প্রভাষক
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৩:২১ অপরাহ্ণ
"শিক্ষার সোনালী যুগ"
"শিক্ষার সোনালী যুগ" – এই শিরোনামে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকার, বিশেষত শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক এবং শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ. ন. ম. এহসানুল হক মিলন-এর সমন্বিত উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে গুণগত পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা হয়েছিল, তার একটি বিশদ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো। এই সময়কালে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, নকল বন্ধে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপ, শিক্ষায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ফলভিত্তিক প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষায় আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।
ক. নকলমুক্তির সংগ্রাম: এক দুর্বার অভিযান
নকল একসময় বাংলাদেশের শিক্ষা ও সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ ক্যান্সারে পরিণত হয়েছিল। একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী শিক্ষাকে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম না দেখে, অসদুপায়ে দ্রুত সফল হওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখত। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর, শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক এবং প্রতিমন্ত্রী আ. ন. ম. এহসানুল হক মিলন এই নকল সংস্কৃতিকে নির্মূল করার জন্য এক 'জিহাদ' ঘোষণা করেন।
প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও কঠোর প্রশাসন: এই সময়ে নকল বন্ধের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন-এর ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে আলোচিত ও কার্যকর।
মাঠ পর্যায়ে অভিযান: প্রতিমন্ত্রী মিলন প্রশাসনিক কক্ষের বাইরে গিয়ে সরাসরি পরীক্ষার হলগুলোতে অভিযান চালান। তিনি নিজে কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে ছুটে যেতেন। বহু কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় তাকে পরীক্ষার হলের বাইরে নকল সরবরাহকারী এবং অসাধু পরীক্ষার্থীদের তাড়া করতে দেখা যায়। কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক আগমনের খবরে মুহূর্তেই নকলচক্রের সঙ্গে জড়িতরা পালিয়ে যেত, যা নকলের কেন্দ্রগুলোকে দ্রুত ফাঁকা করে দিত।
আইনের কঠোর প্রয়োগ: ১৯৭৭ সালের বোর্ড আইন এবং ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী নকল প্রতিরোধে কঠোর বিধান ছিল। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এই আইনগুলোকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে নমনীয়তা না দেখিয়ে অত্যন্ত কঠোর হন। অবৈধ কাগজপত্র বা নকল নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগেই পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি এবং নকল পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা হয়।
দুর্নীতি রোধ: পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে প্রতিমন্ত্রী মিলন সক্রিয় ভূমিকা নেন। তার প্রচেষ্টায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণের দীর্ঘদিনের সংকট দূর হয় এবং বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যা শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।
মানসিকতার পরিবর্তন: নকল বন্ধের ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা বুঝতে পারে যে শুধু মুখস্থ করে বা অসদুপায় অবলম্বন করে পাশ করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা তাদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন এবং কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সফলতা অর্জনের মানসিকতা তৈরি করে। ফলে, ক্লাসরুমে উপস্থিতি, শিক্ষকদের প্রতি মনোযোগ এবং বাড়িতে পড়াশোনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই পরিবর্তন শিক্ষার ভিতকে মজবুত করতে শুরু করে।
নকল বন্ধের এই কঠোর অবস্থানের ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা বুঝতে পারে যে, অসদুপায় অবলম্বন করে আর পার পাওয়া যাবে না। তাদের মধ্যে বাধ্য হয়েই প্রকৃত পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার মানসিকতা তৈরি হয়।
খ. শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানের প্রসার
নকল বন্ধের মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়ার পর, সরকার শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং এটিকে বাস্তবভিত্তিক করার দিকে নজর দেয়।
পাঠ্যক্রমের সংস্কারের উদ্যোগ: তৎকালীন সময়ে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়, যা শুধু ডিগ্রি অর্জন বা মুখস্থবিদ্যা নির্ভর না হয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। যদিও সামগ্রিক পাঠ্যক্রমের আমূল পরিবর্তন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তবুও শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানমূলক আলোচনার সুযোগ তৈরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
জ্ঞানমূলক শিক্ষার গুরুত্ব: শিক্ষা মন্ত্রণালয় মুখস্থবিদ্যা ও নোটবই নির্ভরতা কমিয়ে জ্ঞানমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষাকে উৎসাহিত করে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো করার জন্য কেবল তথ্য মুখস্থ না করে, বরং বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করার তাগিদ অনুভব করতে শুরু করে। শিক্ষকেরাও এখন কেবল নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং জ্ঞানের বিস্তৃতির জন্য পাঠদানে আগ্রহী হন। এই সময়ে পাঠ্যক্রম সংস্কারের উদ্যোগ এবং শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।
উচ্চ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ: বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ: উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকার বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় অনেক নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসায় প্রশাসন এবং অন্যান্য আধুনিক ও কর্মমুখী বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে।
মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ: তৎকালীন সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সমন্বিত করার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। এই সময়ে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স ডিগ্রির (এম.এ.) সমমান প্রদান করা হয় (২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর)। এই সিদ্ধান্তটি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করে এবং তাদের জন্য উচ্চতর ডিগ্রি লাভের সুযোগ উন্মুক্ত করে।
প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার: এই সময়ে প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়, যা শিক্ষাকে সর্বজনীন করার ক্ষেত্রে সরকারের একটি বড় সফলতা ছিল।
নারী শিক্ষার প্রসার: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও উৎসাহমূলক কার্যক্রম (যেমন- উপবৃত্তি) অব্যাহত থাকার কারণে নারী শিক্ষায় অংশগ্রহণও ইতিবাচক ধারায় বহাল ছিল।
গ. জিপিএ প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি ও সুষম মূল্যায়ন
বর্তমানে জাতীয় পরীক্ষাগুলোতে 'জিপিএ-৫' বা 'গোল্ডেন জিপিএ' অর্জনের যে সর্বগ্রাসী প্রতিযোগিতা বিদ্যমান, ২০০১-২০০৬ সময়কালে এই ধরনের তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল না। এই বিষয়টি ওই সময়ের শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছিল।
বিভাগভিত্তিক ফলাফল পদ্ধতি: সেই সময়ে জাতীয় পরীক্ষার ফলাফল মূলত ঐতিহ্যবাহী বিভাগ/শ্রেণি (Division/Grade) পদ্ধতিতে প্রকাশিত হতো। এই পদ্ধতি সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করত না। শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য থাকত ভালো নম্বর অর্জন করে 'প্রথম বিভাগ' নিশ্চিত করা।
গুণগত মানদণ্ড: বিভাগভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল সংখ্যাগত সাফল্যের (যেমন: জিপিএ ৫) চেয়ে, সামগ্রিক পারফরম্যান্সের ওপর মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করে। এর ফলে, ছাত্র-ছাত্রীরা কেবল একটি নির্দিষ্ট গ্রেড অর্জনের জন্য তাড়াহুড়ো না করে, প্রতিটি বিষয়কে গভীরভাবে অনুধাবন করার সুযোগ পেত।
মেধাবী ছাত্রদের স্বতন্ত্র স্বীকৃতি: এই পদ্ধতিতে, সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে একটি সীমিত সংখ্যক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের স্বতন্ত্রভাবে মেধা তালিকায় স্থান দেওয়া হতো, যা তাদের প্রকৃত জ্ঞান ও অধ্যবসায়ের জন্য সমাজে বিশেষ মর্যাদা এনে দিত।
ঘ. ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত আগ্রহ সৃষ্টি
নকলমুক্ত পরিবেশ এবং ফলভিত্তিক প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল।
আস্থার পুনরুদ্ধার: পরীক্ষার হলে নকলের ভয় না থাকায় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।
অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা: যখন শিক্ষার্থীরা নিশ্চিত হয় যে একমাত্র পড়াশোনা করেই ভালো ফল করা সম্ভব, তখন তাদের মধ্যে শেখার আগ্রহ, ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং নিয়মিত অধ্যবসায় করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। শিক্ষকরাও তখন স্বস্তি ও নিষ্ঠার সাথে তাদের মূল কাজ – পাঠদান – করতে সক্ষম হন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক এবং বিশেষত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ. ন. ম. এহসানুল হক মিলনের মাঠ পর্যায়ের কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের ফলে নকলের মতো অভিশাপ থেকে শিক্ষাব্যবস্থা মুক্তি পেয়েছিল। এটি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান অর্জন এবং বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করেছিল। জিপিএ বাড়ানোর প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের উপর চাপ কমিয়ে গুণগত শিক্ষায় জোর দিতে সাহায্য করে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি আস্থা ও মেধাভিত্তিক পরিবেশ উপহার দিয়েছিল, যা অনেক শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষ কর্তৃক "শিক্ষার সোনালী যুগ" হিসেবে আখ্যায়িত। এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক কঠোরতা থাকলে একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
১
২ মন্তব্য