সহকারী অধ্যাপক
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:১৭ অপরাহ্ণ
শূন্য কোলে ফুটুক ফুল - মোঃ মুজিবুর রহমান
শূন্য কোলে ফুটুক ফুল
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক,
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা,কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
হে দয়াময় রব! কাঁপে হাড়, নুয়ে পড়ে দেহ,
বার্ধক্যের ধূসর ছায়ায় ঢাকে জীবনের গেহ।
শিরে সাদা চুলের রেখা সময়ের সাক্ষ্য দেয়,
তবু তোর দরবারে এসে মন আশায় ভরসা পায়।
হে আমার প্রভু! তোর দুয়ারে হাত তুলেছি যতবার,
খালি ফিরিনি কোনোদিন—মিটেছে অন্তর-অভিসার।
কিন্তু আজ ভয় জাগে মনে, আমার পরের প্রজন্ম নিয়ে,
স্বগোত্রের পথে আঁধার নামে, দ্বীনের প্রদীপ কি জ্বলে রইবে দিয়ে?
আমার সঙ্গিনী—নিরাশার ভারে নত,
বন্ধ্যা তার কোলে নেই সন্তানের স্নিগ্ধ রত্ন।
আমি নিজেও বয়সের সীমানা ছুঁয়ে,
জীবনের সূর্য অস্তপানে ঢলে পড়ে ধূসর বুকে।
তবু হে রব! তোর করুণায় সীমা কোথায়?
শূন্য কোলে ফুটুক ফুল—তোর ইশারায়।
দে এক উত্তরাধিকারী, তোর পক্ষ হতে দান,
যে বহন করবে নবুওয়তের পবিত্র সম্মান।
যে হবে আমার উত্তরসূরি, ইয়াকূবের বংশধর,
ঈমানের শিখা জ্বালাবে, হবে সত্যের কণ্ঠস্বর।
হে প্রভু! তাকে করো তোর প্রিয় ও পছন্দনীয়,
তোর সন্তুষ্টির পথে হোক সে দীপ্ত, অনিন্দ্য, অম্লানময়।
তখন এলো সুসংবাদ নূরের আলোকধারা—
“হে যাকারিয়্যা! শোনো আনন্দের পবিত্র সুরধ্বনি সারা।
আমি দিচ্ছি তোমায় এক পুত্র, শুভ সংবাদ,
তার নাম হবে ইয়াহইয়া—অদ্বিতীয় এ নামের আবাদ।
ইতিপূর্বে কাউকে দিইনি এ নামের সম্মান,
সে হবে পবিত্র, ধার্মিক, নব আলোর দান।”
বিস্ময়ে কাঁপে হৃদয়, বৃদ্ধ কণ্ঠ বলে—
“কেমন করে পুত্র হবে এ বার্ধক্যের কালে?
আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, আমিও জীবনের অন্তিমে,
কীভাবে ফুটবে সন্তান-ফুল শুকনো সময়ের বনে?”
উত্তর এলো আসমানি শান্ত স্বরে ভরা—
“এভাবেই হয়, যখন রবের ইচ্ছা ধরা।
এ তো আমার জন্য সহজ, সীমাহীন ক্ষমতায়,
আমি তো তোমায় সৃষ্টি করেছি শূন্যতারই প্রান্তরায়।
তুমি ছিলে না কিছুই—নেই ছিল পরিচয়,
আমার ‘কুন’ শব্দে জেগেছে তোমার অস্তিত্বময়।”
হে মানব! দেখো তবে রবের অপার কুদরতখানি—
বার্ধক্যের ছায়াতেও ফুটে ওঠে আশার বাণী।
যে ডাকে বিশ্বাসভরে, বিনম্র চোখের জলে,
তার প্রার্থনা রবে না ব্যর্থ, দয়াময় রবের তলে।
***
হে আমার রব! নত দেহ, কাঁপে অস্থি-সারি,
বার্ধক্যের ধূসর ছোঁয়ায় সাদা শিরের ভারি।
জীবনের দীপ নিভু নিভু, ক্ষীণ হয়েছে বল,
তবু তোরই দরবারে রাখি ভরসার অনল।
কতবার ডেকেছি তোকে অশ্রুসিক্ত নয়নে,
কখনো ফিরিনি ব্যর্থ তোর দয়ারই সায়নে।
তোর কৃপা ঢেউ হয়ে ভাসিয়েছে প্রাণ,
অভাবের অন্ধকারে জ্বালিয়েছে ঈমান।
আজও ডাকি, হে প্রভু, শোনো মিনতির সুর,
আমার পরে বংশে নেমে না আসুক বিভ্রান্তি-ঘোর।
স্বগোত্রের পথে যদি নামে দ্বীনের ক্ষয়,
তবে কে বহন করবে সত্যের দীপ্ত জয়?
আমার সাথিনী শূন্য কোল, নীরব তার বেদন,
বন্ধ্যা জীবনের দীর্ঘশ্বাসে ভেজে রাত্রি-গহন।
আমি নিজে বৃদ্ধ, শক্তিহীন এ দেহখানি,
তবু তোর কুদরতে অসম্ভব কিসের বাণী?
হে দয়াময়! দাও তবে তোমার পক্ষ হতে দান,
এক পুত্র, হবে যে নূরের সুধা-অভিযান।
সে হবে আমার উত্তরসূরি, ইয়াকূবের ধারায়,
ঈমানের পতাকা তুলে দাঁড়াবে সত্যের সারায়।
তাকে করো পছন্দনীয়, প্রিয় তোর দরবারে,
তার জীবন হোক সেজদায়, কুরআনেরই আহ্বানে।
তার কণ্ঠে জাগুক হক্বের অমৃত বাণী,
তার চিত্তে ফুটুক তাকওয়ার বাগানখানি।
তখন এলো আসমান ভরা সুসংবাদের ঢেউ—
“হে যাকারিয়্যা! ভেবো না আর কোনো ঢেউ।
আমি দিচ্ছি তোমায় পুত্র, পবিত্র যার পরিচয়,
ইয়াহইয়া হবে তার নাম—নূরেরই নব জয়।
এ নাম আগে দিইনি কাহারে কভু,
সে হবে কল্যাণময়, ধার্মিক, সত্যরূপ শুভ।”
বিস্ময়ে কাঁপে বৃদ্ধ হৃদয়, প্রশ্ন তোলে আবার—
“কেমন করে সম্ভব প্রভু, এ যে অচিন্তার পার!
আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা, আমিও শেষ প্রহরে,
কীভাবে ফুটবে সন্তান-ফুল শুকনো এ অন্তরে?”
উত্তর এলো শান্ত সুরে, রহমতের বাণী—
“এ তো আমার জন্য সহজ, অতি সামান্য জানি।
আমি তো সৃষ্টি করেছি তোমায় শূন্য হতে,
অস্তিত্ব দিয়েছি ‘হও’ বলে অনস্তিত্বের গহনে।”
হে মানুষ! শোনো তবে কুদরতের মহাগান—
রবের ইশারায় বদলায় নিয়তির দান।
যে ডাকে বিশ্বাসভরে, বিনম্র অন্তর দিয়ে,
তার দো‘আ উঠে যায় আরশের নূরালয়ে।
বার্ধক্য, শূন্যতা, দুঃখ যতই ঘিরে রয়—
রবের রহমতে সেগুলো হয় আশারই জয়।
তাই তুমিও ডাকো তাঁকে নির্ভীক প্রাণে,
দয়াময় প্রভু সাড়া দেন অশ্রুভেজা টানে।
১
২ মন্তব্য