Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:২১ পূর্বাহ্ণ

৩৬৫টি জাতীয়করণকৃত কলেজে শিক্ষক সংকট ও বঞ্চনা - নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত

৩৬৫টি জাতীয়করণকৃত কলেজে শিক্ষক সংকট ও বঞ্চনা - নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত

শুভাশীষ দাশ

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত বহুদিন ধরেই এক জটিল বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। নানা সংস্কার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভিড়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে কলেজ জাতীয়করণ ও শিক্ষক আত্তীকরণের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ–সুবিধা নিয়ে এক ধরনের নীতি–সংঘাত তৈরি হয়েছে। একদিকে শিক্ষকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি, অন্যদিকে সরকারি নীতিমালা ও প্রশাসনিক জটিলতা, এই দ্বন্দ্ব উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে এক বড় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কলেজ বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত হয়। এসব কলেজে কর্মরত শিক্ষকরা সরকারি কলেজ শিক্ষকদের মতো বেতন-ভাতা, পেনশন, চিকিৎসা সুবিধা ও পদোন্নতির সুযোগ পান না। ফলে তাদের মধ্যে জাতীয়করণের দাবি বহু বছর ধরে প্রবল হয়ে উঠেছে। জাতীয়করণ মানে হলো, কোনো বেসরকারি কলেজকে সরকারি বাজেট ও প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা। এতে কলেজের শিক্ষকরা সরকারি চাকরির নিয়মে বেতন কাঠামো, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়। তাই জাতীয়করণকে কেবল শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে দেখা যায় না; এটি শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য একটি পদক্ষেপ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার ২৭০টি কলেজ সরকারি ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকটিসহ মোট ৩৬৫টি কলেজ সরকারিকরনের আওতায় আনা হয়। এই সব সরকারিকৃত কলেজসমূহের শিক্ষক ও কর্মচারীগন বিভিন্ন যাচাই-বাছাই ও হয়রানির শিকার হয়ে অবশেষে ২০১৮ এর শেষ দিকে অ্যাডহক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। উল্লেখ্য যে, এই সকল কলেজের অনেক শিক্ষক কর্মচারী এখনো নিয়োগের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের দ্বারেদ্বারে ঘুরছেন।

এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে জটিল ইস্যু হলো অ্যাডহক শিক্ষকদের অবস্থান। বহু শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে অ্যাডহক ভিত্তিতে কর্মরত আছেন। তাদের দাবি, কলেজ জাতীয়করণের ঘোষণার তারিখ থেকেই নিয়মিতকরণ কার্যকর করতে হবে। একই প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পাঠদান করা সত্ত্বেও তারা এখনও “অস্থায়ী” পরিচয়ে কাজ করছেন, যা শিক্ষকদের জন্য আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। অন্যদিকে সরকারের নীতিমালায় সময় সময় পরিবর্তন আসায় অনেকে স্থায়ী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে পদোন্নতি, পেনশন বা আর্থিক সুবিধার সুযোগ হারিয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন।

এছাড়া জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকদের জন্য আত্তীকরণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবে নানা বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। ২০০০ সালের বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, আত্তীকৃত শিক্ষকরা শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত হবেন। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের একটি অংশের বিরোধিতা, আন্দোলন ও রিট মামলার কারণে ২০১৮ সালের বিধিমালায় তাদের নন–ক্যাডার ঘোষণা করা হয়। একই কলেজে একই দায়িত্ব পালন করেও আত্তীকৃত শিক্ষকরা সরকারি ক্যাডার কর্মকর্তাদের সমান মর্যাদা ও সুবিধা পান না। ফলে শিক্ষক সমাজের ভেতরে এক ধরনের বিভাজন তৈরি হয়।

এই বৈষম্যের অবসান চেয়ে শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে একাধিক দাবি তুলেছেন। আত্তীকৃত শিক্ষক–কর্মচারীরা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আত্তীকরণকালে প্রাপ্ত বেতন গ্রেড অক্ষুণ্ণ রাখা, ইফেক্টিভ সার্ভিস গণনা করে জ্যেষ্ঠতা প্রদান, পাঁচ বছর পূর্ণ হলে পদোন্নতি, চাকরির পুরো সময়কে সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে গণনা করা এবং পদোন্নতির স্বাভাবিক সোপান নিশ্চিত করা। অন্যদিকে সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের সংগঠন (সকশিস) এর  শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলন করে আট দফা দাবি জানিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল জাতীয়করণের তারিখ থেকে নিয়মিতকরণ, অবসরপ্রাপ্তদের শতভাগ আর্থিক সুবিধা প্রদান, দ্রুত স্থায়ীকরণ এবং বঞ্চনাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সব দাবির মধ্যেই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি ও আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন। ------------------

মন্তব্য করুন

ব্লগ