সহকারী শিক্ষক
২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:২৪ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
অধ্যায়-৩
পাঠ-২ সালাত الصلوة
পরিচয়
সালাত আরবি শব্দ। এর ফার্সি প্রতিশব্দ হলো নামায।
সালাত (الصلاة) শব্দের শাব্দিক অর্থগুলো হলো- দোয়া-Supplication / Prayer,, ক্ষমা প্রার্থনা করা ও রহমত (দয়া) কামনা করা। দু‘আ — রহমত বা দয়া — Mercy / Blessin, ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) — Seeking forgiveness, বরকত কামনা — Invoking blessings, প্রশংসা করা — Praise
নৈকট্য লাভের চেষ্টা — Seeking closeness (to Allah), ইবাদত বা উপাসনা — Worship / Devotional act.
সংজ্ঞা -
১। যেহেতু সালাতের মাধ্যমে বান্দা প্রভুর নিকট দোয়া করে, দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে তাই একে সালাত বলা হয়।
২। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত; যা তাকবিরে তাহরিমা দ্বারা শুরু এবং সালাম দ্বারা শেষ হয়।
৩।ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ে, সুনির্দিষ্ট নিয়ম-পদ্ধতি, শর্ত, রুকন (যেমন: রুকু-সিজদা) ও আদব রক্ষা করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বান্দার যে ইবাদত বা উপাসনা করা হয়, তাকেই সালাত বলে।
৪।শরী‘আত নির্দেশিত ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহর নিকটে বান্দার ক্ষমা ভিক্ষা ও প্রার্থনা নিবেদনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদতকে ‘ছালাত’ বলা হয়, যা তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা শুরু হয় ও সালাম দ্বারা শেষ হয়’।
ইসলাম যে পাঁচটি রুকনের (স্তম্ভের) ওপর প্রতিষ্ঠিত-তার দ্বিতীয়টি হলো সালাত। এ সম্পর্কে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন-
بنى الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ وَإِقَامِ الصَّلُوةِ وَايْتَاءِ الزَّكُوةِ وَالْحَجِ وَصَوْمِ رَمَضَانَ
অর্থ: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ (স.) তার বান্দা ও রাসুল এবং সালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, হজ করা এবং রমযানের রোযা রাখা (বুখারি ও মুসলিম)।
কিয়ামতের দিন আল্লাহ সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন-أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلُوةُ -
অর্থ: কিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব নেওয়া হবে (তিরমিযি)।
মহান আল্লাহ মুমিনের ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ (আবশ্যক) করেছেন। তা হলো-ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও এশা।
সালাত একজন মুমিনকে (বিশ্বাসী) মন্দ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الصَّلوةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ،
অর্থ: নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে (সূরা আল আনকাবুত, আয়াত ৪৫)।
-বিশ্ব নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যথারিতি নামাজ পড়ে আল্লাহ তার নামাজের বদলে, পাঁচটি বিশেষ সম্মান দান করেন। ১.নামাজির অভাব দূর করেন, ২. কবরের আজাব দূর করেন, ৩. কেয়ামতের দিন ডান হাতে আমল নামা দিবেন, ৪. বিদ্যুতের ন্যায় পুলসিরাত পার করবেন, ৫. যথারীতি নামাজ আদায়কারী বিনা হিসাবে বেহেস্তে প্রবেশ করবেন। যে ব্যক্তি নামাযে অলসতা করে সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তাআলা ১৪টি শাস্তি নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন। পাঁচটি ইহজগতে, তিনটি মৃত্যুর সময়ে, তিনটি কবরে ও তিনটি কবর হইতে বাহির হইবার পর হাশরে ময়দানে’।
শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ব্যতীত কখনোই সালাত ত্যাগ করা যাবে না।
ধর্মীয় গুরুত্ব
১। সালাত মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে।
২। সালাত-এর মাধ্যমে বান্দা তার প্রভুর সান্নিধ্য লাভ করতে পারে।
৩।সালাতের মাধ্যমে ইমান মজবুত হয়, আত্মা পরিশুদ্ধ হয়।
৪। সালাত মানুষকে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে অভান্ত করে তোলে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
৫। সালাত কিয়ামতের দিন নুর হবে।
৬।সালাত গুনাহ দূর করে।
৭। সালাত ইমান ও কুফুরের পার্থক্যকারী
সালাতের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মনোযোগসহ সালাত আদায় করে, কিয়ামতের দিন ঐ সালাত তার জন্য নূর হবে" (তাবারানি)।
একদা হযরত মুহাম্মদ (স.) তাঁর সাথিদের লক্ষ্য করে বললেন 'যদি কারও বাড়ির পাশ দিয়ে একটি নদী প্রবাহিত হয় এবং কোনো লোক দৈনিক পাঁচবার ঐ নদীতে গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকবে?' সাহাবিগণ উত্তরে বললেন, 'না' হে আল্লাহর রাসূল। তখন মহানবি (স.) বললেন- পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিক তেমনি তার (সালাত আদায়কারীর) গুনাহসমূহ দূর করে দেয়। (বুখারি ও মুসলিম)
-মহানবি (স.) বলেছেন, "সালাত হলো ইমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী" (তিরমিযি)।
-রাসূল (সা.)বলেন, "জামাআতে সালাত আদায় করলে একাকী আদায় করার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।" (বুখারি ও মুসলিম)
৮। আল্লাহ তায়ালাও সালাতকে জামাআতের সাথে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ )
অর্থ: আর তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৪৩)।
৯।সালাতের দ্বারা হৃদয় ও মন শান্ত হয়।
রাসূল (সা.) বলেছেন, নামাযে আমার চোখের শীতলতা। অন্য এক হাদীসে হযরত বেলাল রা.কে আদেশ করেছেন, ‘হে বেলাল! নামায কায়েম করে আমাদেরকে প্রশান্তি দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ ২/৬৮১)
১০। সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাব করা যায়।
১১। সালাত কররে আত্মশুদ্ধি হয় -এটি মানুষের ভেতরকার সুকুমারবৃত্তি বিকশিত করে এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে সাহায্য করে।
১২। সালাত শৃঙ্খলা ও ঐক্য শিক্ষা দেয়: জামাতের সাথে সালাত আদায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে।
১৩। সালাত আদায় কররে পরকালের মুক্তি পাওয়া যায় - কিয়ামতের দিন প্রথম হিসাব হবে সালাতের, যা সফলতার চাবিকাঠি।
১৪। সালাত ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ।
১৫। কিয়ামতের দিন প্রথম হিসাব সালাতের
১৬। পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা লাভ করে
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زينتكم عند كل مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ
المشرفين )
"হে বনী-আদম। তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও, খাও, পান কর কিন্তু অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আরাফ: ৩১)
১৭। উত্তম চরিত্র অর্জন করে
আল্লাহ তা'আলা বলেন, إن الصلاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ )
"নিঃসন্দেহে সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)
১৮। সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা দেয়
আল্লাহ তা'আলা বলেন, فأقيموا الصلاة إن الصلاة كانت عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُونًا )
"যথারীতি সালাত আদায় করবে, নিশ্চয় সালাত মুসলমানদের উপর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদায় করা ফরজ করা হয়েছে।" (সূরা নিসা: ১০৩)
১৯। সালাত আদায়কারী নিষ্ঠাবান হয়
একজন সৈনিককে সর্বক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান হতে হয়। নিষ্ঠার সাথে সালাত আদায়কারী হচ্ছে প্রকৃত মুমিন। উদাসীন অবস্থায় সকল কাজ কর্ম যেমন নিষ্ফল হয় তদুপ সালাতেও আসে দুর্ভোগ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, فويل للمصلين الذِينَ هُمْ عَن صلاتهمْ سَاهُونَ ) "মর্মান্তিক দুর্ভোগ রয়েছে সে সব মুনাফিক মুছল্লীর জন্যে, যারা নিজেদের সালাতে উদাসীন।" (সূরা মাউন: ৪-৫)
২০। সালাত প্যারেডে শৃংখলা শিক্ষা দেয়
শৃংখলা বা কাতার সোজা রাখাও সালাত কায়েমের পরিপূরক। রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,
اسووا صفوفكم فإن تسوية الصفوف من إقامة الصلاة (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
"তোমরা কাতার সোজা কর, কাতার সোজা করা সালাত কায়েমের অন্তর্ভূক্ত।" (সহীহ আল-বুখারী: ৭২৩, সহীহ মুসলিম: ১০০৩)
২১।সালাতের মাধ্যমে মনের প্রশান্তি লাভ হয়
মুছল্লী ব্যক্তির মন পবিত্র থাকে বলেই সব সময় তার মনে প্রশান্তি বিরাজ করে। রাসূলুল্লাহ স. প্রায়ই বলতেন,
اللهمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهم والحزن والْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْبُخْلِ وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرجال الترمذي
"হে আল্লাহ। আমি তোমার কাছে বিভিন্ন রকমের চিন্তা, বিষন্নতা, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ঋণের চাপ এবং লোকদের অত্যাচার থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।" (জামি' আত-তিরমিযী: ৩৪৮৪, সহীহ)
২২। সালাত সংঘবদ্ধতা শিক্ষা দেয়
রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ تَفْضُلُ صَلَاة القد يسمع وَعِشْرِينَ دَرَجَةً (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
"জামা'তের সাথে সালাত আদায় একাকী সালাত আদায়ের চেয়ে সাতাশ গুণ অধিক উত্তম ও মর্যাদাসম্পন্ন (বেশী ছওয়াব)।" (সহীহ আল-বুখারী: ৬৪৫, সহীহ মুসলিম: ১৫০৯, মিশকাত: ১০৫২)
২৩। সালাতের শিষ্টাচার ও আত্মসমর্পণ শিক্ষা দেয়
আল্লাহ তা'আলা বলেন, إلهكم إله واحدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُحْتِينَ )
"তোমাদের ইলাহ হচ্ছেন একক, তোমরা তাঁরই সামনে আনুগত্যের মাথা নত কর। (হে নবী।) তুমি আমার বিনীত বান্দাদের সাফল্যের সুসংবাদ দাও।" (সূরা হজ্জ ৩৪)
২৪। সালাত বিনয় ও নমতা শিক্ষা দেয়
"নিঃসন্দেহে সে সব মুমিনগণ সফলতা লাভ করেছে যারা সালাতে বিনয়ী।" (সূরা মুমিনুন। ১-২)
২৫। আনুগত্য পরায়ণতা
রাসুলুল্লাহ্ স. বলেছেন, مَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْلَمُ بِهِ "ইমাম এজন্যে যে, মুক্তাদীরা তার অনুসরণ করবে।" (সহীহ বুখারী: ৩৭৮)
২৬। সালাত আদায় করলে চিত্তবিনোদন হয়
মুছল্লী সালাত আদায়ে বিনোদন লাভ করে। হৃদয়ে শান্তি অনুভব করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم يذكر الله ألا بذكر الله تطمئن القلوب )
"যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শাস্তি লাভ করে। জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।" (সূরা রা'আদ: ২৮)
সামাজিক গুরুত্ব
১। পবিত্র কুরআনের বহুস্থানে জামাআতে সালাত আদায় করার কথা বলা হয়েছে।
২। সালাতের কারণে দৈনিক পাঁচবার মুসলমানগণ একস্থানে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়।
৩। সালাত আদায়ের মাধ্যমে একে-অপরের খোঁজ-খবর নিতে পারে। সুখে-দুঃখে একে অপরের সহযোগিতা করতে পারে।
৪। সালাত আদায়ের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়।
৫। সালাতের সারিতে দাঁড়াতে গিয়ে উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ থাকে না।
৬। সালাত আদায়কারীদের মধ্যে সাম্য সৃষ্টি হয়।
৭। সালাত আদায়ের মাধ্যমে মানুষ পারস্পরিক সকল মতপার্থক্য ভুলে একসাথে কাজ করার শিক্ষা পায়।
৮। সালাত সময়ের গুরুত্ব ও শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষা দেয়।
৯। সালাত নেতার অনুসরণ করতে এবং নিয়মতান্ত্রিক ও পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে।
১০। সালাত সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা শিক্ষা দেয়
১১। সালাত ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করে
১২।সালাত সামাজিক অপরাধ হ্রাস করে।
১
১ মন্তব্য