Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:০২ পূর্বাহ্ণ

কোয়ান্টাম জগতের এক অদ্ভুত কিন্তু শক্তিশালী ঘটনা—কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট

মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা যতই দূরে দেখতে চাই, ততই একটা প্রশ্ন ফিরে আসে—আরও স্পষ্টভাবে কি দেখা সম্ভব? ঝাপসা আলো, ক্ষীণ তারার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা গ্রহ, কিংবা পাশাপাশি থাকা দুটো নক্ষত্র—সবকিছুকে কি ঝকঝকে স্পষ্ট করে ধরা যায়? বিজ্ঞানীরা বলছেন, হ্যাঁ, সম্ভব। আর সেই পথটা খুলে দিচ্ছে কোয়ান্টাম জগতের এক অদ্ভুত কিন্তু শক্তিশালী ঘটনা—কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট।


ভাবুন, পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসানো দুটি টেলিস্কোপ। মাঝখানে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব। সাধারণ নিয়মে এই দুই টেলিস্কোপের আলো এক জায়গায় এনে মিলিয়ে দেখা প্রায় অসম্ভব। অথচ জ্যোতির্বিদরা বহুদিন ধরেই এমনটা করে আসছেন, যাকে বলা হয় লং-বেসলাইন ইন্টারফেরোমেট্রি। এতে আলাদা আলাদা জায়গায় বসানো টেলিস্কোপ থেকে আসা আলো তুলনা করে একটি বড় কল্পিত টেলিস্কোপের মতো কাজ করানো হয়। ফলাফল—আরও সূক্ষ্ম ছবি। কিন্তু সমস্যা একটাই। এত দূরে দূরে থাকা টেলিস্কোপের আলো অপটিক্যাল লিঙ্ক দিয়ে এক জায়গায় আনা ভীষণ কঠিন, প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।


এখানেই নতুন মোড়। যুক্তরাষ্ট্রের University of Arizona, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড এবং NASA Goddard Space Flight Center-এর গবেষকেরা প্রস্তাব করেছেন এক ভিন্ন পথ। তারা বলছেন, আলোকে আর এক জায়গায় আনতে হবে না। বরং টেলিস্কোপগুলোকেই কোয়ান্টামভাবে জুড়ে দেওয়া যায়। এই জোড়াটাই হলো কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট—যেখানে দুটি আলাদা কণার দূরত্ব যাই হোক না কেন, একটি নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম অবস্থায় বাঁধা থাকে।


এই গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন, কোয়ান্টাম তথ্য তত্ত্ববিদ Saikat Guha, বলছেন—তাদের দল আলোকে কেবল তরঙ্গ বা কণার মতো দেখে না, দেখে কোয়ান্টাম তথ্য হিসেবে। এতে করে তারা বুঝতে পারেন, প্রকৃতির দেওয়া সর্বোচ্চ রেজোলিউশন সীমা ঠিক কোথায়। এই সীমা কোনো ক্যামেরা বা ডিটেক্টরের উপর নির্ভর করে না। এটা একেবারে মৌলিক, কোয়ান্টাম নিয়মে বাঁধা।


তারা দেখেছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে যেগুলোকে এতদিন “দেখা অসম্ভব” বলে মনে করা হতো—যেমন খুব কাছাকাছি থাকা দুটো দুর্বল নক্ষত্র—সেগুলো আসলে দেখা যায়। শর্ত একটাই, আমাদের দেখতে হবে নতুনভাবে। সেই নতুন চোখের নাম স্পেশাল মোড সোর্টিং। এতে আলোকে তার স্থানিক প্যাটার্ন অনুযায়ী আলাদা করা হয়, যেন আলো নিজেই বলে দেয় সে কোথা থেকে এসেছে, কী তথ্য বয়ে এনেছে।


আগের এক গবেষণায় নাসার বিজ্ঞানী আকিল সাজ্জাদ দেখিয়েছিলেন, দুটি দূরবর্তী টেলিস্কোপ দিয়ে কীভাবে দুটি নক্ষত্র আলাদা করে চেনা যায়। তাত্ত্বিকভাবে এটা কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যা হলো—আলো এক জায়গায় আনতেই হবে। আর দূরত্ব যত বাড়ে, ক্ষতি তত বেশি। তাই গুহ ও তার সহকর্মীরা ভাবলেন, আলো যদি না আনি, তাহলে কি তার তথ্য আনা যায়?


উত্তরটা কোয়ান্টাম মেকানিক্স আগেই দিয়ে রেখেছে। এনট্যাঙ্গেলমেন্ট আর ক্লাসিক্যাল যোগাযোগ একসঙ্গে ব্যবহার করলে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন সম্ভব। মানে, কোনো কণাকে সরানো ছাড়াই তার কোয়ান্টাম অবস্থা দূরে পাঠানো যায়। গবেষকেরা দেখালেন, টেলিস্কোপে ধরা পড়া ফোটনের তথ্য স্থানীয় কোয়ান্টাম মেমোরিতে জমা করে, এনট্যাঙ্গেলমেন্টের সাহায্যে অন্য টেলিস্কোপের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়। মাঝখানে কোনো ফিজিক্যাল বিম-স্প্লিটার লাগছে না। আলোকে আর ভ্রমণ করতে হচ্ছে না।


এই ধারণার শিকড় কিন্তু পুরোনো। ২০১২ সালে কানাডার একদল গবেষক প্রথম ভাবেন—দুটি আলাদা জায়গায় থাকা আলোর মধ্যে হস্তক্ষেপ ঘটানো যায় কি না, আলো এক জায়গায় না এনে। নতুন গবেষণাটি সেই ধারণাকে অনেক বড় পরিসরে, আরও নিখুঁতভাবে বাস্তব রূপ দিল।


গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে কোয়ান্টাম ফিজিক্স যে সর্বোচ্চ তথ্য সীমা দেয়, ঠিক সেই সীমা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। অর্থাৎ, রেজোলিউশন আর বাড়ানো যাবে না—কারণ প্রকৃতি নিজেই সেখানেই দাগ টেনে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় সেটা বিশাল উন্নয়ন।


এর ব্যবহারও কম নয়। দূরের নক্ষত্রগুচ্ছের অবস্থান নির্ণয়, পরিচিত কোনো মহাকাশ বস্তুতে সামান্য পরিবর্তন ধরা, গ্রহের শ্রেণিবিন্যাস, এমনকি দূর নক্ষত্রের আলোয় লুকিয়ে থাকা এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে বের করা—সবখানেই এই পদ্ধতি বিপ্লব আনতে পারে। ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম নেটওয়ার্কে যুক্ত টেলিস্কোপগুলো একসঙ্গে কাজ করবে, যেন তারা সবাই মিলে একটাই বিশাল চোখ।


হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল ইতিমধ্যেই প্রমাণ দেখিয়েছে যে দূরবর্তী কোয়ান্টাম মেমোরির মধ্যে এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ব্যবহার করে খুব দুর্বল আলোর ফেজ পার্থক্য মাপা যায়। নতুন এই কাজ সেই পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে বাস্তব জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেতু গড়ে দিল।


আপনি যখন রাতের আকাশের দিকে তাকান, তখন কি কখনো মনে হয়—এই আলোটা কত দূর থেকে এসেছে, আর পথে পথে কী হারিয়ে ফেলেছে? যদি কোয়ান্টাম প্রযুক্তি সেই হারানো তথ্য ফিরিয়ে দিতে পারে, তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব দেখার অভিজ্ঞতা কতটা বদলে যাবে বলে আপনার মনে হয়?


এই গবেষণাটি করেছেন ইসাক পাদিয়া ও তাঁর সহকর্মীরা। প্রবন্ধটির শিরোনাম Superresolution Imaging with Entanglement-Enhanced Telescopy এবং এটি ২০২৬ সালে Physical Review Letters-এ প্রকাশিত হয়েছে।


মন্তব্য করুন

ব্লগ