায়ী জন জ্যাকব এস্টর ঈভ , বেঞ্জামিন জাগেনহেম, টাইটানিকের ডিজাইনার থমাস আন্ড্রিউ প্রমুখ। তন্মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তিই বেঁচে ফিরতে পারে নি। তবে তাদের পরিবারের কিছু সদস্য survive করেছিল।
✒️টাইটানিক বিপর্যয় নিয়ে সবচেয়ে অবাক করার যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো ১৮৯৮ সালে Morgan Robertson এর লেখা 'The Wreck of The Titan or Futility ' বইটি। টাইটানিকের ধারনা ও বিপর্যয়েরও ১৪ বছর আগে নিখুঁতভাবে মরগান তার উপন্যাসে 'Titan' নামক একটি জাহাজের কল্পকাহিনী ও ভয়ানক পরিণতি তুলে ধরেছিলেন। 'Titan ' নামক ঐ জাহাজের আকার, আকৃতি, ডিজাইন সবই ছিল টাইটানিকের মতো! উভয় জাহাজকেই তৎকালীন সময়ে 'The Unsinkable ' উপাধি দেয়া হয়েছিল! এমনকি টাইটান যে জায়গায় ডুবেছিল ঠিক ১৯১২ সালে এসে টাইটানিকও ঐ জায়গায় নিমজ্জিত হয়, Titan এর আইসবার্গের সাথে সংঘর্ষ, লাইফবোট স্বল্পতা সবই রহস্যজনকভাবে টাইটানিকের সাথে হুবহু মিলে যায়!! মরগান কিভাবে এত নিখুঁতভাবে টাইটানিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিতে পারলেন? এটি কি তার কোনো ভবিষ্যতবানী নাকি নিছক কাকতালীয় কোনো কাল্পনিক কাহিনী ছিল তা আজ অবধি কেউ বলতে পারে নি।
✒️জাহাজের ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ড স্মিথ টাইটানিকের প্রথম সমুদ্রযাত্রা শেষ করেই অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি এ যাত্রায় আর বেঁচে ফিরতে পারেন নি। অনেকের মতে, ক্যাপ্টেনের শেষ বক্তব্য ছিল 'Be Brithish boys, be British', কিন্তু তিনি এ কথা কেন বলেছিলেন বা কি বোঝাতে চেয়েছিলেন তা আজ পর্যন্ত অমিমাংসিতই থেকে গিয়েছে!
✒️টাইটানিকে বাইনোকুলারগুলো একটি লকারে আটকা পড়েছিল। সেগুলোর চাবি ছিল ডেভিড ব্লেয়ার নামক এক ব্যক্তির কাছে যিনি টাইটানিক ছাড়ার কিছুক্ষন আগেই রিসাইন করেন। এতে করে অসময়ে বাইনোকুলারগুলো আর পাওয়া যায় নি এবং টাইটানিকের অফিসাররা আইসবার্গটি দেখতে পান নি।
✒️ এ ভয়ানক যাত্রায় বেঁচে ফিরে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন টাইটানিকেরই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'The White Star Line ' এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জে. ব্রুস ইসমে। তার অভাবনীয় survival নিয়ে পরবর্তী বিশ্বে অনেক সমালোচনা এবং conspiracy থিওরির জন্ম হয়েছে যে তিনি এই বিপর্যয়ের সাথে জড়িত থাকতে পারেন।
✒️আসল টাইটানিকের নির্মান ব্যয় ছিল ৭ মিলিয়ন ডলার, আর এর কাহিনী পুন:নির্মান করতে হলিউড সিনেমা 'Titanic (1993) ' পরিচালনায় ব্যয় হয়েছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার! এটি আয় করেছিল প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলার ! ভাবা যায়?
✒️দূর্ঘটনার দীর্ঘ ৭৩ বছর পর ১৯৮৫ সালে যন্ত্রচালিত অনুসন্ধানের মাধ্যমে টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুজে পান রবার্ট ব্যালার্ড। তিনি ছোটোবেলা থেকেই অনেক ইচ্ছুক ছিলেন একদিন টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করবেন। অবশেষে তিনি ও তার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেন দূর্ঘটনার ঐ স্পটে সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ৬০০ ফুট নিচে পাশাপাশি টাইটানিকের দুইটি অংশ স্থির হয়ে আছে। যদিও কিংবদন্তি এই জলযান আর আগের অবস্থায় নেই, কালের পরিক্রময় অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। সেখান থেকে তখনকার ব্যবহার্য অনেক জিনিসপত্র এবং মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে।
✒️অবাক হলেও সত্য যে শুধু টাইটানিকের নির্মাণকৌশল , স্থাপত্য, সমুদ্র যাত্রা, করুণ পরিণতি এবং এর রোমাঞ্চকর কাহিনী পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার জন্য একাধিক জাদুঘর, বই নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন নর্থ আয়ারল্যান্ডের মিউজিয়াম 'টাইটানিক বেলফার্স্ট' , যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ' দ্য টাইটানিক এক্সপেরিয়েন্স ' ইত্যাদি।
⚠️ভিত্তিহীন কথাবার্তা ও গুজব : পৃথিবীতে কোনো ঐতিহাসিক জাহাজ নিয়েই এতগুলো conspiracy theoryর জন্ম হয়নি টাইটানিককে নিয়ে যতগুলো জন্ম হয়েছে! অনেকে বলে থাকে টাইটানিক ছিল শয়তানের জাহাজ, জাহাজটিতে নাকি এক অভিশপ্ত মিশরীয় রাজকন্যার মমি ছিল যা তাদের যাত্রায় অশুভ পরিণতি বয়ে এনেছিল। কিন্তু টাইটানিকে সেরকম কিছু থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতিকালে একটি গুজব ছড়িয়েছে যে টাইটানিকের নাম্বার উল্টালে 'no pope' কথাটি পাওয়া যায়। যার অর্থ 'ঈশ্বর নয়'। আবার কিছু কিছু লোকেদের মতে ব্রেকফাস্টের কর্মচারীরা জাহাজটিতে অভিশাপ দিয়েছিল কারণ সেটি নাকি ক্যাথলিক বিরোধী ছিল! তবে বিশ্বাস করুন, এগুলো সবই ভিত্তিহীন কথা, টাইটানিকের ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত ও বিকৃত করার জন্য কিছু নির্বোধ জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে থাকে। এগুলোর কোন হিস্টরিক্যাল এভিডেন্স নেই। এখানে সব সত্য ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত তথ্যগুলোই তুলে ধরা হয়েছে। টাইটানিক বিপর্যয় একটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল মাত্র। মূলত পরিচালনায় অবহেলা, লোকেদের অহংকার, সুরক্ষা ব্যবস্থার যথাসময়ে কাজে না আসা, অপ্রত্যাশিত আইসবার্গের মুখোমুখি হওয়ার কারণেই টাইটানিক ডুবেছে বলা যায়। কিংবদন্তি Titanic এর কিছু coincidental যোগসূত্র মানুষকে আজও অভিভূত করছে , শত শত বছর পরও হয়ত করবে।
১৫
২৫ মন্তব্য