প্রভাষক
১৮ মার্চ, ২০২৬ ০৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
আমার জীবনের টার্ম কার্ড
সময়টা ছিল ২০০৭ খ্রী., আলিম (এইচ এস সি) প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। পৌরনীতি পরীক্ষার দিন, প্রতিদিনের মত পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। বিষয়টি যেহেতু অতিরিক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল, তাই তেমন কোন প্রস্তুতি ছিলনা। যে যার দেখে পারছে কলম ঘুরাচ্ছে। পরীক্ষার হলে প্রত্যবেক্ষক ছিলেন আমার প্রিয় জসিম ও বাবর স্যার। তাঁরা দু’জনও খোশ গল্পে মত্ত আছেন। গল্পের এক পর্যায়ে আমাদেরকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন, পড়াশুনায় কে কেমন? এবং বিষয়টা আমার কাছে কৌতুহল লাগল, তাই কলম যতটুকু ঘুরাই তার সাথে তাঁদের আলোচনায়ও মন বসালাম, আলোচনার এক পর্যায়ে আমাদের বাংলা স্যার জসিম উদ্দিন বললেন, এই ব্যাচের কেউ যদি, দাখিল (এস.এস.সি) পরীক্ষায় এ্যা-প্লাস পেত, তা হলে রহমত পেত। কিন্তু আফসোস করতে হয় তার জন্য সে চেষ্টা করেনি। আমি হতভম্ব হয়ে গেলোম, স্যার বলল কী! নিজেকে নিজে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি কি করলাম?
হায় হায় আমি কি সুযোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলাম। কিছুদিন পর পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো। কত বিষয়ে ফেল করছি তা বলে নিজেকে আর লজ্জিত করতে চাইনা।
একদিন বাংলা স্যার আমাদের বাংলা বিষয়ের উত্তরপত্র সাথে নিয়ে ক্লাসে আসলেন। ক্লাসের উপস্থিতিও ভালোই ছিলো।
বাংলা স্যার তো, তাই তার মধ্যে রসিকতাটাও ভালোই ছিলো। স্যার হাঁসিমাখা মুখেই ক্লাস আরম্ভ ক্লাস শুরু করলেন। প্রতিনিয়ত এমনি ছিলেন। কিন্তু আজকেরটা আমাদের জন্য ছিল অপমান জনক। কিন্তু আমরা এত বেহায়া ছিলামে যে, স্যারের অপমানকে আমাদের অপমানই মনে হলো না। একে একে সবাই ডাকছেন আর তার আমলনামা হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন, আর জোরে জোরে প্রাপ্ত নাম্বারটাও বলে দিচ্ছেন। আমরা শুনছি আর বেহায়ার মত হাসছি। যাহোক যখন আমার পালা আসলো, তখন স্যার আমার নাম ধরে ডাকলেন এবং সাথে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন এবং একটু বেশিই অপমানের স্বরে বললেন, এই তোমরা শুনো রহমত ১০০ মার্কে ১২ পাইছে। তাকে নিয়ে অনেক আশা করছিলাম, কিন্তু সে নিরাশ করল। ধর ধর নাও নাও তোমার উত্তরপত্র নাও। ভালোই লজ্জা ফেলাম সবার সামনে । ফ্যাকাশে চেহারা নিয়ে খাতাটা হাতে নিলাম, আর নিচু চোখে নিরবে দেখতে থাকলাম । পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি, আর সাথে সাথে কপালটাও ভাঁজ হচ্ছে। মনটা খুব খারাপ হলো।
খালার বাড়ী ফিরে আসলাম। আমরা দুই খালাতো ভাই এক ব্যাচেই পড়তাম। খালু স্কুলের দপ্তরির চাকরি করতেন। বাবার চাকুরির সুবাধে বাবা-মা টাঙ্গাইল বসবাস করত। যাহোক, রাতে পড়ার টেবেলি বসে বসে নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি এত বিষয়ে ফেল করলাম? তাহলে সামনে টেষ্ট পরীক্ষা, সেখানে ফেল করলেতো পরীক্ষাই দিতে দিবেনা।
নিজেকে নিজে বললাম টেস্টে সব বিষয়ে পাশ করতেই হবে। টেষ্ট পরীক্ষায় যদি শুধু একজন পাশ করে, তাহলে সে একজন হবো আমিই। শুরু করলাম মিশন । আগে দুই খালাতো ভাই এক বিছানায় ঘুমাতাম যার কারনে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হতো। তাই নিজের বিছানা পরিবর্তন করলাম। আমার খালু যে খাটে নামায পড়তেন, সেখানেই আমি ঘুমাতাম। এই জন্য যে, খালু প্রতিদিন সকালে জাগিয়ে দিতেন রমতি, রমতি বলে ।
আমি প্রতিদিন সকালে উঠে ফজর নামায জামাতে আদায় করে এসে সকাল নয়টা পর্যন্ত টানা পড়তাম, তারপর সকালের নাস্তা সেরে একটু হাঁটা-হাঁটি করতাম। আবার দশটা থেকে সাঁড়ে বারোটা পর্যন্ত পড়তাম। দুপুরে গোসল, নামায ও খাওয়া শেষে এক ঘন্টা ঘুমাতাম। ঘুম থেকে উঠে আসর আজান পর্যন্ত পড়তাম। আসর নামায শেষে একটু হাটা হাটি করতাম, মাঝে মাঝে ফুটবলও খেলতাম। খেলাশেষে মাগরিবের নামায পড়ে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের চায়ের দোকান, আবার কখনও খালার ঘরে নাস্তা হিসেবে মুড়ি ও চিনি খেতাম। তারপর রাত দশটা পর্যন্ত পড়তাম শুধ মাঝে এশার নামায জামাতে পড়ে আসতাম। গ্রামের প্রায় সবাই, এশার আগে বা এশার পর পরই রাতের খাবার খেয়ে নিতো কিন্তু আমার মিশনের কারনে আমি রাত দশটার আগে কখনই খেতাম না। খালাকে বলতাম আমার খাবার টা প্লেটে বেড়ে রাখেন আমি খেয়ে নিব। ঠিক দশটায় উঠে খাবার খেয়ে আবার পড়তে বসতাম। এবং রাত বারোটায় ঘুমাতে যেতাম। মাঝে মাঝে মাদ্রাসায় যেতাম। এভাবে চলতে থাকলো, প্রায় পাঁচ মাস এভাবেই আমার রুটিন অব্যাহত রাখলাম। আরেকটি অভ্যাস গড়ে তুললাম যা পড়তাম তার অধিকাংশই লিখতাম।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, টেষ্ট পরীক্ষায় পাঁচজন সব বিষয়ে পাশ করে তার মধ্যে আমিও একজন। টেস্টের পরও এটা অভ্যাহত রাখলাম যাতে আলিম (এইচএসসি) এ এ্যা-প্লাস পাই । আমি আলিমে (এইচএসসি) এ্যা-প্লাস পাইনি ঠিক কিন্তু আমি আমার জীবন ধারাকে পরিবর্তন করতে পেরেছি।
আলহামদুলিল্লাহ! সেই থেকে আমাকে কেউ পড়ার জন্য বলতে হয়নি, যে তুমি পড় না কেন?
১
১ মন্তব্য