সহকারী শিক্ষক
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:১০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ইসলাম শিক্ষা। নবম দশম শ্রেণির
অধ্যায়-১
আকাইদ الْعَقَائِدُ
পরিচয়
আকাইদ শব্দটি আকিদা عَقِيْدَةً শব্দের বহুবচন।
আকাইদ অর্থ বিশ্বাসমালা।
গাঁট বাঁধা, দৃঢ়ভাবে বাঁধা
ما يُعْقَدُ عليه القلب — অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা বিষয়
الإيمان الجازم — দৃঢ় বিশ্বাস
الحكم الذي لا يقبل الشك — এমন সিদ্ধান্ত যা সন্দেহ গ্রহণ করে না
অন্তরের অটল ধারণা
অবিচল ঈমান
সন্দেহমুক্ত বিশ্বাস।
Islamic Creed – ইসলামের মূল বিশ্বাসসমূহ
Islamic Theology – ইসলামের আকীদা-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা
Articles of Faith (in Islam) – ইসলামের ঈমানের বিষয়সমূহ
Fundamentals of Faith – ঈমানের মৌলিক ভিত্তি
Tenets of Islam – ইসলামের মূল বিশ্বাসনীতি
আকাইদের সংজ্ঞা
১। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসকেই আকাইদ বলা হয়।
২।ঈমানের সেই মৌলিক বিষয়সমূহ, যেগুলোর প্রতি সন্দেহমুক্ত দৃঢ় বিশ্বাস রাখা ফরজ।
এতে অন্তর্ভুক্ত: আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, রাসূলগণ, আখিরাত ও তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস।
৩) হাদিসে ঈমানের ব্যাখ্যা—
أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وتؤمن بالقدر خيره وشره
অর্থ: আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা।
ইসলাম এর দুটি দিক রয়েছে। যথা- বিশ্বাসগত দিক ও আচরণগত বা প্রায়োগিক দিক। Belief (Faith) aspect/ Practical (Action) aspect
ইসলামের বিশ্বাসগত দিকের নামই হলো আকাইদ।
বিশ্বাসগত দিক-আল্লাহ তায়ালা, নবি-রাসুল, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, পরকাল, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি আকাইদের অন্তর্ভুক্ত।
আচরণগত বা প্রায়োগিক দিক -নামায, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি প্রায়োগিক দিক তথা ইবাদত পালন করতে হয়।
বস্তুত আকাইদের বিষয়গুলোর উপর বিশ্বাসের মাধ্যমেই মানুষ ইসলামে প্রবেশ করে।
আকাইদের গুরুত্ব
সঠিক বিশ্বাস বা ঈমান ইসলামের মূল ভিত্তি। আমরা যত ইবাদত বা সৎকর্ম করি সবকিছু আল্লাহর নিকট কবুল বা গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রথম শর্ত বিশুদ্ধ শির্ক-কুফরমুক্ত ঈমান।
কুরআন করীমে বিভিন্ন স্থানে একথা বলা হয়েছে। এক স্থানে আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ أَراَدَ الآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُوراً
‘‘এবং যে ব্যক্তি পরলৌকিক জীবনে কল্যাণ চায়, সে জন্য চেষ্টা করে এবং সে বিশ্বাসী বা মুমিন হয় তাহলে তার চেষ্টা ও কর্ম কবুল করা হবে।’’[1]
দুনিয়াতে আল্লাহর নিয়ামত ও বরকত অর্জনের এবং আল্লাহর ওয়াদাকৃত পবিত্র জীবন লাভের শর্ত হলো সঠিক ঈমান। আল্লাহ বলেছেন:
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
‘‘যদি কোনো পুরুষ বা মহিলা সৎকর্ম করে এবং সে মুমিন হয়, আমি অবশ্যই তাদেরকে (দুনিয়াতে) পবিত্র জীবন দিয়ে জীবিত রাখব এবং (আখিরাতে) তাদের সর্বোত্তম কর্মের উপর ভিত্তি করে তাদের পুরষ্কার দান করব।’’[2]
দুনিয়াতে সার্বিক বরকত ও কল্যাণ লাভের জন্য প্রথমত সঠিক ও বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী হতে হবে। অতঃপর আল্লাহকে ভয় করে সৎ জীবন যাপন করতে হবে। আর কুফরী বা অবিশ্বাসের শাস্তি হলো ধ্বংস ও ক্ষতি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آَمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
‘‘যদি জনপদ সমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর বরকত-কল্যাণসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা অবিশ্বাস করল, কাজেই আমি তাদের কর্ম অনুযায়ী ফল দান করলাম।’’[3]
আল্লাহর বন্ধুত্ব ও সন্তুষ্টি অর্জনের প্রথম ধাপই বিশুদ্ধ ঈমান। আল্লাহ বলেন:
أَلا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
‘‘জেনে রাখ! আল্লাহর ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তাগ্রস্তও হবে না- যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার পথ অনুসরণ করে।’’[4]
ইমান বিনষ্ট শিরক ও কুফুরি করলে
এজন্য মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীগণের প্রতি এ ওহী প্রেরণ করা হয়েছে যে, যদি তুমি শিরকে লিপ্ত হও, তবে অবশ্যই তোমার কর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি নিশ্চিতরূপে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তভুক্ত হবে।’’[1]
অন্যত্র ইরশাদ করা হয়েছে:
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘‘আর কেউ ঈমান প্রত্যাখ্যান করলে তার কর্ম বিনষ্ট বা নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’’[2]
মহান আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا
‘‘আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছ ক্ষমা করেন। এবং যে কেউ আল্লার সাথে শরীক করে সে এক মহাপাপ করে।’’[3]
আকাইদের গুরুত্ব (কুরআন–হাদিসের দলিলসহ)
১. ঈমানের ভিত্তি স্থাপন করে
➤ “রাসূল ঈমান এনেছেন তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাযিল হয়েছে তার উপর… এবং মুমিনরাও।”
— (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৫)
২. শিরক থেকে রক্ষা করে
➤ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না…”
— (সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)
৩. ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতার শর্ত
➤ “যে ব্যক্তি ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে…”
— (সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০)
৪. আল্লাহভীতি (তাকওয়া) সৃষ্টি করে
➤ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো…”
— (সূরা আলে ইমরান ৩:১০২)
৫. চরিত্র গঠন করে
➤ রাসূল ﷺ বলেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।”
— (হাদিস: সহিহ বুখারি)
৬. আখিরাতের জবাবদিহিতা স্মরণ করায়
➤ “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে, তা সে দেখতে পাবে…”
— (সূরা আয-যিলযাল ৯৯:৭–৮)
৭. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে
➤ “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
— (সূরা আত-তালাক ৬৫:৩)
৮. সঠিক পথের দিশা দেয়
➤ “এটা সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই; মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত।”
— (সূরা আল-বাকারা ২:২)
৯. ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলে
➤ “নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”
— (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১০)
১০. দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দেয়
➤ “যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত…”
— (সূরা আল-বুরূজ ৮৫:১১)
আকাইদের (ইসলামি বিশ্বাসের) মাধ্যমে নৈতিক জীবন গঠনের উপায়গুলো ১৫টি পয়েন্টে দেওয়া হলো—
১। মানুষকে সৎ ও দায়িত্বশীল করে
২। পাপ থেকে বিরত থাকা যায়
৩। ন্যায়পরায়ণ হতে শেখায়
৪। নৈতিক জীবন গঠনে সাহায্য করে
৫। মানুষকে ধৈর্যশীল করে তোলে
৬। মানুষকে সৎকর্মে উৎসাহিত করে
৭। উত্তম চরিত্র গড়ে ওঠে
৮। নৈতিক কাজে আগ্রহ বাড়ায়
৯। অন্যায় থেকে দূরে রাখে
১০। সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে
১১। অহংকার ও হিংসা থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়
১২ মানবসেবার মানসিকতা তৈরি হয়
১৩। আত্মসংযম ও নিয়ন্ত্রণশক্তি বৃদ্ধি পায়
১৪। সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা হয়
৪
৪ মন্তব্য