সহকারী শিক্ষক
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৫:০৩ পূর্বাহ্ণ
বৈদ্যুতিক তার সমাচার : পাখি নির্ভয়, বাদুর কেন অসহায়?
প্রকৃতির সান্ধ্য আকাশে যখন গোধূলির আলো মিলিয়ে যায়, তখন আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারগুলোতে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। একদিকে একঝাঁক পাখি আড্ডায় মত্ত, যেন উচ্চ ভোল্টেজের সেই মরণফাঁদ তাদের কাছে নিছক এক দোলনা। অন্যদিকে, গভীর রাতে সেই একই তারে ঝুলে থাকা একটি বাদুড়ের নিথর দেহ আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিদ্যুতের ভয়াবহতা।
কেন এই পক্ষপাত? কেন একই মরণ-সুতো একজনের কাছে নিরাপদ আসন, আর অন্যজনের কাছে যমের দুয়ার? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের নিগূঢ় রহস্য আর প্রকৃতির বিচিত্র শারীরিক গঠনের মেলবন্ধনে।
🔘 বিভব পার্থক্য: বিদ্যুৎ প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি
বিদ্যুৎ অনেকটা পাহাড়ি ঝরনার মতো। ঝরনা যেমন উঁচু থেকে নিচু দিকে বয়ে যায়, বিদ্যুৎও তেমন উচ্চ বিভব (High Voltage) থেকে নিম্ন বিভবের (Low Voltage) দিকে ছুটতে চায়। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় বিভব পার্থক্য (Potential Difference)।
যখন একটি পাখি একটি মাত্র তারের ওপর দুই পা দিয়ে বসে, তখন তার শরীরের দুটি বিন্দুই একই বিভবে থাকে। ফলে বিদ্যুতের জন্য পাখির শরীরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কোনো বিশেষ তাগিদ থাকে না। বিদ্যুৎ সবসময় সহজ পথ খোঁজে। তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের তারের পরিবাহিতা পাখির শরীরের চেয়ে অনেক বেশি, তাই বিদ্যুৎ পাখিকে পাশ কাটিয়ে তারের ভেতর দিয়েই বয়ে যায়।
"বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য প্রয়োজন একটি পথ বা সার্কিট। পাখি যখন এক তারে বসে, তখন সেই সার্কিট পূর্ণ হয় না। ফলে পাখির ভেতর দিয়ে কোনো তড়িৎ প্রবাহিত হয় না।"
🔘 বাদুড়ের ট্র্যাজেডি: যেখানে সাহিত্য মেলে বিজ্ঞানে
বাদুড় কিন্তু পাখির মতো শান্ত হয়ে বসে থাকে না। বাদুড়ের ডানার বিস্তার অনেক বড় এবং তাদের বসার ভঙ্গিও ভিন্ন। বাদুড় যখন ডানা ঝাপটায় বা তারে ঝুলে থাকে, তখন ভুলবশত তার শরীরের কোনো অংশ পাশের অন্য একটি তারে (যা ভিন্ন বিভবে আছে) অথবা বিদ্যুতের খুঁটির সাথে (যা ভূমির সাথে সংযুক্ত) স্পর্শ লেগে যায়।
ঠিক এই মুহূর্তেই ঘটে সেই মহাপ্রলয়। দুটি ভিন্ন বিভবের সংযোগ ঘটামাত্রই বাদুড়ের শরীর একটি 'শর্ট সার্কিট' হিসেবে কাজ করে। হাজার হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ তখন প্রচণ্ড গতিতে বাদুড়ের হৃদপিণ্ড ও স্নায়ুর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাটিতে বা অন্য তারে পৌঁছাতে চায়। এই প্রচণ্ড তাপ ও ঘর্ষণে মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় বাদুড়টি।
🔘 রোধ এবং ওহমের সূত্রের ভূমিকা
বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এখানে ওহমের সূত্র (V = IR) এক নির্মম সত্য হিসেবে ধরা দেয়। পাখির ক্ষেত্রে শরীরের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য বা V প্রায় শূন্য। ফলে তার শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ বা I এর মানও হয় শূন্য।
কিন্তু বাদুড় যখন দুটি ভিন্ন বিভবের সংযোগ ঘটায়, তখন বিভব পার্থক্য (V) হয়ে দাঁড়ায় অনেক বেশি। যেহেতু বাদুড়ের শরীরের একটি নির্দিষ্ট রোধ (R) আছে, সেহেতু বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ তার শরীরকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
🔘 কেন পাখিও মাঝে মাঝে বিপদে পড়ে?
পাখি যে একদমই নিরাপদ, তা কিন্তু নয়। যদি কোনো বড় পাখি (যেমন ঈগল বা শকুন) ডানা মেলতে গিয়ে দুটি তারে একসাথে স্পর্শ করে ফেলে, তবে তার পরিণতিও বাদুড়ের মতোই করুণ হয়। আমাদের লোকালয়ের চড়ুই বা শালিকরা আকারে ছোট হওয়ায় তারা এই মরণস্পর্শ থেকে বেঁচে যায়।
শেষ কথা : প্রকৃতির ভারসাম্য ও সাবধানতা
প্রকৃতির এই নাট্যমঞ্চে বিদ্যুৎ কেবল শক্তি নয়, এটি একটি নিয়ম। পাখি সেই নিয়ম মেনে চলে বলেই সে মুক্ত, আর বাদুড় তার শারীরিক গঠনের সীমাবদ্ধতার কারণে অজান্তেই সেই নিয়ম ভঙ্গ করে প্রাণ হারায়। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের এই সরু সুতোটি আসলে বিজ্ঞানের এক অমোঘ বিধান।
তাই বিদ্যুতের তারে বসে থাকা পাখির দল আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, বিপদের মাঝে থেকেও নিরাপদ থাকা সম্ভব, যদি আমরা তার নিয়মগুলো সঠিকভাবে জানি। আর বাদুড়ের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অসাবধানতা এবং প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যাওয়া মানেই চরম মূল্য চুকানো।
৪
৪ মন্তব্য