Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৩:১৬ অপরাহ্ণ

একুশে ফেব্রুয়ারি: বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মমর্যাদার অমর প্রতীক

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি—একটি তারিখ নয়, বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত ঘোষণাপত্র। এই দিনে কয়েকজন তরুণ তাঁদের তাজা রক্তে লিখে দিয়েছিলেন ভাষার অধিকার, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের অমর ইতিহাস। সেই রক্তরাঙা পথ ধরে বাঙালি শিখেছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, বিভাজনের দেয়াল ভেঙে এক হতে।
ভাষা আন্দোলনের মূলে ছিল এক সহজ কিন্তু গভীর দাবি—মাতৃভাষার স্বীকৃতি। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নিল, তখন বাংলার মানুষ বুঝল—এ শুধু ভাষার প্রশ্ন নয়, এ অস্তিত্বের লড়াই। ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম নয় কেবল; এ আমাদের চিন্তার আকাশ, সংস্কৃতির আধার, ঐতিহ্যের ধারক এবং পরিচয়ের মূল স্তম্ভ। তাই উচ্চারিত হল সেই অগ্নিমন্ত্র—“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।”
এই দাবির অন্তরে লুকিয়ে ছিল অসাম্প্রদায়িকতার বীজ। ভাষা কোনো ধর্মের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়—ভাষা সকলের। বাংলা মুসলমানের যেমন, হিন্দুর তেমনি; বৌদ্ধের যেমন, খ্রিষ্টানেরও তেমনি। ভাষা বিভাজন শেখায় না, মানুষকে একত্র করে।
আর সেই ঐক্যের প্রতীক হয়ে অমর হয়ে আছেন—
আবুল বরকত,
আবদুস সালাম,
রফিকউদ্দিন আহমদ,
আবদুল জব্বার,
শফিউর রহমান—
এবং অগণিত নাম-না-জানা সাহসী মানুষ। তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় ইতিহাসের প্রান্তে পড়ে থাকে; তাঁদের প্রকৃত পরিচয়—তাঁরা বাঙালি, তাঁরা ভাষার সৈনিক।
এ কথাও স্মরণীয় যে ভাষা আন্দোলনের পরিক্রমায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতার সম্পৃক্ততা ছিল। তৎকালীন ডাকসুর জিএস হিসেবে গোলাম আযম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদানে সম্পৃক্ত ছিলেন—যা সেই সময়ের ছাত্ররাজনীতির এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বহুমাত্রিক; এতে নানা মত-পথ ও ব্যক্তির অংশগ্রহণ ছিল। একে সংকীর্ণ ব্যাখ্যায় আবদ্ধ করলে তার সামগ্রিকতাই ক্ষুণ্ণ হয়।
একুশের চেতনা তাই শুধু শহীদ দিবসের স্মারক নয়—এ অসাম্প্রদায়িক মানবিকতার আলোকবর্তিকা। এই চেতনা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার সংগ্রামের ভিত রচনা করেছে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যেমন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে একুশের আত্মমর্যাদার বোধ আমাদের জাগিয়ে তুলেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনেও প্রতিফলিত হয়েছে একই ঐক্য। আলেম-উলামা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহিণী—দল-মত নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমেছিল অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে। এ আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর নয়; যেমন ভাষা আন্দোলনও কারও একার সম্পত্তি নয়। এসব ইতিহাসের অধ্যায় সামষ্টিক চেতনার ফসল—জনগণের, সকলের।
সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন—এটি এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি এটিকে রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হিসেবে তার দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিভেদসৃষ্টিকারী।
শহীদ মিনার সকলের। যে কেউ সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে পারে, ফুল দিতে পারে, মোনাজাত করতে পারে। একে কোনো গোষ্ঠীর কুক্ষিগত করার চেষ্টা যেমন ভুল, তেমনি অযথা বিতর্ক উসকে দিয়ে জাতীয় ঐক্যে আঘাত করাও অনুচিত। এতে বিভাজন বাড়ে, ঐক্য ক্ষীণ হয়—আর একুশের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজ যদি কেউ শহীদ দিবস, শহীদ মিনার বা একুশের আত্মত্যাগকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পত্তি বানাতে চায়, তবে তা একুশের চেতনাকেই অস্বীকার করা হবে। শহীদ মিনারে যাওয়া, প্রভাতফেরিতে অংশ নেওয়া, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো—এসব প্রত্যেক বাঙালির স্বাভাবিক অধিকার। সেখানে বিভাজনের দেয়াল তোলা মানে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। একুশ শেখায়—অধিকার ও মর্যাদার সংগ্রামে বিভেদের স্থান নেই।
আজ ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
বিশ্বের নানা দেশে ভাষাগত অধিকার রক্ষার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে এই দিন। কিন্তু আমাদের কাছে এর তাৎপর্য আরও গভীর—এ আমাদের আত্মপরিচয়ের শিকড়, অসাম্প্রদায়িক ঐক্যের দীপ্ত ইতিহাস।
একুশ আমাদের শেখায়—ভাষা মানে স্বাধীন সত্তা, ভাষা মানে সমতা, ভাষা মানে মানবিক মর্যাদা। এই চেতনাকে কুক্ষিগত নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।
শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আবার উচ্চারণ করি—
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি—
আমি কি ভুলিতে পারি?
এই অঙ্গীকার অমলিন থাকুক,
এই চেতনা জাগ্রত থাকুক,
সকল বাঙালির হৃদয়ে।

মুফিদুল আলম
শিক্ষক ও লেখক
রামু, কক্সবাজার।

মন্তব্য করুন