সিনিয়র শিক্ষক
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:৪৬ অপরাহ্ণ
প্রবৃদ্ধির ধারক সোনালি আঁশ
বাংলাদেশের সোনালি আঁশ ‘পাট’। বৃহত্তর বাংলায় ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের হাত ধরে এই সোনালি আঁশের আবির্ভাব ঘটে বৈশ্বিক পণ্য হিসেবে। বাংলায় ব্রিটিশদের অবকাঠামো খাতে অভাবনীয় বিনিয়োগের কারণও তাদের পাট ব্যবসা। স্বাধীনতা পূর্ব ও উত্তর সময়ে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান খাত ছিল পাট।
‘পাট’-কে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হলেও ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন আদমজী জুট মিল্স বন্ধ করে দেয়া হয়। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ শহরে অবস্থিত এই কারখানাটি পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল হওয়ায় বিখ্যাত ছিল। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আদমজী জুট মিল্স তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ২য় পাটকল (প্রথমটি হল বাওয়া পাট কল)। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানের বাংলাদেশ) এর উন্নতমানের পাট ব্যবহার করে আদমজী পাটকলে বিভিন্ন পাটজাত দ্রব্য প্রস্তুত করা হতো। এটিকে একসময় বলা হত প্রাচ্যের ডান্ডি (স্কটল্যান্ডের ডান্ডির নামানুসারে)। ১৯৭০-এর দশকে প্লাস্টিক ও পলিথিন পাটতন্তুর বিকল্প রূপে আত্মপ্রকাশ করলে আদমজী পাটকলের স্বর্ণযুগের অবসান হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এটিকে জাতীয়করণ করা হয়। ‘বিপুল পরিমাণে ক্ষতি’ কারণ দেখিয়ে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতার ব্যাপারে সচেতনতা পাট খাতের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারে আশা যোগাচ্ছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এই শিল্পটিকে যথাযথ মূল্যালনের জন্য দরকার সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সঠিক কৌশল ও কার্যকর পদক্ষেপ। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ৪৪ লাখ টন পাট উৎপাদিত হয়। পাট চাষ হয় প্রায় ১৪ দশমিক ৭৫ লাখ একর জমিতে। দেশের কৃষি খাতে পাটের অবদান ২৬ শতাংশ।
বর্তমানে ১৬ লাখেরও বেশি শ্রমিক পাট খাতে কর্মরত। আমাদের মোট রফতানি আয়ের ৩ শতাংশ আসে পাট থেকে এবং জিডিপিতে অবদান ১ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট খাতের রফতানি আয় ছিল ১১৬ দশমিক ১ কোটি মার্কিন ডলার—যা ছিল পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বৈশ্বিক পাট সুতা রফতানিতে বাংলাদেশের অংশ ৮৯ দশমিক ৭ শতাংশ। গ্রামে ও শহরে আদিকাল থেকে পাটের জমজমাট ব্যবসা করছেন অনেক মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বাজার, পাটগুদাম, পাটকল ও বাণিজ্য কেন্দ্র; যাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে অনেকের। তাছাড়া এ চরম জ্বালানি সংকটের যুগে গ্রাম-বাংলার রান্নার কাজে চমৎকার এক পুনরুৎপাদনক্ষম জৈব জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পাটকাঠি।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য যাচ্ছে যুক্তরাজ্যে, মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, রাশিয়ায়, চীনে, থাইল্যান্ডে, ভিয়েতনামে, ভারতে, ব্রাজিলে, আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায় এবং আরও অনেক দেশে। তাতে আয় হচ্ছে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা।
বিশ্বের শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী দেশ এখন বাংলাদেশ। বৈশ্বিক পাট উৎপাদনের ৫৮ শতাংশ জোগানদাতা হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের পাটের উৎপাদন ছিল ১৪ লাখ আট হাজার টন। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশে পাটের সুদিন ফেরানো সম্ভব। সেই সুদিন ফেরাতে প্রয়োজন প্রতিবন্ধকতা গুলো দূর করা। বিশেষ করে পাট পচানোয় পানি সংকট রোধে বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবন জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পাট বীজে আমদানি নির্ভরতা রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ছয় হাজার টন চাহিদার বিপরীতে প্রায় চার হাজার টন আমদানি করতে হয়। পাটজাত পণ্য উৎপাদন করতে গেলে পাটের আঁশ আরও নরম ও তুলার কাছাকাছি হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য পাটজাত পণ্যের উপযোগী জাত উদ্ভাবন করা জরুরি। স্বল্পমেয়াদি জাত উদ্ভাবন করা গেলে দেশের পতিত কিংবা প্রায় পতিত জমিতে পাটের আবাদ বাড়ানো সম্ভব। দেশে হাওর, পাহাড়, চর ও লবণাক্ত এলাকা প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর। এসব এলাকার মধ্যে কমপক্ষে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা সম্ভব। এ জন্য ঘাত সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করতে হবে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণার সব সুবিধা কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন পাস হয়। এরপর বিধিমালাও জারি হয়েছে। কিন্তু পাটের ব্যবহার তেমন বাড়েনি। পলিথিন সবকিছু গ্রাস করে ফেলেছে। ভারতের উচ্চমাত্রায় অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ এবং অন্য দেশের বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানান আন্তর্জাতিক ঘটনায় দেশের পাট খাতে অনাকাঙ্খিত ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরে পাটের বস্তা ও মোড়কের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতাদের বাংলাদেশের পাট খাতের সক্ষমতা এবং পাট পণ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।
এক্ষেত্রে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার থাকা দরকার। যেখানে বাংলাদেশের পাট খাত ও বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানির ব্যাপারে সব তথ্য পাওয়া যাবে। এই সার্ভিস সেন্টারকে অনলাইন-অফলাইন দুই মাধ্যমেই তাদের সেবা দিতে হবে। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর (ইপিবি) অর্থায়নে মিল মালিকদের অ্যাসোসিয়েশন এই সেন্টার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারে। অ্যাসোসিয়েশন সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় সুনির্দিষ্ট ক্রেতাদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে।
এসব বিজ্ঞাপন দেশের পাট খাতের সক্ষমতা, সুবিধা ও যেসব বিখ্যাত ব্র্যান্ড বর্তমানে আমাদের পাট বা পাট পণ্য ব্যবহার করছে তা তুলে ধরবে। মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের অ্যাসোসিয়েশনগুলো ইপিবির সহায়তায় বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারে। সম্ভাব্য ক্রেতা দেশগুলোতে পাট নিয়ে ট্রেড শোর আয়োজনও বেশ কার্যকর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই প্লাস্টিক ব্যাগকে নিষিদ্ধ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের মধ্যে বৈশ্বিক শপিং ব্যাগের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন। পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাংলাদেশের পাট খাতের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনা। কেবল পাটের তৈরি ব্যাগের চাহিদা বিশ্ববাজারে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার—যা ২০২৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ দাঁড়াবে ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে।
পাট গাছ পরিবেশ অবকাঠামো রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাট গাছ মাটির ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি বা তার বেশি গভীরে প্রবেশ করে মাটির উপরিস্তরে সৃষ্ট শক্ত ‘প্লাউপ্যান’ ভেঙে দিয়ে এর নিচে তলিয়ে যাওয়া অজৈব খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে মাটির উপরের স্তরে মিশিয়ে দেয়।
ফলে অন্যান্য অগভীরমূলি ফসলের পুষ্টি উপাদান গ্রহণ সহজ হয় এবং মাটির ভৌত অবস্থার উন্নয়ন ঘটে। মাটিতে পানি চলাচল সহজ ও স্বাভাবিক থাকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পাট উৎপাদন কালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাট পাতা মাটিতে পড়ে। পাটের পাতায় প্রচুর নাইট্রোজেন, ক্যারোটিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে। এছাড়াও পাট কাটার পর জমিতে পাটগাছের গোড়াসহ যে শেকড় থেকে যায় তা পরে পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সার যোগ করে। এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। আমাদের দেশে প্রতিবছর গড়ে ৯৫৬ দশমিক ৩৮ হাজার টন পাট পাতা ও ৪২৩ দশমিক ৪০ হাজার টন পাটগাছের শিকড় মাটির সঙ্গে মিশে যায়, যা জমির উর্বরতা ও মাটির গুনগতমান বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব রাখে। এ কারণে যে জমিতে পাট চাষ হয়, সেখানে অন্যান্য ফসলের ফলনও ভালো হয়। সারাবিশ্বে বছরে প্রায় ৪৭ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন টন কাঁচা সবুজ পাটগাছ উৎপাদিত হয়, যার প্রায় ৫ দশমিক ৭২ মিলিয়ন টন কাঁচাপাতা। পাট ফসলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা প্রতি বর্গমিটারে শূণ্য দশমিক ২৩ থেকে শূণ্য দশমিক ৪৪ মিলিগ্রাম। এ কারণে পাট গাছ পৃথিবীর গ্রিন হাউস গ্যাস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করে পৃথিবীকে তার পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে।
আন্তর্জাতিক গাড়ি উৎপাদন শিল্পে বছরে প্রায় ১ লাখ টন পাট প্রয়োজন হয়। এই খাতে বাংলাদেশ ১০ থেকে ১২ হাজার টন পাট সরবরাহ করে। পাট ব্যাগ বা অন্যান্য পাটজাত পণ্যের এই ক্রমবর্ধমান বাজারের সুবিধা নেয়ার জন্য দরকার সঠিক নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ। পাট উৎপাদন ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সব ধরনের বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু ‘পাট’-কে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, সেহেতু সেই স্বীকৃতির যথার্থতা নিশ্চিত করা জরুরি।
লেখক: শুভাসিস ব্যানর্জি, সিনিয়র সাংবাদিক
সংগ্রহে: মো: হাবিবুল্লাহ্
৪
৬ মন্তব্য