প্রধান শিক্ষক
১৯ মার্চ, ২০২৬ ০৬:১১ অপরাহ্ণ
গ্রাম বাংলার চৈতালি উৎসব
গ্রামবাংলার চৈতালি উৎসব মূলত বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তি কেন্দ্র করে পালিত এক প্রাচীন ও বৃহৎ লোকউৎসব। এই উৎসব শিবের গাজন, চড়কপূজা এবং গ্রামীণ মেলার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, যা পুরনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে বরণের সেতুবন্ধন তৈরি করে ।
নিচে এই উৎসবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো:
· মূল আচার ও উৎসব: চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান অনুষঙ্গ শিবের গাজন বা চড়কপূজা। "গাজন" শব্দের অর্থ গ্রামের জনগণ বা গা-জন, যা এই উৎসবে সব শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণকে নির্দেশ করে । "চড়ক" শব্দটি 'চক্র' বা ঘূর্ণন থেকে এসেছে। এ উপলক্ষ্যে গ্রামের মাঠে একটি লম্বা কাঠের খুঁটি (চড়কগাছ) পুঁতে তার সাথে যুক্ত চাকার সঙ্গে সন্ন্যাসীদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ঘোরানো হয় । এর আগের দিন নীলপূজা পালিত হয়, যা শিবের নীলকণ্ঠ রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত ।
· ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: মনে করা হয়, প্রাচীন বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ম্লান হওয়ার পর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা হিন্দুধর্মে মিশে গিয়ে তাঁদের তান্ত্রিক সাধনার অংশ হিসাবে এই উৎসবের সূচনা করেন। পরবর্তীকালে এটি ধর্মঠাকুরের গাজন থেকে শিবের গাজনে রূপান্তরিত হয় ।
· আচার-অনুষ্ঠান ও খাদ্যাভ্যাস: উৎসবের অংশ হিসাবে অনেক সন্ন্যাসী শারীরিক কষ্টসাধ্য কসরত (যেমন: বঁড়শি দিয়ে ঝোলা, আগুনের ওপর হাঁটা) করতেন, যদিও বর্তমানে তা অনেকটাই বিলুপ্ত । চৈত্রসংক্রান্তির দিন বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের রীতি রয়েছে, যেমন চৌদ্দ রকম শাক খাওয়া (যার মধ্যে গিমাশাক ও অন্যান্য তিক্ত শাক থাকে), এবং চিড়ে, দই, মুড়ি, খই, তিলের নাড়ু খাওয়া। এই দিন মাছ-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ ।
· মেলা ও সামাজিক চেতনা: চৈতালি উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামে গ্রামে বহু দিনব্যাপী মেলা বসে। এই মেলায় বাঁশ-বেতের সামগ্রী, মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, নানা রকম মিষ্টি ও মনিহারি জিনিসের পসরা সাজে। পাশাপাশি পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদির আয়োজনও থাকে । এই উৎসব হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গ্রামীণ বাংলার মানুষকে এক কাতারে মিলিত করত ।
সব মিলিয়ে, গ্রামবাংলার চৈতালি উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ বাংলার জীবন-জীবিকা, প্রকৃতি ও মানুষের চাওয়া-পাওয়ার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি । কালের বিবর্তনে এর কিছু আচার-আচরণ বদলে গেলেও, গ্রামীণ মেলা ও শিবের গাজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব আজও তার প্রাণবন্ত ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ।
১
২ মন্তব্য