Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

“ভূমিকম্প: এক আতঙ্কিত নাম”

“ভূমিকম্প: এক আতঙ্কিত নাম”

মোহাম্মদ মনির হোসেন

প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, মেহের ডিগ্রি কলেজ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। +8801811656353, [email protected]

 


ভূমিকম্প (Earthquake) হলো ভূত্বকের একটি হঠাৎ সঞ্চালন (Sudden movement) বা কম্পন (Tremor)। এটি ঘটে যখন পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংযোগস্থল বা চ্যুতি রেখা (Fault Line) বরাবর ভূগর্ভে জমে থাকা স্থিতিশক্তি (Potential Energy) হঠাৎ করে ভূমিকম্প তরঙ্গ (Seismic Waves) আকারে মুক্ত হয়। পৃথিবীর ভূত্বক বা বাইরের স্তরটি একাধিক বিশাল আকারের খণ্ডে বিভক্ত, যাকে টেকটোনিক প্লেট বলা হয়। এই প্লেটগুলো সর্বদা একে অপরের তুলনায় খুব ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। ​বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের (ইন্ডিয়ান প্লেট, বার্মিজ প্লেট এবং ইউরেশীয় প্লেট) কাছাকাছি অবস্থিত, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম অস্থির ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে পরিণত করেছে। এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত নড়াচড়া এবং চাপের ফলেই ভূগর্ভস্থ ফাটল বা চ্যুতি (Faultlines) বরাবর শক্তি নির্গত হয়, যা ভূমিকম্প ঘটায়।

​টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ: দেশের পূর্বাঞ্চলে ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থল হলো শক্তিশালী ভূমিকম্পের প্রধান উৎস। এই প্লেটগুলোর পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে ফেলছে।

​ডাউকি ফল্ট: ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাউকি ফল্ট (যা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত) এবং টেকনাফ-পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের সাবডাকশন জোন বাংলাদেশে বিপজ্জনক ভূকম্পনের মূল উৎস।

​ভূঅভ্যন্তরীণ কাঠামো: বাংলাদেশের ভূমিরূপ ও ভূঅভ্যন্তরীণ কাঠামোগত কারণে ভূআলোড়নজনিত শক্তি সক্রিয় থাকে। এছাড়া মধুপুর ফল্টলাইনসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ছোট ফল্টলাইন রয়েছে, যা ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে।

​নরম ও দুর্বল মাটি: বিশেষ করে ঢাকা শহরের সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোর মাটি নরম ও দুর্বল, যা ভূমিকম্পের সময় ভবনধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ভূমিকম্পে মানুষের মৃত্যুর ৯০ শতাংশই হয় ভবনধসের কারণে।

​বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

​ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এবং ফল্টলাইনগুলোর নৈকট্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে মূলত তিনটি ভূমিকম্প জোনে ভাগ করা হয়েছে:

​অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (Zone-I): এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত, যা সরাসরি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্টলাইনের কাছাকাছি। এখানে সাত থেকে আট মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য এলাকা: সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, এবং সিলেটের জৈন্তাপুর।

​মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (Zone-II): এই অঞ্চলে উচ্চ ঝুঁকির এলাকার তুলনায় তীব্রতা কিছুটা কম হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে এখানকার ঝুঁকি বাড়ছে। উল্লেখযোগ্য এলাকা: রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁওয়ের মতো ঢাকার অনেক স্থাপনা।

​কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল (Zone-III): এই অঞ্চলটি দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত, যেখানে ভূমিকম্পের মাত্রা ও সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

​ভূমিকম্পের পূর্বে করণীয় (প্রস্তুতি)

​ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।

​অবকাঠামোগত প্রস্তুতি: নির্মাণ আইন মেনে চলা: বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা অবশ্যই সরকারি নির্মাণ আইন (Building Code) এবং তীব্রতা-সহনশীল (Intensity-Resistant) পদ্ধতি মেনে তৈরি করতে হবে। দুর্বল স্থাপনাগুলোর অবিলম্বে কাঠামোগত মূল্যায়ন ও রেট্রোফিটিং করা আবশ্যক।

​ঝুঁকিপ্রবণ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ: স্কুল, হাসপাতাল, দমকল কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপ-কেন্দ্রের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা।

​ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রস্তুতি:

​জরুরি সরঞ্জাম: একটি জরুরি কিট প্রস্তুত রাখুন। এতে শুকনা খাবার, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, টর্চলাইট, ব্যাটারি, রেডিও, কিছু টাকা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকতে হবে।

​নিরাপদ স্থান চিহ্নিতকরণ: বাড়িতে ও কর্মস্থলে নিরাপদ আশ্রয়স্থল (যেমন—শক্ত টেবিলের নিচে, ঘরের কোণে বা কলামের গোড়ায়) আগে থেকে চিহ্নিত করে রাখুন।

​মহড়া: পরিবার ও সহকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়ার আয়োজন করুন।

​গুরুত্বপূর্ণ সুইচ: বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রধান সুইচ কোথায় আছে এবং কীভাবে দ্রুত বন্ধ করতে হয়, তা জেনে রাখুন।

​ভূমিকম্পের সময় করণীয় (আত্মরক্ষা)

​ভূমিকম্পের প্রথম ঝাঁকুনির সময় শান্ত থাকা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

​বাড়ির ভেতরে থাকলে: ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন (Drop-Cover-Hold On): আতঙ্কিত না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে বসে পড়ুন (ড্রপ), কোনো শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে মাথা ও ঘাড় ঢেকে আশ্রয় নিন (কাভার), এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত শক্ত করে ধরে রাখুন (হোল্ড অন)।

​নিরাপদ আশ্রয়: যদি শক্ত আসবাব না থাকে, তবে ঘরের ভেতরের দিকের দেয়াল বা কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিন।

​বিপজ্জনক স্থান এড়িয়ে চলুন: জানালা, কাঁচের জিনিসপত্র, বইয়ের তাক, ভারী আসবাবপত্র এবং বাইরের দেয়াল থেকে দূরে থাকুন।

​লিফট নয়: কখনোই লিফট ব্যবহার করবেন না; সিঁড়ি ব্যবহার করুন।

​গ্যাস ও বিদ্যুৎ: সম্ভব হলে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করে দিন।

​বাড়ির বাইরে থাকলে:

খোলা জায়গা: দ্রুত খোলা জায়গায় (মাঠ) আশ্রয় নিন।

​বিপজ্জনক স্থান এড়িয়ে চলুন: বহুতল ভবন, লাইটপোস্ট, বৈদ্যুতিক তার, গাছ, ওভারব্রিজ বা পাহাড়ের প্রান্তভাগ থেকে দূরে থাকুন।

​গাড়িতে থাকলে: দ্রুত গাড়ি খোলা জায়গায় পার্ক করুন এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকুন। সেতু বা ফ্লাইওভারের ওপর গাড়ি থামাবেন না।

​ভূমিকম্পের পরে করণীয় (উদ্ধার ও পুনর্বাসন)

​ভূমিকম্প থেমে গেলেও ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় না, কারণ আফটারশক আসতে পারে।

​নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: ক্ষতি পরীক্ষা: নিজে আহত হয়েছেন কিনা পরীক্ষা করুন। গুরুতর আঘাত না থাকলে আশপাশের আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিন।

​আগুন ও গ্যাস: গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন পরীক্ষা করুন। যদি গ্যাসের গন্ধ পান, তবে দ্রুত দরজা-জানালা খুলে দিন, গ্যাসের মেইন সুইচ বন্ধ করুন এবং কোনো ধরনের আগুন (ম্যাচ, লাইটার) ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

​যোগাযোগ: জরুরি প্রয়োজনে ব্যতীত ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। মোবাইল নেটওয়ার্ক জরুরি সেবা কর্মীদের জন্য প্রয়োজন হতে পারে। রেডিওতে জরুরি নির্দেশনা শুনুন।

​ভবন ত্যাগ: যদি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সতর্কতার সাথে এটি ত্যাগ করুন এবং খোলা জায়গায় যান। আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকুন।

​উদ্ধার ও সহযোগিতা: উদ্ধার কাজে সহায়তা: নিজে নিরাপদ থাকলে উদ্ধারকারী দল আসার পর তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করুন। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকা পড়া কাউকে দেখলে শান্তভাবে আওয়াজ দিন, কিন্তু নিজের জীবন বিপন্ন করে ঝুঁকি নেবেন না।

​গুজবে কান নয়: গুজব ছড়ানো ও গুজবে কান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। সরকারি নির্দেশনা মেনে চলুন।

​স্বেচ্ছাসেবক দল: এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনে সহায়তা করুন।

​গতকালকের ভূমিকম্প কি বার্তা দিল?

রাজধানীসহ​ গতকাল (২১/১১/২০২৫) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের দিকে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি আকারের ৫.৫ মাত্রার যে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় তা বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা বহন করছে। বিশেষত যদি এর উৎপত্তিস্থল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি হয়ে থাকে। গত ৩০ বছরে এত ভয়াবহ ভূমিকম্প দেখেনি বাংলাদেশ।

​সক্রিয় চ্যুতি: উৎপত্তিস্থল ঢাকার কাছাকাছি হওয়া মানে ভূগর্ভস্থ ফল্টলাইনগুলো সক্রিয় রয়েছে এবং যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের শক্তি নির্গত হতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

​প্রস্তুতির অভাব: মৃদু কম্পন অনুভূত হতেই মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ হুড়োহুড়ি করে নিচে নামার চেষ্টা করে, তা আমাদের প্রস্তুতির অভাবের ইঙ্গিত দেয়।

​ভবনের দুর্বলতা: যদিও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে বড় ধরনের ধসের ঘটনা কম, কিন্তু দুর্বল ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনগুলোতে সামান্য ফাটলও ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এই কম্পন আমাদের দুর্বল অবকাঠামো নিয়ে পুনরায় ভাবার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

​নিয়মিত ঝুঁকি: ঘন ঘন এই ধরনের কম্পন প্রমাণ করে যে আমরা একটি উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দা। এই ঝুঁকি এখন আর কেবল উত্তর-পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়, দেশের মধ্যাঞ্চলও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

​বার্তাটি পরিষ্কার: আমাদের আর কালক্ষেপণ না করে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া অপরিহার্য। ভূমিকম্পের আতঙ্ককে কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ হলো সচেতনতা, কঠোর নির্মাণ আইন অনুসরণ এবং নিরন্তর মহড়ার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত রাখা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ